নেতৃত্বের পথে নারীর সবচেয়ে বড় বাধা সব সময় দৃশ্যমান নয়। কর্মক্ষেত্রের চাপ, পরিবারের যত্নের দায়িত্ব, সামাজিক প্রত্যাশা কিংবা নিজের সক্ষমতা নিয়ে সংশয়—প্রতিদিনের এসব ছোট ছোট অভিজ্ঞতাই কখনো কখনো নারীর সামনে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। সেই দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বাধার গল্পই উঠে এসেছে নতুন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘বিহান’-এ।
অক্সফাম ইন বাংলাদেশের ‘রাইজ অ্যান্ড লিড’ উদ্যোগের ভাবনা থেকে নির্মিত চলচ্চিত্রটির পরিচালনা করেছেন হেমন্ত সাদীক। এতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন দিলরুবা দোয়েল ও নিশাত প্রিয়ম। দুই কর্মজীবী নারী শিউলি ও রাখির গল্পের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রটি দেখিয়েছে—পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজের নানা প্রত্যাশা কীভাবে নারীর পেশাগত আকাঙ্ক্ষা, আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে।
শিউলি ও রাখি দুজনই পেশাজীবনে এগিয়ে যেতে চান। কিন্তু সেই পথ সরল নয়। দায়িত্ব, সামাজিক ধারণা, কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা এবং নিজের সক্ষমতা নিয়ে দ্বিধা—সবকিছুর সঙ্গে প্রতিনিয়ত তাঁদের বোঝাপড়া করতে হয়। একপর্যায়ে তাঁরা নিজেদের কণ্ঠ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে নতুন করে আবিষ্কার করতে শুরু করেন।
‘বিহান’-এর গল্পের বিশেষত্ব এখানেই। নারীর ক্ষমতায়নকে কোনো আকস্মিক নাটকীয় ঘটনা বা বড় বক্তৃতার মধ্য দিয়ে দেখানো হয়নি। বরং পরিচিত জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত, আচরণের পরিবর্তন ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে নেতৃত্বের গল্প বলা হয়েছে।
পরিচালক হেমন্ত সাদীক বলেন, “আমরা এমন কোনো স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানাতে চাইনি, যেখানে একটি নাটকীয় বক্তৃতা বা অসাধারণ কোনো ঘটনার মধ্য দিয়ে হঠাৎ করে নারীর ক্ষমতায়ন ঘটে। ‘বিহান’-এর সংগ্রামগুলো খুবই সাধারণ, আর ঠিক সে কারণেই এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কখনো কখনো নেতৃত্বের শুরু হয় নিজেকে চিনতে শেখার মধ্য দিয়েই।”
চলচ্চিত্রটির দৃশ্যভাষাতেও এই ভাবনার প্রতিফলন রয়েছে। পরিচিত মধ্যবিত্ত শহুরে পরিবেশ, স্বাভাবিক অভিনয় এবং চরিত্রগুলোর আচরণের সূক্ষ্ম পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আত্ম-অন্বেষণের প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন দৃশ্যে এসেছে আয়না ও প্রতিবিম্ব। আর শেষ দৃশ্যের সবুজ ট্রাফিক সিগন্যাল যেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার, নতুন সম্ভাবনার এবং নতুন যাত্রার ইঙ্গিত দেয়।
অভিনেত্রী নিশাত প্রিয়মের কাছে গল্পটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর চরিত্রগুলোর পরিচিতি। তিনি বলেন, “এই গল্পের নারীদের আমাদের খুব পরিচিত মনে হয়। তারা দক্ষ, দায়িত্বশীল; অথচ কর্মক্ষেত্রে, পরিবারে, এমনকি নিজের ভেতরেও নানা প্রত্যাশার সঙ্গে তাদের প্রতিনিয়ত বোঝাপড়া করতে হয়।”
তিনি বলেন, “‘বিহান’ সেই মুহূর্তের গল্প, যখন একজন নারী নিজের শক্তি ও সক্ষমতাকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেন।”
নারীর নেতৃত্ব এগিয়ে নিতে অক্সফামের ‘রাইজ অ্যান্ড লিড’ উদ্যোগের সর্বশেষ জনসম্পৃক্ততামূলক প্রয়াস এই চলচ্চিত্র। উদ্যোগটির লক্ষ্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্র ও কাঠামোগত পর্যায়ে নারীর নেতৃত্বের পথে থাকা বাধাগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলো পরিবর্তনে কাজ করা।
অক্সফাম ইন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মাহমুদা সুলতানা বলেন, শুধু নারীদের আরও আত্মবিশ্বাসী বা উচ্চাকাঙ্ক্ষী হতে বললেই নেতৃত্ব নিশ্চিত হবে না। এর জন্য প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও পরিবারকেও পরিবর্তনের পথে আসতে হবে।
তাঁর ভাষায়, এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নারীর সক্ষমতার স্বীকৃতি থাকবে, যত্নের দায়িত্ব ন্যায্যভাবে ভাগ হবে, সমান সুযোগ তৈরি হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হবে।
‘বিহান’ মূলত সেই প্রশ্নটিই সামনে আনে—নারীরা নেতৃত্ব দিতে চাইলে শুধু তাঁদের নিজেদের বদলালেই কি হবে? নাকি বদলাতে হবে পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও প্রতিষ্ঠানকেও?
গল্পের শিউলি ও রাখির যাত্রা সেই উত্তর খোঁজে। তাঁদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উঠে আসে নিজের সক্ষমতাকে চিনে নেওয়া, নিজের সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখা এবং নিজের কণ্ঠকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা। চলচ্চিত্রটি মনে করিয়ে দেয়, নেতৃত্বের শুরু সব সময় কোনো বড় মঞ্চ থেকে হয় না; কখনো তা শুরু হয় নিজের জীবন ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিজের অবস্থানটি নতুন করে বুঝে নেওয়ার মধ্য দিয়ে।
মো. শরিফুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে নির্মিত ‘বিহান’-এর চিত্রনাট্য লিখেছেন শাওন কৈরী। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন বাপ্পী আশরাফ, নাজমুল হাসান, আদনান চৌধুরী, প্রিয়ন্ময়ী প্রিয় ও সায়ান রহমান। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বক্সঅফিস। চিত্রগ্রহণ করেছেন সাহিল রনি ও হৃদয় সরকার। চলচ্চিত্রটির মিডিয়া পার্টনার ঢাকা ট্রিবিউন।
আগামীকাল ১৪ আগস্ট রাত ৮টায় অক্সফাম ইন বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বিহান’ মুক্তি পাবে।







