জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ও বহুমাত্রিক ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ একসময় বিশ্ব দরবারে সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই অগ্রগতি মারাত্মকভাবে থমকে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে ‘দুর্বল’ শহরের তালিকায় আশঙ্কাজনকভাবে ওপরের সারিতে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্য নগরী চট্টগ্রাম। যেখানে কয়েক বছর আগেও উন্নত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত অভিযোজন সক্ষমতার জন্য বাংলাদেশকে বিশ্বজুড়ে একটি ‘রোল মডেল’ বা পথপ্রদর্শক হিসেবে গণ্য করা হতো, সেখানে আজ জলবায়ুজনিত সংকটের মুখে দেশের প্রধান দুই মহানগরী মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।
ভৌগোলিক-স্থানিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ‘আলফা-জিও’ সম্প্রতি বিশ্বের ৭২টি প্রধান ও বড় শহরের জলবায়ু সহনশীলতা ও মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে একটি বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই বৈশ্বিক সূচকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে ‘দুর্বল’ শহরের তালিকায় ঢাকা চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে। একই তালিকায় নবম স্থানে অবস্থান করছে চট্টগ্রাম। আলফা-জিও-র এই মূল্যায়ন সূচকটি তৈরি করা হয়েছে অত্যন্ত বিস্তৃত ও সুনির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে। এর মধ্যে একদিকে ছিল নদীভিত্তিক বন্যা, উপকূলীয় জলোচ্ছ্বাস, তীব্র ও প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা, ক্ষতিকর দাবানল এবং তীব্র হারিকেন বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রত্যক্ষ ঝুঁকি। অন্যদিকে বিবেচনা করা হয়েছে এসব শহরের অভ্যন্তরীণ অভিযোজন সক্ষমতা, বিদ্যমান ও টেকসই অবকাঠামো, আধুনিক আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, সুশাসন এবং সরকারের নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি।
অথচ অতীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও চরম আবহাওয়ার মারাত্মক আঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত ও প্রশংসিত ছিল। সময়োপযোগী ও নির্ভুল ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাস ব্যবস্থা, উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার উচ্ছেদ ব্যবস্থা, ব্যাপক হারে সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, উন্নত বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং কৌশলগত নদী খনন কার্যক্রম—এসব যুগান্তকারী পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশ একসময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠেছিল। বিশ্বমঞ্চে যেকোনো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আলোচনায় বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হতো সফলতার প্রতীক হিসেবে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সুসংগঠিত অগ্রগতি ও সক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি, যার ফলে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশ দিন দিন পেছনের দিকে হেঁটেছে।
পরিবেশ ও নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক অবস্থানগত ঝুঁকির পাশাপাশি মানবসৃষ্ট নানা অসংগতি ও অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ঢাকাকে আজকের এই অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রতিরোধ্য নগরায়ণ, অবাধে জলাশয় ও ড্রেনেজ খাল ভরাট করা, শহরের প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার মারাত্মক অবনতি এবং অভিযোজন উপযোগী অবকাঠামো নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা ও বিলম্বকে ঢাকার এই দুর্বলতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকার প্রাকৃতিক জলনিষ্কাশন ব্যবস্থা বলা চলে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখোমুখি। একসময় শহরজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা প্রাকৃতিক খালগুলো অবৈধ দখলদারিত্ব ও আবর্জনার স্তূপে ভরাট হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র জলাবদ্ধতা; জমে থাকা পানি দ্রুত সরার কোনো পথ নেই। অন্যদিকে বন্দর নগরী চট্টগ্রামেও পরিস্থিতি ক্রমশ আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে। পাহাড়ি ঢল, হঠাৎ বন্যা এবং পাহাড় ধসের মারাত্মক ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও নগরটিতে তা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় ও টেকসই অবকাঠামোগত বেষ্টনী গড়ে ওঠেনি।
আলফা-জিও-র প্রতিষ্ঠাতা পরাগ খান্না বৈশ্বিক এই বাস্তবতা ও ভৌগোলিক ঝুঁকির বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, ‘সহনশীলতা বলতে মূলত মোট ঝুঁকি থেকে কার্যকর অভিযোজন সক্ষমতা বাদ দেওয়ার বিষয়টিকে বোঝানো হয়। আজ বিশ্বজুড়ে সবাই জলবায়ু সহনশীলতার কথা বললেও, বাস্তবে এটি বৈজ্ঞানিকভাবে পরিমাপ করার উদ্যোগ বা প্রচেষ্টা এখনো খুব কম।’
তিনি ভৌগোলিক বাস্তবতার উদাহরণ টেনে আরও যোগ করেন, ‘বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রত্যক্ষ অর্থ হলো—উজানের দিক থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনিবার্যভাবে অনেক বেশি পরিমাণে পানির প্রবল প্রবাহ নিচে নেমে আসা। আমাদের এই অঞ্চলে ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিকভাবেই শহরগুলো গড়ে উঠেছে চলাচলের উপযোগী নদীর উপত্যকাগুলোতে। কিন্তু ভূপ্রকৃতির বিচারে সেই উপত্যকাগুলোই আবার সবচেয়ে নিচু ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশ। প্রাকৃতিক নীতি অনুযায়ী, যেকোনো পানির প্রবাহ স্বভাবতই সবচেয়ে কম বাধার পথ ধরে তীব্র বেগে নিচের দিকে ধাবিত হয়। চরম এই প্রাকৃতিক শক্তির সামনে আমরা ও আমাদের নির্মিত কৃত্রিম শহরের অবকাঠামোগুলো আক্ষরিক অর্থেই এক অত্যন্ত নগণ্য ও ভঙ্গুর বাধা মাত্র।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু ঝুঁকির এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি থেকে ঢাকাসহ বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলোকে আগের সহনশীল ও নিরাপদ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হলে এখনই জরুরিভিত্তিতে সমন্বিত ও ক্র্যাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন বর্তমান নগর পরিকল্পনার আমূল ও টেকসই সংস্কার, বেদখল হওয়া সব প্রাকৃতিক খাল উদ্ধার ও পুনর্বাসন, বিদ্যমান জলাশয়গুলো কঠোরভাবে সংরক্ষণ, আধুনিক ও গতিশীল জলনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ব্যাপক মাত্রায় নগর সবুজায়ন এবং পরিবেশবান্ধব ও সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ নিশ্চিত করা।
এর পাশাপাশি, যেকোনো দুর্যোগ কার্যকরভাবে মোকাবিলার লক্ষ্যে নগরবাসীর মধ্যে পরিবেশগত সচেতনতা বৃদ্ধি ও সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে জলবায়ু সংক্রান্ত কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যকার বিদ্যমান সমন্বয়হীনতা দূর করে আন্তঃসংস্থা সমন্বয় জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও তহবিল সহায়তায় সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।







