বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে বিগত কয়েক দশকে রাসায়নিক সার ও মারাত্মক কীটনাশকের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন মাটি, পানি ও বায়ুমণ্ডল দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে মানবস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকি ও জটিল রোগের সম্মুখীন হচ্ছে।তাছাড়া, কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে ফসলের মিত্রপোকা বা উপকারী পতঙ্গ ধ্বংস হয়ে প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। এই বাস্তবতায়, রাসায়নিক বিষের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ‘সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা’ (আইপিএম) প্রযুক্তির সার্বজনীন সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
এসব অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার হ্রাস করে জৈবিক ও পরিবেশবান্ধব বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের(ডিএই) সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ‘নিরাপদ ফসল উৎপাদন ও পরিবেশ রক্ষার জন্য সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ টি গ্রহণ করা জরুরী হয়ে পড়েছে।
ইতিমধ্যে কৃষকরা নিজ উদ্যোগে এবং সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে ফসলের পোকা দমনে যান্ত্রিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক দমন পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। সেগুলোর মধ্যে সেক্স ফেরোমোন ফাঁদ, হলুদ আঠালো ফাঁদ ও আলোর ফাঁদ পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়। এসব পদ্ধতির আয়ত্ত করে লাভবান হয়েছেন কুমিল্লা সদর উপজেলার কৃষক রফিকুল ইসলাম। তিনি একটি প্রকল্পের অধীনে কৃষক মাঠ স্কুলে প্রশিক্ষণ নেন। তিনি বেগুন ক্ষেতে কীটনাশক ছিটানো বন্ধ করে সেক্স ফেরোমোন ফাঁদ এবং উপকারী পোকা সংরক্ষণের কৌশল গ্রহণ করেন।
তার মতে, বছরের পর বছর বেগুন গাছে ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনে সপ্তাহে ২-৩ বার তীব্র রাসায়নিক কীটনাশক স্প্রে করতেন। এতে তার উৎপাদন খরচ অত্যধিক বৃদ্ধি পেত এবং বেগুনের গুণগত মান নষ্ট হতো। তিনি জানান, এই পদ্ধতি প্রয়োগে তার কীটনাশক বাবদ তার খরচ ৬০ শতাংশ কমে যায়। তিনি পরিবেশবান্ধব উপায়ে উৎপাদিত বিষমুক্ত বেগুন বাজারের সাধারণ বেগুনের চেয়ে কেজি প্রতি ১০-১৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি করতে সক্ষম হন। ফলে তার নিট আয় বৃদ্ধি পায় এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।
আরেকজন যশোরের মডেল ইউনিয়নে গৃহিণী সুফিয়া বেগম। যশোরের একটি মডেল ইউনিয়নের বাসিন্দা সুফিয়া বেগম ঘরকন্যার কাজের পাশাপাশি বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ করতেন। কিন্তু পোকা-মাকড়ের আক্রমণে কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতেন না। এক প্রকল্পের ৩০ শতাংশ নারী সম্পৃক্ততার নীতিমালার আওতায় সুফিয়া বেগমকে আইপিএম প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাকে হলুদ আঠালো ফাঁদ ও জৈব সার তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সুফিয়া বেগম জানান, এখন আমি সম্পূর্ণ রাসায়নিকমুক্ত শাকসবজি উৎপাদন করছি, আমার পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে বাড়তি অর্থ উপার্জন করছি।
সংশ্লিষ্টরা এটি গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়নে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তেমনি পোকা দমনে ‘পার্চিং পদ্ধতি’ প্রয়োগ করেও সফস হয়েছেন দেশের হাজার হাজার কৃষক।
কৃষিবিদেরা বলছেন, খেতের ক্ষতিকর পোকা দমনে এটা প্রাকৃতিক পদ্ধতি। এই পদ্ধতির নাম ‘পার্চিং’ অর্থাৎ পাখির বসার জন্য দাঁড়। এই পদ্ধতিতে ধানখেতে পাখি বসার উপযোগী বাঁশের আগা, কঞ্চি, গাছের ডাল প্রভৃতি পুঁতে দিতে হয়। পাখি বাঁশের এই আগা, কঞ্চি, গাছের ডালে বসে ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খায়। ক্ষতিকর পোকামাকড় বিশেষ করে মাজরা পোকা দমনে এই পদ্ধতি বেশ কার্যকর।
কেন প্রকল্পটি প্রয়োজন:
বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশে টেকসই কৃষি উন্নয়ন এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ‘নিরাপদ ফসল উৎপাদন ও পরিবেশ রক্ষার জন্য সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ টির মাধ্যমে কৃষকের ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োগ কমে যায় তেমনি মাটি ও সংলগ্ন জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে। অন্যদিকে ব্যাঙ, মাছি, মাকড়সা ও অন্যান্য মিত্রপোকা প্রকৃতিতে ফিরে আসছে, কৃষক ও তাদের পরিবার বিষাক্ত রাসায়নিকের স্পর্শ থেকে মুক্ত থেকে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি এড়াতে পারছে; একই সাথে বাজারগুলোতে বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি ও খাদ্যের সরবরাহ বাড়ায় সর্বসাধারণের স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন হ্রাসে ভুমিকা রাখবে। তেমনি দামি কীটনাশক কেনার প্রয়োজন না থাকায় উৎপাদনে অতিরিক্ত খরচ বেঁচে গিয়ে কৃষকরা আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী, লাভবান ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠবেন।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্যমাত্রা:
বাংলাদেশের সিংহভাগ কৃষককে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নিরাপদ ফসল উৎপাদনের আওতায় নিয়ে এসে দেশের সকল শ্রেণির মানুষকে বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করা এবং পরিবেশকে দূষণমুক্ত রেখে একটি সুস্থ ও উন্নত জীবন উপহার দেওয়া। এই লক্ষ্য অর্জনে নির্দিষ্ট রূপরেখার অধীনে সারাদেশে ১২৮টি আইপিএম মডেল ইউনিয়ন স্থাপন করে প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে কমপক্ষে ৩ হাজার জন করে সর্বমোট ৩ লাখ ৮৪ হাজার জন কৃষককে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও স্বাস্থ্য-পরিবেশ সচেতনতায় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, ৪৯ হাজার ৫০০টি আইপিএম প্রদর্শনী বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরাসরি ৪৯ হাজার ৫০০ জন কৃষককে এবং ৯ হাজার ৯০০টি মাঠ দিবস উদযাপনের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ৮০ হাজার জন কৃষককে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের কার্যক্রমে যুক্ত করে অন্তত ২ শতাংশ ভোক্তার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে ৮০০ জন বিভাগীয় কর্মকর্তা ও ৩০০ জন অভিজ্ঞ কৃষককে প্রশিক্ষিত করে দক্ষ মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যারা পরবর্তীতে দেশজুড়ে পরিচালিত ৭ হাজার ৫০০টি কৃষক মাঠ স্কুলের (এফএফএস) মাধ্যমে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ জন কৃষককে ফসলের রোপণ থেকে শুরু করে কর্তন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ হাতে-কলমে শিখিয়ে দক্ষ ও সংগঠিত করে তুলবে।
প্রকল্পে লিঙ্গসমতা ও সর্বাত্মক অংশীদারিত্ব সুনিশ্চিত করতে খাদ্য উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে অন্তত ৩০ শতাংশ নারীর সম্পৃক্ততা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা গ্রামীণ পরিবারগুলোতে টেকসই খাদ্যের যোগান দেওয়া ও সুষম পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
খামারবাড়ির ডিএই-এর অতিরিক্ত উপপরিচালক (বালাইনাশক মান নিয়ন্ত্রণ) ও ‘নিরাপদ ফসল উৎপাদন ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি’এর ফোকাল পারসন কৃষিবিদ মো: মাজেদুর রহমান বলেন, ‘নিরাপদ ফসল উৎপাদন ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য ডিএতে এই ধরনের প্রকল্প মৌলিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গত প্রায় ৩ বছরের মধ্যে এ ধরনের প্রকল্পর অভাব ডিএই তে দেখা যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে মাঠ পর্যায়ে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের আন্দোলন ও কৃষক ও কর্মকর্তাদের মাঝে আইপিএম প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব দেখা দিচ্ছে। পরিবেশ ও কৃষিতে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ সমস্যা সহসা মোকাবিলা করতে এবং সরকারের নিরাপদ ফসল উৎপাদনের তাগিদ/ ইশতেহার বাস্তবায়নে দ্রুত প্রকল্প প্রনয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি।’
চ্যালেঞ্জ ও সুপারিশমালা:
প্রকল্পটির সফলতা নিভৃর করছে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের প্রচলিত রাসায়নিক নির্ভরতা কাটিয়ে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আনা এবং স্থানীয় বাজারে সাধারণ ফসলের ভিড়ে ‘নিরাপদ ফসল’-এর সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করার মতো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যা মোকাবেলায় আইপিএম পদ্ধতিতে উৎপাদিত ফসলের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে পৃথক জৈব বাজার বা বিশেষ বিপণন চেইন গড়ে তোলা। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যের উপকারিতা ও বালাই ব্যবস্থাপনার সফলতার গল্প ব্যাপকভাবে প্রচার করা এবং সেক্স ফেরোমোন ফাঁদ, জৈব বালাইনাশক ও মিত্রপোকার মতো পরিবেশবান্ধব উপকরণের সহজলভ্যতা স্থানীয় বাজারে সুনিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। শাক-সবজি, চাল, ডিম, দুধ, মাছ, মাংসসহ সব ধরনের খাদ্যের গুণগত মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে বাড়ানো হচ্ছে জনবল, স্থাপন করা হচ্ছে আধুনিক পরীক্ষাগার (ল্যাব) এবং হালনাগাদ করা হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তার মানদণ্ড। একই সঙ্গে খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি, ঝুঁকি মূল্যায়ন, গবেষণা, জনসচেতনতা এবং আইন প্রয়োগের কার্যক্রমও জোরদার করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ‘নিরাপদ ফসল উৎপাদন ও পরিবেশ রক্ষার জন্য সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ হবে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার হ্রাস করে জৈবিক ও পরিবেশবান্ধব বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত এই প্রকল্প একদিকে যেমন দেশের কৃষি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচনা করবে তেমনি পরিবেশের ক্ষয়রোধ এবং উৎপাদনে নারী কৃষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে কৃষিতে বিপ্লব সাধিত করবে।







