অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট, সবুজ কমে যাওয়া এবং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর যানবাহনের কারণে ঢাকায় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা নগর তাপদ্বীপের প্রভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯০ সালের পর গত সাড়ে তিন দশকে রাজধানীর চরম উত্তপ্ত এলাকার বিস্তার প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। এতে নগরবাসীর জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্য ও বাসযোগ্যতা নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে নগর তাপদ্বীপের তীব্রতার হটস্পট চিহ্নিতকরণ ও পূর্বাভাস: স্থান-কালভিত্তিক মেশিন লার্নিং কাঠামো’ শীর্ষক গবেষণায় ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশের নগর এলাকাগুলোর তাপদ্বীপ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় ঢাকাসহ বিভিন্ন নগর এলাকায় তাপদ্বীপের তীব্রতা ও হটস্পটের পরিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, গত তিন দশকে ঢাকার ভূমি ব্যবহার ও প্রাকৃতিক পরিবেশে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। উন্মুক্ত মাটি, বাগান ও জলাশয় ভরাট করে তৈরি হয়েছে একের পর এক কংক্রিটের ভবন। ফলে সূর্যের তাপ শোষণ ও ধরে রাখার সক্ষমতা বেড়েছে নগরের। দিনের বেলা ভবন, ইট-কংক্রিটের দেয়াল ও পিচঢালা সড়ক তাপ শোষণ করে; রাতে সেই তাপ ধীরে ধীরে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দিন-রাত উভয় সময়েই নগরের তাপমাত্রা বাড়ছে।
বিশেষ করে পুরান ঢাকা ও দক্ষিণ ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এ পরিস্থিতি বেশি প্রকট। গুলিস্তান, মতিঝিল, গেণ্ডারিয়া ও চকবাজারের মতো এলাকায় ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা পার্শ্ববর্তী তুলনামূলক উন্মুক্ত এলাকার চেয়ে বেশি। ঘন ইট-কংক্রিটের স্থাপনা, অপর্যাপ্ত সবুজ এবং বাতাস চলাচলের সীমিত সুযোগ এসব এলাকাকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।
অন্যদিকে, উত্তর ঢাকার উত্তরখান ও দক্ষিণখানের কিছু এলাকায় তুলনামূলকভাবে বেশি গাছপালা ও খোলা জায়গা থাকায় তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয়। এতে ভূমির আচ্ছাদন ও উদ্ভিদ কাভারেজের সঙ্গে স্থানীয় তাপমাত্রার সরাসরি সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত সবুজ থাকলে নগরের তাপমাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব।
যানবাহনেও বাড়ছে উত্তাপ:
রাজধানীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরীর মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা, দ্রুত নগরায়ণ এবং অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন ঢাকার উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, নগরীর কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের প্রায় ৫৬ শতাংশই যানবাহন থেকে আসে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি তেলচালিত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে বৈদ্যুতিক, ব্যাটারিচালিত ও হাইব্রিড যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও যানজট কমানোও জরুরি।
বদলাতে হবে নির্মাণ পদ্ধতি:
ঢাকার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভবন নির্মাণের উপকরণেও পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পোড়ামাটির ফায়ার ব্রিকসের পরিবর্তে সলিড ব্লক, হলো ব্লক ও নন-ফায়ার ব্রিকস ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ভবনে সাধারণ কাচের পরিবর্তে কম তাপ বিকিরণকারী ডাবল গ্লেজড ইউনিট (ডিজিইউ), স্যান্ডউইচ ও টেম্পার্ড গ্লাস ব্যবহারে ভবনের ভেতরে তাপ প্রবেশ কমানো সম্ভব।
এ ছাড়া প্রচলিত স্প্লিট ও উইন্ডো এসির পরিবর্তে তুলনামূলক জ্বালানিসাশ্রয়ী ভিআরএফ ও চিলার প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাও বলা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহারে ভবনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপও কমানো যেতে পারে।
সবুজায়নেই সমাধানের পথ:
নগরের তাপ কমাতে সড়ক বিভাজক, ফুটপাত ও খোলা জায়গায় ব্যাপক বনায়নের পাশাপাশি সুউচ্চ ভবনে ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান পুকুর, লেক ও জলাশয় সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনে কৃত্রিম জলাশয় তৈরির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গাছপালা কমে যাওয়ায় ঢাকার স্বাভাবিক বাষ্পীভবন ও বাতাস শীতল হওয়ার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। তাই শুধু সরকারি স্থাপনা বা সড়কে সবুজায়ন করলেই হবে না; বেসরকারি আবাসন, শপিং মল ও অন্যান্য বাণিজ্যিক ভবনেও সবুজায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় পরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় সংরক্ষণ, সবুজ অবকাঠামো, পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী এবং পরিচ্ছন্ন পরিবহনব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি আবাসন খাত ও নগরবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ঢাকাকে ধীরে ধীরে আরও বাসযোগ্য ও তাপসহনীয় শহরে রূপান্তর করা সম্ভব।







