যমুনা নদীর উত্তাল ঢেউয়ের গর্ভ থেকে জেগে ওঠা এক টুকরো চর বরুল। জামালপুর শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে ইসলামপুর উপজেলার এই চরে পৌঁছাতে নৌকা বা ট্রলারে পাড়ি দিতে হয় অন্তত এক ঘণ্টা। চরে পা রাখতেই চোখে পড়ে প্রমত্তা নদীর ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে নতুন করে ঘর বাঁধার ব্যস্ততা। ভাঙনকবলিত এসব মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি—নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ বা বেষ্টনী।
শুধু নদীভাঙন নয়, চরের মানুষের দৈনন্দিন জীবন মানেই এক অন্তহীন সংগ্রাম। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে শিক্ষা, বিদ্যুৎ কিংবা যোগাযোগ—মৌলিক অধিকারের প্রায় প্রতিটি সূচকেই পিছিয়ে রয়েছে এই জনপদ। কয়েকটি চর মিলিয়ে নামমাত্র একটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সেটি বেশিরভাগ সময়ই থাকে বন্ধ। রাতে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে যমুনা নদী পেরিয়ে মূল শহরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। দু’একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। বিদ্যুৎহীন এসব চরে সোলার প্যানেলই ভরসা, তবে চড়া দামে—প্রতি ইউনিট ৩০ টাকা দরে তা কিনতে হয় সাধারণ মানুষকে।
এমন এক কঠিন ও প্রতিকূল বাস্তবতার মাঝেও সম্প্রতি দেশের চরাঞ্চলের মানুষের জীবনে আশার এক নতুন আলো নিয়ে এসেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) একটি বিশেষ উদ্যোগ। ‘বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প (১ম সংশোধিত)’-এর বদৌলতে ঘুড়তে শুরু করেছে চরের কৃষকদের ভাগ্যের চাকা। এককালের হাহাকার আর বৈরী প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা চরাঞ্চলগুলোতে এখন উঁকি দিচ্ছে সবুজ বিপ্লবের হাতছানি।
চরের বিস্তীর্ণ জনপদ ও অপার সম্ভাবনা:
ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্সের তথ্য অনুযায়ী, নদী-নদী বেষ্টিত বাংলাদেশের মোট ভূমির প্রায় ১০ শতাংশই চর। দেশের ৩২ জেলার শতাধিক উপজেলার অংশবিশেষ জুড়ে বিস্তৃত এসব চরাঞ্চলে প্রায় এক কোটি মানুষের স্থায়ী বসবাস। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে আরও বড় পরিসরের কথা। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আট লাখ হেক্টর চরভূমির সঙ্গে জড়িত প্রায় দুই কোটি মানুষ।
ডিএই-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১২০০ থেকে ১৫০০ স্থায়ী ও অস্থায়ী চর রয়েছে। এগুলোর মোট আয়তন ৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। যার মধ্যে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ৪৭ হেক্টর আবাদযোগ্য এবং ১ লাখ ১ হাজার ৮৯২ হেক্টর জমি এতদিন পতিত ছিল। দেশের মোট চরাঞ্চলের প্রায় ৬৭ ভাগই রয়েছে উত্তরাঞ্চলে। কুড়িগ্রাম, জামালপুর, ভোলা ও নোয়াখালী জেলার অধিকাংশ উপজেলাই চরাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।
প্রতি বছর বর্ষায় কয়েক মাস পানিতে তলিয়ে থাকায় চরাঞ্চলের মাটিতে নতুন পলি জমে, যা জেনারেট করে প্রাকৃতিক উর্বরতা। ফলে তুলনামূলক কম রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেই এখানে ভালো ফলন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, চরের উর্বর জমিতে বর্তমানে গম, ভুট্টা, কাউন, বাদাম, মিষ্টি আলু, তিল, তিসি, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, লাউ, করলা, চিচিঙ্গা, ঝিঙা, শিম, খিরা, বিভিন্ন শাকসবজি ছাড়াও মাসকলাই, মসুর, খেসারি ও ছোলাসহ অন্তত কুড়ি ধরনের ফসলের চাষ হচ্ছে। চর আলেকজান্ডার, চরফ্যাশন, চর মনপুরা, তিস্তার চর ও চর জব্বারের মতো বিভিন্ন চরাঞ্চলে এখন ফসলের বহুমুখী আবাদ বিস্তৃত হয়েছে।
চরাঞ্চলের কৃষির চিরায়ত বাধা ও চ্যালেঞ্জ:
সম্ভাবনার বিপুল ক্ষেত্র থাকা সত্ত্বেও চরাঞ্চলে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন অর্জিত হচ্ছিল না দীর্ঘকাল ধরে। এর পেছনে রয়েছে একাধিক কাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। কৃষকরা এখনো বহুকালের প্রচলিত ও আদি কৃষিপদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল।
বিভিন্ন ফসলের আধুনিক ও উচ্চ ফলনশীল জাতের মানসম্মত বীজের তীব্র সংকট রয়েছে এখানে। ভালো বীজ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের বিষয়ে কৃষকদের পর্যাপ্ত ধারণার অভাব রয়েছে। এর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সেচ সংকট। চরের বেলে মাটির পানি ধারণক্ষমতা অত্যন্ত কম হওয়ায় ঘন ঘন সেচ দেওয়ার প্রয়োজন হয়। অথচ কৃষি জমি থেকে পানির উৎস দূরে থাকায় এবং গভীর ও অগভীর নলকূপের সংখ্যা অপ্রতুল হওয়ায় কৃষকরা সময়ে জমিতে পানি দিতে পারেন না।
আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার না থাকা চরাঞ্চলের উৎপাদনশীলতাকে আরও শ্লথ করে দিয়েছে। সিডার, উইডার, ট্রাক্টর, রোটাভেটর, স্প্রেয়ার, কম্বাইন হারভেস্টার ও থ্রেসারের মতো আধুনিক যন্ত্রপাতি চরে অনুপস্থিত বললেই চলে। ফলে তীব্র কৃষি শ্রমিকের সংকটে অনেক সময় পাকা ফসল ঠিক সময়ে ঘরে তোলা সম্ভব হয় না। এছাড়া উৎপাদিত কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্যও চরাঞ্চলে কোনো কোল্ড স্টোরেজ বা আধুনিক সংরক্ষণাগার গড়ে ওঠেনি।
প্রযুক্তির ছোঁয়া ও বদলে যাওয়া চিত্র:
এসব বহুমুখী সমস্যা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে দেশের ৩৫টি জেলার ১২১টি উপজেলার ১ হাজার ৪২৭টি কৃষি ব্লকে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ‘বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প (১ম সংশোধিত)’।
প্রকল্পের আওতায় কৃষকের সেচ সংকট দূর করতে বিতরণ করা হচ্ছে আধুনিক সেচ সহায়ক যন্ত্রপাতি—এলএলপি সেট ও ক্যানভাস পাইপ। এই পাইপের মাধ্যমে ১ হাজার ফুট দূর থেকেও জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া কৃষক পর্যায়ে উন্নত মানের চারা সরবরাহের লক্ষ্যে ১২১টি ৫ শতকের পলিসেড হাউস এবং ১৫টি ১০ শতকের উচ্চমূল্যের সবজি উৎপাদনের পলিনেট হাউস নির্মাণ করা হয়েছে। এসব পলিসেড হাউসে কোকোপিটের মাধ্যমে উৎপাদিত মানসম্মত চারা ইতিমধ্যে ব্যবহার শুরু করেছেন কৃষকরা।
মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি এবং বেলে মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে ভার্মি কম্পোস্ট, ট্রাইকোকম্পোস্ট ও কমিউনিটি বেইজড ভার্মি কম্পোস্ট সারের ব্যাপক প্রদর্শনী দেওয়া হয়েছে। কেঁচো থেকে জৈব সার আলাদা করতে কৃষক পর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে ১৬২ সেট ভার্মি কম্পোস্ট সেপারেটর। এছাড়া বালু জমিতে ফসল ফলানোর জন্য জনপ্রিয় করা হচ্ছে ‘স্যান্ডবার প্রযুক্তি’। উদাহরণস্বরূপ, জাজিরায় প্রায় ২০০ বিঘা বালু জমিতে এই প্রযুক্তিতে সফলভাবে তরমুজ চাষ করা হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব পচনশীল মালচিং প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমিয়ে নিরাপদ ফসল উৎপাদনেও কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি আম, পেয়ারা, লেবু ও মাল্টার ৮৫২টি নতুন ফলবাগান স্থাপন এবং নদীভাঙন রোধে তাল, নারিকেল, বট, নিম ও জামের মতো প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার চররক্ষা বৃক্ষ রোপণের কাজ চলমান রয়েছে।
শস্যের নিবিড়তা ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধির লক্ষ্য:
প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) মাসুদুর রহমান জানান, চরাঞ্চলের শস্য বিন্যাস ও ফসলের আবাদী এলাকা ৫ শতাংশ বৃদ্ধির পাশাপাশি ১২টি ফসলের আধুনিক জাতের প্রদর্শনী স্থাপন করা হচ্ছে। ট্রে ও কোকোপিটের মাধ্যমে মানসম্মত চারা উৎপাদন এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ফলে চরের অলস পড়ে থাকা কোনো জমিও আর পতিত থাকবে না।
প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের পতিত জমিগুলোকে চাষের আওতায় এনে চর অঞ্চলের শস্যের নিবিড়তা ১৪০ শতাংশ থেকে ১৪৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এর ফলে শস্যবৈচিত্র্য ও কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি এই প্রকল্পের পাশাপাশি যদি চরাঞ্চলে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, সংরক্ষণ সুবিধা এবং শক্তিশালী বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব হয়, তবে চরবাসী দেশের অর্থনীতিতে আরও বহুগুণ বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে এটি চরবাসীর জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।







