শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন কঠোর করা হচ্ছে, বাড়ানো হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের তদারকিও—পরিবেশ অধিদপ্তরের এমন ঘোষণার পর পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি। মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রয়োগ না থাকায় ও সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাবে রাজধানীসহ সারা দেশেই শব্দদূষণ এখন আশঙ্কাজনক পর্যায়ে।
এরই মধ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫’ বাস্তবায়নে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। তবে পরিবেশবাদীদের প্রশ্ন, বিধিমালায় কিছু স্থানে শব্দের সহনীয় মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া এবং পুরানো বিধিমালার প্রয়োগে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা নতুন উদ্যোগকে কতটুকু সফল করবে?
আইনে নতুন মাত্রা, কড়াকড়ি নীতি
নতুন বিধিমালায় এলাকাভেদে শব্দের সহনীয় মাত্রা কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে। ২০০৬ সালের বিধিমালায় আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ ও রাতে ৪৫ ডেসিবেল নির্ধারণ করা থাকলেও নতুন বিধিতে দিনে ৬০ ও রাতে ৫০ ডেসিবেল করা হয়েছে। নীরব এলাকায় (হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আদালত চত্বরের ১০০ মিটারের মধ্যে) দিনে ৫০ ও রাতে ৪০ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিধিমালার অন্যান্য নিয়মগুলোর মধ্যে রয়েছে:
নিষেধাজ্ঞা: নীরব এলাকায় সব ধরনের হর্ন বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত হর্ন বাজানো যাবে না।
নির্মাণকাজ: আবাসিক এলাকা সংলগ্ন ৫০০ মিটারের মধ্যে সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত শব্দসৃষ্টিকারী যন্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ।
অনুষ্ঠান আয়োজন: কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া জনসমাবেশ বা সামাজিক অনুষ্ঠানে উচ্চশব্দের সাউন্ড সিস্টেম চালানো যাবে না। অনুমতি পেলেও তা সর্বোচ্চ ৫ ঘণ্টা এবং ৯০ ডেসিবেলের মধ্যে রাখতে হবে।
জরিমানা ও দণ্ড: আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
কাগজে সহনীয়, বাস্তবে লাগামহীন:
আইনের কড়াকড়ির চিত্র কাগজে থাকলেও বাস্তবতা ঠিক উল্টো। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় শব্দের গড় মাত্রা ১১৯ ডেসিবেল, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এছাড়া স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় ঢাকার পল্টন মোড়ে ১৯২ দশমিক ২ ডেসিবেল ও সচিবালয় এলাকায় ১২৮ দশমিক ২ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দের তীব্রতা রেকর্ড করা হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই মাত্রার শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দিচ্ছে। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সাইন্সের (বিইউএইচএস) এক জরিপ বলছে, দেশে প্রতি চারজনে একজন (২৫ শতাংশ) কানে কম শোনেন। উচ্চ শব্দে দীর্ঘ সময় অবস্থান করায় রিকশাচালকদের মধ্যে এই হার প্রায় ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে।
প্রয়োগে গলদ কোথায়?:
আইন থাকলেও তা বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপের অভাবকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, “হাইড্রোলিক হর্ন বাজারে নিষিদ্ধ হলেও তা অহরহ বিক্রি হচ্ছে এবং যানবাহনে ব্যবহৃত হচ্ছে। যদি আমদানি ও বাজারজাতকরণেই লাগাম টানা না যায়, তবে কেবল রাস্তায় জরিমানা করে শব্দদূষণ ঠেকানো সম্ভব নয়।”
তবে পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এখন থেকে ট্রাফিক পুলিশ বা দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবেন। পাশাপাশি দেশজুড়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও সচেতনতামূলক প্রচার জোরদার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল পুলিশি অভিযান দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ, সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ এবং সবচেয়ে বড় কথা নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত সচেতনতাই পারে এই ‘নীরব ঘাতক’ থেকে মুক্তি দিতে।







