উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় দেশের পোলট্রি খামারিরা ক্রমেই আর্থিক সংকটে পড়ছেন বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ)।
সংগঠনটির মতে, একটি ডিম উৎপাদনে যেখানে প্রায় ১০ টাকা ব্যয় হয়, সেখানে খামার পর্যায়ে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৬ টাকায়। ফলে প্রতিটি ডিমে প্রায় ৪ টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে খামারিদের। বর্তমান পরিস্থিতিতে মাসে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে এ খাত। একই সঙ্গে উচ্চ করপোরেট করের বিষয়টিও খাতটির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
গতকাল রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে বিপিআইএ। এর আগে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা খামারিদের অংশগ্রহণে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী, মহাসচিব মো. সাফির রহমান এবং যুগ্ম মহাসচিব অঞ্জন মজুমদার বক্তব্য দেন।
তাদের দাবি, এভাবে চলতে থাকলে আগামী দুই বছরের মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ের পোল্ট্রি খামারিরা টিকে থাকবে না, সব ঝরে পড়বে। এতে পুরো পোল্ট্রি খাত চলে যাবে বাণিজ্যিক কিছু প্রতিষ্ঠানের অধীনে। এর ফলে সহজলভ্য প্রোটিনের বড় উৎস ডিম কিনে খেতে হবে বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ দামে। কর্মসংস্থান হারাবে লাখ লাখ মানুষ। তাই পোল্ট্রি শিল্পকে টেকসই করতে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা, ফিড ও ভ্যাকসিনে ভর্তুকি এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বিপিআইএ এর সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশের হাজার হাজার ডিম উৎপাদনকারী খামারি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিদিন তারা লোকসান গুনছেন। ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেকেই লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন- এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের ডিম উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পোল্ট্রি খাতে যৌক্তিক মূল্য (ফেয়ার প্রাইস) নির্ধারণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে এমন একটি মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, যাতে খামারিরা অন্তত ন্যায্য মুনাফা পান এবং উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারেন।
সারা দেশের পোল্ট্রি খামারিদের একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির আহ্বান জানিয়ে বিপিআইএ সভাপতি বলেন, সারা দেশের খামারিদের একটি জাতীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ চালু হলে প্রকৃত খামারিদের সহজে শনাক্ত করা যাবে এবং খামারিদের ঝরে পড়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি বাস্তব সময়ে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। সরকারি প্রণোদনা, ভর্তুকি ও স্বল্পসুদে ঋণ সরাসরি প্রকৃত খামারিদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
মোশারফ হোসেন চৌধুরী আরও বলেন, দেশে মাছ, মুরগির বাচ্চা, ওষুধ, টিকা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহনসহ প্রায় সব ধরনের উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়েছে। তবে সেই অনুপাতে খামার পর্যায়ে ডিমের দাম সমন্বয় করা হয়নি। ফলে পোলট্রি–শিল্পের মূল চালিকা শক্তি প্রান্তিক খামারিরাই সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন। গত ৫ বছরে ৬৪ হাজার খামারি এ খাত থেকে ঝরে পড়েছেন বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বিপিআইএ এর মহাসচিব এম সাফির রহমান বলেন, খামারিদের ৭০-৮০ শতাংশ ব্যয় চলে যায় খাদ্যের পেছনে। তার সঙ্গে খাদ্যের উপকরণ আমদানিতে আছে ৪ শতাংশ অগ্রিম আয়কর; আমরা এটা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছি।’ প্রতিবেশী দেশগুলোতে কৃষিখাতের কাঁচামালে এমন কর ব্যবস্থা নেই বলে জানান তিনি।
তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ের অভাবে পোল্ট্রি খাতে সুফল পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে জাতীয় পোল্ট্রি বোর্ড গঠন করা হোক। উৎপাদন খরচ কমাতে পারলে আগামী এক দশকে পোল্ট্রি খাত সফল শিল্প খাতে পরিণত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার বলেন, ‘যখন খামারিরা লোকসান দিয়ে সাড়ে চার টাকায় ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখনও ভোক্তাকে সাড়ে দশ টাকায় ডিম কিনতে হয়। ডিম পচনশীল পণ্য হওয়ায় খামারিরা তা মজুত করতে পারেন না, আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মধ্যস্থতাকারীরা মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।’
তিনি বলেন, ‘নিবন্ধিত খামারিদের জন্য ফারমার আইডি চালু করুন।’ এছাড়া, প্রান্তিক খামারিদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ, ও পোল্ট্রি বীমা চালু, উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনের জন্য পোল্ট্রি খামারঘন অঞ্চলে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা, সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও খামারি সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে একটি স্থায়ী পোল্ট্রি শিল্প কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্ম বা বাংলাদেশ জাতীয় পোল্ট্রি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠনসহ নানা দাবি তুলে ধরেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন- বিপিআইএর উপদেষ্টা এনসি বনিক, সহসভাপতি মেজবাউর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, প্রচার সম্পাদক সফিকুর রহমান, সমাজকল্যাণ সম্পাদক গাজী নূর হোসেন, কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্য মুন্না মুন্সী প্রমুখ।
তারা মাসে যে ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হন তার একটি খতিয়ান দিয়েছেন। সেখানে উৎপাদন খরচ ১০ টাকা ২০ পয়সা থেকে সাড়ে ১০ টাকা। প্রান্তিক পর্যায়ে ডিম বিক্রি করেছে খামারিরা ৬ থেকে সাড়ে ৬টাকায়। ৪ টাকা প্রতিপিসে লস। দিনে ডিম উৎপাদন ৬ কোটি। এ হিসাবে দিনে ক্ষতি ২৪ কোটি টাকা। মাসে ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।







