বাংলাদেশ-সৌদি আরব আকাশপথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরবের নতুন জাতীয় এয়ারলাইন রিয়াদ এয়ার। গত ৭ আগস্ট থেকে ঢাকা-রিয়াদ রুটে প্রতিদিন সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান সংস্থাটি। নতুন এই এয়ারলাইন যুক্ত হওয়ায় রুটটিতে ফ্লাইটের সংখ্যা ও আসনসংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি যাত্রীসেবায় প্রতিযোগিতাও বাড়ছে
রিয়াদ এয়ার ঢাকা-রিয়াদ রুটে আধুনিক বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ ব্যবহার করছে। সপ্তাহের সাত দিনই একটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করছে সংস্থাটি। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, রিয়াদ থেকে RX0763 ফ্লাইট রাত ৯টা ২০ মিনিটে ছেড়ে পরদিন সকাল ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছায়। অন্যদিকে ঢাকা থেকে RX0764 ফ্লাইট সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে রিয়াদে পৌঁছায়।
অর্থাৎ ঢাকা-রিয়াদ পথে সপ্তাহে সাতটি এবং রিয়াদ-ঢাকা পথেও সাতটি—দুই দিকে মিলিয়ে সপ্তাহে মোট ১৪টি ফ্লাইট পরিচালনা করছে রিয়াদ এয়ার। নতুন এয়ারলাইন হিসেবে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিদিনের ফ্লাইট চালু করাকে এভিয়েশন খাতের সংশ্লিষ্টরা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
সরাসরি যাত্রায় বাড়ছে বিকল্প:
ঢাকা-রিয়াদ রুট বাংলাদেশের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আকাশপথ। সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বসবাস ও কাজ করেন। পাশাপাশি হজ, ওমরাহ, ব্যবসা, পারিবারিক যোগাযোগ ও পর্যটনের কারণেও সৌদি আরবগামী যাত্রীর চাহিদা রয়েছে।
এত দিন এ রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, সৌদিয়া ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসসহ বিভিন্ন বিমান সংস্থা যাত্রী পরিবহন করে আসছে। রিয়াদ এয়ার যুক্ত হওয়ায় সরাসরি যাতায়াতের ক্ষেত্রে যাত্রীদের সামনে নতুন একটি বিকল্প তৈরি হয়েছে।
বিমান চলাচলবিষয়ক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রিয়াদ এয়ারের বোয়িং ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজে প্রায় ২৯০টি আসন রয়েছে। সে হিসাবে সপ্তাহে সাতটি ঢাকা-রিয়াদ ফ্লাইটে দুই হাজারের বেশি আসন যুক্ত করার সক্ষমতা রয়েছে সংস্থাটির। এর ফলে ব্যস্ত এই রুটে যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি টিকিটের বাজারেও প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন একটি পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া সৌদি এয়ারলাইন বাজারে প্রবেশ করলে টিকিটের ভাড়া, সেবার মান, ফ্লাইটের সময়সূচি এবং যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন সুবিধায় প্রতিযোগিতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে শেষ পর্যন্ত যাত্রীরাই বেশি উপকৃত হতে পারেন।
টিকিটের দাম নির্ভর করছে সময় ও আসনের ওপর:
ঢাকা-রিয়াদ রুটে রিয়াদ এয়ারের টিকিটের দাম নির্দিষ্ট নয়। ভ্রমণের তারিখ, টিকিট কেনার সময়, আসনের ধরন এবং টিকিটের শর্তের ওপর ভিত্তি করে ভাড়া পরিবর্তিত হয়। ফলে একই রুটে ভিন্ন সময়ে ভিন্ন দামে টিকিট পাওয়া যেতে পারে।
রিয়াদ এয়ার নিজস্ব ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ ও অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি করছে। যাত্রীরা বুকিংয়ের সময় বিভিন্ন ফেয়ার অপশন দেখে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী টিকিট কিনতে পারছেন।
যাত্রীদের জন্য কী সুবিধা:
ঢাকা-রিয়াদ রুটে রিয়াদ এয়ারের অন্যতম আকর্ষণ আধুনিক বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার। দীর্ঘপথের যাত্রায় যাত্রীদের আরাম ও উন্নত সেবা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে উড়োজাহাজটিতে বিভিন্ন ধরনের কেবিনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
রিয়াদ এয়ারের কেবিন ব্যবস্থায় বিজনেস এলিট, বিজনেস, প্রিমিয়াম ইকোনমি ও ইকোনমি শ্রেণি রয়েছে। ইকোনমি শ্রেণির যাত্রীদের জন্যও উন্নত আসন, চার্জিং সুবিধা, বিনোদন ব্যবস্থা ও ওয়্যারলেস কানেক্টিভিটির মতো সুবিধা রয়েছে। দীর্ঘ সময়ের ভ্রমণে প্রিমিয়াম ইকোনমি ও বিজনেস শ্রেণির অতিরিক্ত সুবিধা যাত্রীদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে।
এ ছাড়া রিয়াদ এয়ারের ‘স্ফিয়ার’ নামে লয়্যালটি কর্মসূচি রয়েছে। এতে যুক্ত হয়ে নিয়মিত যাত্রীরা বিভিন্ন সুবিধা ও পুরস্কার পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
রিয়াদকে কেন্দ্র করে বড় নেটওয়ার্কের লক্ষ্য:
সৌদি আরবের নতুন ফ্ল্যাগশিপ ক্যারিয়ার রিয়াদ এয়ার দক্ষিণ এশিয়াসহ আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত নেটওয়ার্ক বিস্তারের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। বাংলাদেশের ঢাকার পাশাপাশি পাকিস্তানের ইসলামাবাদ ও লাহোরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরের সঙ্গেও সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করেছে সংস্থাটি।
সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’-এর অংশ হিসেবে রিয়াদকে একটি বৈশ্বিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের শতাধিক গন্তব্যের সঙ্গে রিয়াদের বিমান যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে রিয়াদ এয়ার।
বাংলাদেশের যাত্রীরাও ঢাকার মাধ্যমে এই বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। রিয়াদ হয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সংযোগ নেওয়ার সুযোগ ভবিষ্যতে বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য রিয়াদ এয়ারকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে।
ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম-সিলেট থেকেও সরাসরি ফ্লাইটের সম্ভাবনা:
রিয়াদ এয়ারের বাংলাদেশ কার্যক্রম ভবিষ্যতে ঢাকার বাইরে সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনাও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো আঞ্চলিক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সিলেটের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সিলেট ও আশপাশের অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ সৌদি আরবে বসবাস ও কর্মরত। ফলে সিলেট থেকে রিয়াদ, জেদ্দা, দাম্মাম ও মদিনার মতো গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে যাত্রীদের ঢাকায় এসে ফ্লাইট ধরার প্রয়োজন কমবে। এতে সময় ও ভ্রমণ ব্যয় দুটোই সাশ্রয় হতে পারে।
চট্টগ্রাম থেকেও সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রীর চাহিদা রয়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দরনগরী থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাড়ানো হলে ঢাকার ওপর বিমানবন্দরের চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
তবে রিয়াদ এয়ারের চট্টগ্রাম বা সিলেট থেকে সরাসরি ফ্লাইট চালুর বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। এ ধরনের রুট চালুর ক্ষেত্রে এয়ারলাইনটির বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত, যাত্রী চাহিদা, বিমানবন্দরের সক্ষমতা, স্লট ও দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে।
সব মিলিয়ে ঢাকা-রিয়াদ রুটে রিয়াদ এয়ারের দৈনিক ফ্লাইট চালু বাংলাদেশ-সৌদি বিমান যোগাযোগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নতুন এই প্রতিযোগী এয়ারলাইন যাত্রীদের সামনে যেমন বিকল্প বাড়িয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে দেশের আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোর আন্তর্জাতিক যোগাযোগও আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।







