বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রহস্যঘেরা সবুজ বন, নদী-খাল আর রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ছবি। দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনসংলগ্ন মানুষের জীবিকা ছিল মাছ ধরা, গোলপাতা কাটা কিংবা বনের ভেতর থেকে মধু সংগ্রহের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। তবে সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে সেই চিত্র। সুন্দরবনের কোলঘেঁষে গড়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব ইকো রিসোর্ট ও কটেজ। এসব উদ্যোগ শুধু পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখছে।
মোংলার ঢাংমারি ও ড্যাংমারি এলাকায় বর্তমানে বেশ কয়েকটি ইকো রিসোর্ট পর্যটকদের সেবা দিচ্ছে। গোল কানন, ইরাবতী, বনবিবি, বনলতা, বনবাস, সুন্দরী, পিয়ালি, জঙ্গলবাড়ি ও ম্যানগ্রোভ হ্যাভেনসহ মোট ১৭টি রিসোর্ট রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আরও কয়েকটি কটেজ নির্মাণাধীন। ফলে সুন্দরবনের আশপাশের জনপদে পর্যটনকেন্দ্রিক নতুন একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠছে।
*প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার সুযোগ:
ঘরে বসে সুন্দরবনের পাখপাখালির ডাক। পায়ে হেঁটে বনের অপার সৌন্দর্য উপভোগ, নিরাপত্তার সঙ্গে নিশিযাপন। মানসম্মত খাবার গ্রহণ। স্বল্প খরচে লোকালয় থেকে খুব কাছে ভ্রমণ করেই বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন উপভোগের সুযোগ। এসব সুবিধা নিয়েই সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে পর্যটকদের জন্য গড়ে উঠেছে রিসোর্ট। এসব রিসোর্টের অন্যতম ‘সুন্দরী ইকো রিসোর্ট’।
সুন্দরবনের কোলঘেঁষা পরিবেশে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে রিসোর্টটি। পর্যটকদের জন্য এখানে রয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি গ্রামীণ পরিবেশের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ।
রিসোর্টে অবস্থান করে পর্যটকেরা ঘরে বসেই সুন্দরবনের পাখপাখালির ডাক শুনতে পারেন। পায়ে হেঁটে আশপাশের প্রকৃতি দেখা, ছোট খালে নৌকা ভ্রমণ, গ্রাম ও জেলেপল্লি ঘুরে দেখা কিংবা নদীর পাড়ে সূর্যাস্ত উপভোগের সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকার পাশাপাশি নিরাপদে রাতযাপন ও মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থাও রয়েছে।
সুন্দরবনের প্রকৃতি উপভোগের পাশাপাশি স্থানীয় জীবনযাত্রার সঙ্গে পর্যটকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়াই এসব ইকো রিসোর্টের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে অল্প খরচে লোকালয় থেকে খুব দূরে না গিয়েই পর্যটকেরা সুন্দরবনের আবহ উপভোগ করতে পারেন।
সুন্দরী ইকো রিসোর্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর পরিবেশ ও সংস্কৃতির সমন্বয়। এখানে স্থানীয় সংস্কৃতির ছোঁয়া রয়েছে প্রতিটি কাজে, প্রতিটি খাবারে, প্রতিটি আতিথেয়তায়। স্থানীয় মানুষের আন্তরিকতা ও সরলতা আপনাকে মুগ্ধ করবে। তারা যেন এই প্রকৃতিরই অংশ নির্মল, শান্ত, আর প্রাণবন্ত।
*পর্যটন ঘিরে কর্মসংস্থান:
সুন্দরবনসংলগ্ন ইকো রিসোর্টগুলোকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন রিসোর্টে স্থানীয় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন যুবক গাইড, মাঝি, রিসোর্টকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। আগে যাদের কাজের সন্ধানে অন্য জেলায় যেতে হতো, তাদের অনেকেই এখন নিজ এলাকায় থেকেই আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন। শুধু পুরুষদের নয়, এই নতুন অর্থনীতির সুফল পাচ্ছেন স্থানীয় নারীরাও।
বাড়ির আঙিনায় উৎপাদিত হাঁস-মুরগি, ডিম, শাকসবজি ও ফলমূল সরাসরি রিসোর্টে বিক্রি করছেন তারা। এতে স্থানীয় উৎপাদকরা মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছেন।
একজন স্থানীয় নারী উদ্যোক্তার ভাষায়, আগে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য সঠিক দামে বিক্রি করা কঠিন ছিল। এখন রিসোর্টে সরাসরি বিক্রি করতে পারায় আয়ও বেড়েছে।
*স্থানীয় উপকরণে নির্মাণ:
সুন্দরী ইকো রিসোর্টের ব্যবস্থাপনায় শুরু থেকেই পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় বাঁশ, কাঠসহ প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করে কটেজ নির্মাণ করা হয়েছে। প্লাস্টিকের ব্যবহারও কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সুন্দরী ইকো রিসোর্টের ম্যানেজার মো. শরিফ বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি যেন পর্যটন বাড়লেও বনের বা পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয়। আমাদের কটেজগুলো স্থানীয় বাঁশ, কাঠ আর প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি। আমরা প্লাস্টিকের ব্যবহার ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে এনেছি।’
*সামাজিক দায়বদ্ধতায় উদ্যোগ:
ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জন্য সামাজিক উদ্যোগও পরিচালনা করছে সুন্দরী ইকো রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ। নিয়মিত বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দিতে মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন, সুপেয় পানির সংকট নিরসনে উদ্যোগ এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা বৃত্তি দেওয়ার মতো কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সুন্দরী ইকো রিসোর্ট ব্যবস্থাপনা পরিচালক(এমডি) মো. নাছির উদ্দিন বাদল বলেন, ‘আমরা চেয়েছি প্রকৃতিকে পুরোপুরি অক্ষত রেখে একটি বিশ্বমানের পর্যটন সুবিধা গড়ে তুলতে। সুন্দরী রিসোর্টের কটেজগুলো তৈরিতে আমরা ইট-পাথরের বদলে বাঁশ, কাঠ আর স্থানীয় প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করেছি।’
তিনি বলেন, ব্যবসায়িক লাভের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করাকে বড় অর্জন হিসেবে দেখেন তিনি। তার মতে, একসময় অনিশ্চিত জীবনে থাকা মানুষের হাতে সম্মানজনক কাজ তুলে দেওয়া এই উদ্যোগের অন্যতম সাফল্য।
*টেকসই পর্যটনের সম্ভাবনা:
সুন্দরবনের উপকূলে গড়ে ওঠা ইকো রিসোর্টগুলো এখন শুধু পর্যটকদের থাকার জায়গা নয়; স্থানীয় অর্থনীতিরও নতুন চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ায় পরিবহন, নৌযান, খাবার, স্থানীয় কৃষিপণ্য ও অন্যান্য সেবার চাহিদাও বাড়ছে। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট না করে পর্যটন অবকাঠামোর বিকাশ ঘটানোই হতে পারে এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ভিত্তি।
প্রকৃতি সংরক্ষণ, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান এবং পর্যটন—এই তিনটি বিষয়কে সমন্বয় করতে পারলে সুন্দরবনের উপকূলীয় জনপদে একটি টেকসই অর্থনৈতিক মডেল গড়ে উঠতে পারে। সুন্দরী ইকো রিসোর্টসহ স্থানীয় উদ্যোগগুলো সেই সম্ভাবনারই একটি উদাহরণ হয়ে উঠছে।
সুন্দরী ইকো রিসোর্ট নিয়ে বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ: +৮৮০১৭১৫০২৫১২৬







