ভারী বর্ষণ, নদীভাঙন এবং পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় রংপুর ও গাইবান্ধাসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে সবজি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হঠাৎ করে খেতের ফসল তলিয়ে যাওয়া এবং গাছ পচে যাওয়ায় উত্তরাঞ্চলের প্রধান প্রধান কৃষি মোকামে গ্রীষ্মকালীন সবজির উৎপাদন ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে হঠাৎ সৃষ্টি হয়েছে তীব্র সরবরাহ ঘাটতি। জোগান ও চাহিদার এই বিশাল ফারাককে কেন্দ্র করে খেত থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা প্রতিটি স্তরেই সবজির দাম এক লাফে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে চারগুণেরও বেশি বেড়েছে। এতে সাধারণ ক্রেতাদের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় হলেও কৃষকরা ফসল হারিয়ে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছেন।তবে অতিরিক্ত মূল্য গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। এতে ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের কয়েকজন সবজি চাষি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি জুলাই মাসের শুরুর দিকে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী লঘুচাপ এবং টানা সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে উত্তরাঞ্চলজুড়ে ঘন ঘন বৃষ্টিপাত হয়। নিচু জমিগুলোতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকার কারণে বেশির ভাগ সবজি খেত সম্পূর্ণ তলিয়ে যায়।
কৃষি তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্যতম প্রধান সবজি উৎপাদনকারী জেলা রংপুর, দিনাজপুর ও গাইবান্ধার বাজারে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দামের চিত্রে ভয়াবহ পরিবর্তন এসেছে। জুলাইয়ের টানা বৃষ্টির আগে প্রতি মণ (৪০ কেজি) পটোলের দাম ছিল মাত্র ৪০০ টাকা, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকা। একইভাবে সবচেয়ে বড় লাফ দিয়েছে কাঁচামরিচ; ৮০০ টাকা মণের কাঁচামরিচ এখন হাটে বিকোচ্ছে ১০ হাজার টাকায়! তবে, সরকার ভারত থেকে কাঁচা মরিচ আমদানীর অনুমতির পর বাজারে আগের চেয়ে সরবরাহ বেড়েছে। এছাড়া প্রতি মণ ১ হাজার ৬০০ টাকার বেগুন বেড়ে ৩ হাজার টাকা, ৪০০ টাকার ঢেঁড়স ২ হাজার ৪০০ টাকা, ১ হাজার ৫০০ টাকার করলা ৩ হাজার টাকা এবং ৬০০ টাকার বরবটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮০০ টাকায়। এর প্রভাব পড়েছে মিষ্টি কুমড়া, লাউ, জালি কুমড়া, ধুন্দল, ঝিঙা, চিচিংগা ও কাঁচা কলার বাজারেও।
রংপুরের পীরগঞ্জের খালাশপীর গ্রামের চাষি আনিছার রহমান (৪৪) জানান, এ বছর তিনি ৬০ শতাংশ জমিতে আদা, বরবটি ও বেগুনের চাষ করেছিলেন। তবে জলাবদ্ধতায় খেত তলিয়ে অধিকাংশ গাছ পচে গেছে। আগের চেয়ে ফলন অনেক নেমে এসেছে। ভালো দাম পেলেও ফলন নেমে যাওয়ায় লাভের মুখ দেখা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই উপজেলার পীরগঞ্জের চাষি রুহুল আমিন (৩২) জানান, ১৫০ শতাংশ জমির কাঁচামরিচ, পটোল, করলা ও লাউয়ের খেতের মধ্যে ১২০ শতাংশই নষ্ট হয়ে গেছে। প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করলেও বৃষ্টির পর তিনি মাত্র ২০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করতে পেরেছেন। তার মতে, অতিবৃষ্টিতে গাছ নষ্ট না হলে অন্তত ৪ লাখ টাকার ফসল বিক্রি হতো।
অন্যদিকে, গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার চাষি সাইদুর রহমান (৩৮) জানান, তাঁর ৯০ শতাংশ জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। গত বছর যেখানে ১০০ মণ মরিচ পেয়েছিলেন, এবার তা নেমে এসেছে মাত্র ১৫ মণে। বহু বছর পর এই অঞ্চলে আবহাওয়ার এমন তাণ্ডব দেখলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উৎপাদন কমে যাওয়ায় মোকাম ও স্থানীয় হাটগুলোতে তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের প্রধান বড় শহরগুলো থেকে আসা চাহিদা অনুযায়ী তারা সবজি সংগ্রহ করতে পারছেন না। আগে যেখানে একজন কৃষক হাটে ৪ মণ সবজি আনতেন, এখন তিনি এক বা দেড় মণের বেশি আনতে পারছেন না।
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার রানীগঞ্জ বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী বাবলু মিয়া (৫২) বলেন, ‘জুলাইয়ের শুরুর ভারী বর্ষণের পর থেকে হাটে সবজির জোগান অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে। বৃষ্টির আগে কেজিপ্রতি যে সবজি ১০ টাকায় কিনতাম, এখন তা ৩০ থেকে ৪০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। আগে যেখানে প্রতিদিন ঢাকায় পাঁচ ট্রাক (প্রতিটিতে ১৫ টন) সবজি পাঠাতাম, এখন দুটো পাঠাতেই হিমশিম খাচ্ছি। ’
সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শীতকালীন সবজি বাজারে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে তিনি জানান।
পীরগঞ্জের বালুয়াবাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল হক (৫৫) জানান, হাটে পণ্য কম থাকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়ে গেছে। দুই মণ সবজি কিনতে পাঁচজন ব্যবসায়ী দর কষাকষি শুরু করলে স্বাভাবিকভাবেই দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সংকট এতটাই প্রকট যে, তিনি বর্তমানে সাময়িকভাবে পরিবহন ব্যবসা বন্ধ রেখেছেন।
আবার গাইবান্ধার ধাপেরহাটের পাইকারি ব্যবসায়ী রাশেদুল ইসলাম (৫০) স্পষ্ট করেন, সবজির এই আকাশছোঁয়া দাম কোনো কৃত্রিম সিন্ডিকেটের কারণে নয়; বরং উন্মুক্ত বাজারে জোগান ও চাহিদার বিশাল তারতম্যের কারণেই তৈরি হয়েছে।
*নতুন করে বন্যা ও ভারী বর্ষণের শঙ্কা:
সবজির এই আকালের মধ্যেই উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দুর্যোগের কালো মেঘ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। পানির নিচে থাকা জমিগুলো ভেসে ওঠার আগেই নতুন করে বন্যার পূর্বাভাস জারি করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। পানি উন্নয়ন বোর্ড নিশ্চিত করেছে যে, তিস্তা নদীর পানি গাইবান্ধার তারাপুর স্টেশনে এবং কুশিয়ারা নদীর পানি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ স্টেশনে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
তারা জানিয়েছে, তিস্তা নদী তারাপুর (গাইবান্ধা) স্টেশনে বিপদসীমার উপর এবং ডালিয়া, কাউনিয়া ও দুধকুমারের পাটেশ্বরী স্টেশনে সতর্কসীমায় রয়েছে। আগামী ২-৩ দিনে গাইবান্ধার নিম্নাঞ্চলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। এছাড়া আগামী ৩ দিন পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়ে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার নিম্নাঞ্চলে সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে এবং কিছু এলাকা সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। সপ্তাহের দ্বিতীয়ার্ধে তা স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকা: গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং বর্তমানে বন্যা ঝুঁকি কম। উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং সংলগ্ন ভারতীয় অংশ (পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা) জুড়ে সামগ্রিকভাবে স্বাভাবিক ও মাঝারি থেকে মাঝারি-ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ৩ দিন সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে।
এছাড়া, গতকাল ৬ আগস্ট অন্যদিকে বুধবার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) সরদার উদয় রায়হান স্বাক্ষরিত এক দপ্তরাদেশে জানিয়েছে, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার নিচু এলাকাগুলোতেও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১২০ ঘণ্টার পূর্বাভাস অনুযায়ী, উত্তর বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী ৯ আগস্ট পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ স্থানে হালকা থেকে মাঝারি বর্ষণ এবং স্থানভেদে মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। মৌসুমি বায়ুর অক্ষটি রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, বর্ধিত পাঁচ দিনের পর বৃষ্টিপাতের প্রবণতা ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে।
*জলবায়ু পরিবর্তনের এ রূপ কৃষি ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি:
প্রখ্যাত পরিবেশ বিজ্ঞানী, গবেষক এবং শিক্ষাবিদ ও বায়ুদূষণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘ইদানীং আমরা দেখছি, বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরন বদলে গেছে। অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত ভারী বর্ষণ হচ্ছে, যা মাটি দ্রুত শুষে নিতে পারছে না। এর সাথে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত অবকাঠামো, নদী-নালা ও স্থানীয় জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়া। ফলে মাঠের অতিরিক্ত পানি সরার কোনো ড্রেনেজ বা নিষ্কাশন পথ থাকছে না। পানি দীর্ঘদিন মাঠে জমে থেকে ফসল ও গাছের শিকড় পচিয়ে দিচ্ছে।’
আবহাওয়া দপ্তর ও পাউবো জানিয়েছে রংপুর, গাইবান্ধাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় নতুন করে বন্যা হচ্ছে। এতে পরিবেশ ও কৃষির ওপর কী দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ স্বল্পমেয়াদে আমরা সবজির আকাল ও বাজার অস্থিরতা দেখছি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও ভয়াবহ। প্রথমত, ক্ষেত প্লাবিত হওয়ায় মাটির উপরিভাগের উর্বর অংশ বা ‘টপ সোয়েল’ ধুয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার ফলে মাটিতে মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্ট বা অনুখাদ্যের ভারসাম্য নষ্ট হয়। কৃষকরা যদি সঠিক পুনর্বাসন ও বৈজ্ঞানিক পরামর্শ না পান, তবে তারা শীতকালীন আগাম ফসল চাষেও বড় ধরনের পিছিয়ে পড়বেন।
সংকট থেকে উত্তরণে কৌশল হিসেবে তিনি বলেন, দ্রুত ‘জলবায়ু-সহনশীল কৃষি’ দিকে যেতে হবে। জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে এমন সবজি ও ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবন ও কৃষকদের কাছে পৌঁছানো। গ্রামীণ কৃষি এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ক্যানাল বা খালগুলো পুনঃখনন করা, যেন অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত মূল নদীতে গিয়ে পড়তে পারে। উঁচুতে ভাসমান বেড এর মতো পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতির বিস্তার ঘটানো। কৃষিকে বাঁচাতে হলে প্রাকৃতিক খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষি পরিকল্পনা করার কোনো বিকল্প নেই।
সবজি খেতগুলো দীর্ঘদিন পানির নিচে নিমজ্জিত থাকা এবং নতুন করে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় দেশের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন করে বন্যাপ্লাবিত এলাকাগুলোতে শীতকালীন আগাম সবজির চারা রোপণ পিছিয়ে যেতে পারে, যার ফলে দেশের খুচরা বাজারগুলোতে কৃষি পণ্যের এই উচ্চমূল্য ও সরবরাহ সংকট আগামী আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে।







