দেশের বাজারে কাঁচা মরিচের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ভারত থেকে আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। সোমবার থেকে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আমদানিকৃত কাঁচা মরিচ দেশে প্রবেশ শুরু হওয়ার কথা জানিয়েছেন আমদানিকারকেরা। এতে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং দাম কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের(ডিএই) উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (আমদানি) মোহাম্মদ শওকত ওসমান মজুমদার বলেন, ‘আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৫০৫ জন আমদানিকারককে ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন কাঁচা মরিচ আমদানির অনুমতি (আইপি) দেওয়া হয়েছে। অনুমতি পাওয়ার পরপরই আমদানিকারকেরা এলসি খুলছেন এবং প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কার্যক্রম সম্পন্ন করছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ রাতেও চলমান রয়েছে।’
হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক সোহরাব হোসেন জানান, কয়েকটি ভারতীয় ট্রাক ইতিমধ্যে বন্দরে প্রবেশ করেছে। তিনিও সোমবার আমদানির অনুমতি পেয়েছেন।
গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় হিলি স্থলবন্দর দিয়ে কাঁচা মরিচ আমদানি বন্ধ হয়েছিল। প্রায় ১০ মাস পর আবারও এই বন্দর দিয়ে মরিচ আমদানি শুরু হচ্ছে।
কেন বাড়ল দাম:
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে কাঁচা মরিচের চাহিদা ৫ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৬ লাখ টন। উৎপাদন হয় প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন। তবু প্রতিবছর বর্ষাকালে বাজারে মরিচের সংকট দেখা দেয়। কারণ, মরিচ একটি দ্রুত পচনশীল পণ্য এবং এর অধিকাংশ উৎপাদন হয় শীত মৌসুমে। জুলাই-আগস্টে বাজারে সরবরাহ সবচেয়ে কম থাকে। এ সময় সাধারণত ভারত থেকে আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ করা হয়। কিন্তু এবার আমদানি বিলম্বিত হওয়ায় বাজারে দাম ৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কৃষক এক কেজি মরিচ বিক্রি করছেন ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। জেলা পর্যায়ের আড়তে দাম প্রায় ২০০ টাকা, পাইকারি পর্যায়ে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ ক্ষেত থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে প্রতি কেজিতে দাম বাড়ছে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, ‘অতিবৃষ্টিতে মরিচ গাছ টিকে থাকতে পারে না। তাই বর্ষায় উৎপাদন কমে যায়।’ তবে এই পরিস্থিতিতেও কেজিপ্রতি ৪০০ টাকা দামকে তিনি অস্বাভাবিক বলে মনে করেন।
কৃষক ও ব্যবসায়ীরা যা বলছেন:
মানিকগঞ্জের কৃষক খন্দকার মিজানুর রহমান বলেন, বর্ষার পানিতে তাঁর পাঁচ বিঘার মরিচক্ষেতের বড় অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। আগে গাছে রোগ দেখা দিয়েছিল, পরে টানা বৃষ্টিতে অবশিষ্ট ক্ষেতও ডুবে যায়। ফলে উৎপাদন অনেক কমে গেছে।
ফরিদপুরের সদরপুরের কৃষক রোকনউজ্জামান বলেন, ‘ক্ষেতে মরিচই নেই। যা আছে, তা বিক্রি করে ভালো দাম মিললেও উৎপাদন না থাকায় লাভ হচ্ছে না।’
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, মোকামেও মরিচের সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। কারওয়ান বাজারের আড়তদার কাওসার উদ্দিন বলেন, আগে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ট্রাক মরিচ এলেও এখন আসছে চার থেকে পাঁচ ট্রাক। সরবরাহ না বাড়লে দামও কমবে না।
রায়েরবাজারের খুচরা ব্যবসায়ী আব্দুস ছালাম বলেন, ‘বর্ষায় উৎপাদন কমার পাশাপাশি ভারত থেকে আমদানি বন্ধ থাকায় বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি হয়েছে। আমদানি শুরু হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি মনে করেন।’
বর্ষায় উৎপাদন বাড়াতে নতুন উদ্যোগ:
বর্ষাকালেও কাঁচা মরিচ ও টমেটোর উৎপাদন বাড়াতে নতুন কর্মসূচি নিয়েছে সরকার। মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, ‘আগামী বছর থেকে কৃষকদের মধ্যে বিশেষ বস্তায় চাষের প্রযুক্তি এবং পলি মালচিং পদ্ধতি সম্প্রসারণ করা হবে। পাশাপাশি দেশের প্রায় ৪০০ পলিনেট হাউসে বর্ষাকালেও কাঁচা মরিচ ও টমেটো উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বিশেষ বস্তায় পানি জমবে না এবং পলি মালচিংয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত বৃষ্টির ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে। এসব উদ্যোগ সফল হলে বর্ষাকালে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং কাঁচা মরিচের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পুনরাবৃত্তি হবে না।’







