মো. জিয়াউর রহমান : নদীমাতৃক বাংলাদেশের বুক চিরে অসংখ্য নদ-নদী তার শাখা-প্রশাখার মাধ্যমে বিস্তৃত জালের মতো করে রেখেছে। এসব নদ-নদীর প্রতিবছর ভাঙ্গনের ফলে পলি জমে ধীরে ধীরে স্থায়ী চরের সৃষ্টি হয়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রায় ১২০০-১৫০০ স্থায়ী ও অস্থায়ী চর রয়েছে। এসব চরের মোট আয়তন ৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর(সূত্র: ডিএই), যার মধ্যে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ৪৭ হেক্টর আবাদযোগ্য জমি আর ১ লাখ ১ হাজার ৮৯২ হেক্টর পতিত জমি। এসব চরের জমিতে প্রায় ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) মানুষ বসবাস করে। এসব এলাকার বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর প্রধান জীবিকা কৃষি,মৎস্য, পশুপালন ও ক্ষুদ্র ব্যবসা হলেও মূলত: কৃষির উপরই অধিকাংশ নির্ভরশীল। দেশের মোট চরাঞ্চলের প্রায় ৬৭ ভাগই উত্তরাঞ্চলে রয়েছে।
কুড়িগ্রাম,জামালপুর,ভোলা ও নোয়াখালী জেলার প্রায় সব উপজেলাই চরাঞ্চলের অন্তর্ভূক্ত। উঁচু ও নিচু ভেদে প্রতিবছর তিন থেকে ছয় মাস চরের জমি পানিতে ডুবে থাকার কারণে পলিমাটি সমৃদ্ধ হচ্ছে।যার ফলে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ছাড়াই সন্তোষজনক ফলন পাওয়া যায়। উর্বরতার এ সুবিধা থাকায় গম,কাউন,ভূট্টা,বাদাম,মিষ্টি আলু,তিল,তিসি,পেঁয়াজ,রসুন,লাউ,করলা, চিচিঙ্গা,ঝিঙ্গা,শিম,খিরা,মরিচ ও অন্যান্য শাকসবজিসহ কমপক্ষে ২০ ধরনের ফসলের চাষ হচ্ছে। চরের বেলে দোঁয়াশ মাটিতে ডালজাতীয় ফসল যেমন মাসকলাই,মসুর,খেসারী ও ছোলা আবাদ হচ্ছে। চর আলেকজান্ডার,চর ফিলিপস, চর ফ্যাশন,চর মনপুরা,চর ক্লার্ক,চর রাজিবপুর, চর সাজাই, চর ভদ্রাসন,চর মজিদ, মাঝের চর, তিস্তার চর,চর জব্বার সহ জামালপুর, কুড়িগ্রাম, নোয়াখালী জেলার অসংখ্য চরে এসব ফসলের আবাদ হচ্ছে।
চরাঞ্চলে ভালো ফসল ফললেও তা কাঙ্খিত মাত্রায় উৎপাদন হয় না। তার কারণ, কৃষকরা এখনো অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত ও আদি কৃষি পদ্ধতি অনুসরণ করেন।সেখানকার অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে বিভিন্ন ফসলের আধুনিক ও উচ্চ ফলনশীল জাতের ভালো এবং মানসম্পন্ন বীজের অভাব। ভালো বীজ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের জন্য কৃষকের যথাযথ জ্ঞানের অভাব থাকায় ফসলের উৎপাদনের উপর প্রভাব পড়ে। চরের কৃষকের আরেকটি প্রধান সমস্যা হলো- সেচের সমস্যা। সেখানে বেলে মাটিতে পানি ধারণক্ষমতা খুবই কম বলে ফসল চাষে অনেক সেচ লাগে। চরের কৃষি জমি থেকে পানির উৎস দূরে হওয়ায় অনেক সময় কৃষকরা তাদের জমিতে সেচ দিতে পারেন না। এছাড়াও চরাঞ্চলে গভীর ও অগভীর নলকুপের সংখ্যা অপ্রতুল। সেচের অভাবের কারনেও ফলন কম হচ্ছে ।
চরাঞ্চলগুলো সমতল অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন ও দূরবর্তী হওয়ায় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় ফসল উৎপাদনের আধুনিক কলাকৌশল বা প্রযুক্তিগুলো সেখানে সম্প্রসারণে বাধার সৃষ্টি হয় এবং বিলম্বিত হয়।
চরাঞ্চলের কৃষিতে কৃষি যন্ত্রের ব্যবহার নেই বললেই চলে । সিডার, উইডার, ট্রাক্টর, রোটাভেটর, স্প্রেয়ার, কম্বাইন হার্ভেস্টার, থ্রেসার এবং স্প্রেয়ারসহ আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার নেই যার কারণে কৃষি শ্রমিকের অভাব পরিলক্ষিত হয় যার ফলে সময়মতো ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হয়না । চরের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা এখনো আমরা কৃষককে দিতে পারি নাই। চরের উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণের জন্য এখনো কোথাও কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থা নেই।
চরাঞ্চলে কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য এখন ঘোড়ার গাড়ি তাদের একমাত্র সম্বল। সেই ঘোড়ার গাড়ি চলার জন্য প্রশস্ত রাস্তাও নেই। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য নৌকা বোঝাই করে তীরে আনতেও অনেক সময় নৌকাডুবি হয়। ওই অঞ্চলে পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্যের ঘাটতি রয়েছে। চরে ভিটামিন ও খনিজ লবণ সম্পন্ন ফল ও সবজির ঘাটতি রয়েছে এবং খাদ্যোভাস এগুলোর উপস্থিতি ও দেখা গেছে। এসব সামগ্রিক বিষয়কে সামণে রেখে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের(ডেএই) মাধ্যমে বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পটি (১ম সংশোধিত) বাংলাদেশের ৩৫ টি জেলার ১২১ টি উপজেলার ১ হাজার ৪২৭ টি কৃষি ব্লকে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় কৃষকের সেচ সমস্যা সমাধানে সেচ সহায়ক যন্ত্রপাতি:এলএলপি সেট ও ক্যানভাস পাইপ বিতরণ করা হচ্ছে, কৃষক পর্যায়ে উন্নত মানের চারা সরবরাহের লক্ষ্যে ১২১ টি ৫ শতাংশের পলিসেড হাউজ এং ১৫ টি ১০ শতাংশের উচ্চমূল্যের সবজি উৎপাদনের জন্য পলিনেট হাউজ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব পলিসেড হাউজে ককোপিটের মাধ্যমে উৎপাদিত চারা ইতোমধ্যেই কৃষকরা ব্যবহার করা শুরু করেছে।
কৃষকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক(পিডি) নেতৃত্বে পরিচালিত প্রকল্পটি চর এলাকার মানুষের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চর এলাকার মাটির সমস্যা, সেচের সমস্যা, আধুনিক নতুন জাতের বীজের সমস্যা, নিরাপদ সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব ইত্যাদি সমস্যাসূহকে গভীরভাবে বিশ্লেষণপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে তার ফলাফল ইতোমধ্যে চরের কৃষকরা পেতে শুরু করছেন। চরের বেলে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা ও মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভার্মি কম্পোষ্ট, ট্রাইকোকম্পোষ্ট এবং কমিউনিটি বেইজড ভার্মি কম্পোষ্ট সারের প্রদর্শনী দেয়া হয়েছে এবং চরের কৃষকরা তা সাদরে গ্রহণ করেছে। কোঁচো থেকে জৈব সার আলাদা করার জন্য কৃষক পর্যায়ে ১৬২ সেট ভার্মি কম্পোষ্ট সেপারেটর দেয়া হয়েছে। এগুলোর সুফল কৃষকরা পেতে শুরু করেছে। চরের কৃষককে দিয়ে স্যান্ডবার পদ্ধতিতে সবজি চাষ করানো হচ্ছে। পরিবেশ বান্ধব পঁচনশীল মালচিং প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমিয়ে নিরাপদ ফসল উৎপাদনে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। আম,পেয়ার,লেবু ও মাল্টার ৮৫২ টি ফলবাগান স্থাপন করা হবে। এছাড়াও নদীভাঙ্গন রোধে চর রক্ষা বৃক্ষ যেমন তাল, নারিকেল,বট, নিম, জামসহ প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার বৃক্ষ রোপন করা হবে।
চরের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা:
চরাঞ্চল শুধু কৃষি নয়, বহুমুখী অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। প্রথমত; উন্নত ও আধুনিক কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করা। দ্বিতীয়ত; কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প (খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তেল উৎপাদন ইত্যাদি) গড়ে তোলা। তৃতীয়ত; কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য হ্রাস। চতুর্থত; চরভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা, বিশেষ করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নদীকেন্দ্রিক পর্যটন। পঞ্চমত; অর্গানিক কৃষির হাব তৈরী করা।
চর উন্নয়ন প্রকল্পের প্রভাব:
কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়নাধীন বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পটি সুচারুরূপে বাস্তবায়নের ফলে চরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। কৃষি প্রযুক্তি ও উন্নত বীজ ব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধি, শস্যের নিবিড়তা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে এবং ফসলের ফলন বৃদ্ধি পাচ্ছে, কৃষকের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বাজারের সঙ্গে সংযোগ উন্নত হওয়ায় কৃষিপণ্যের ভালো মূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরী হচ্ছে, নারীদের আয়বর্ধকমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং জীবিকার বৈচিত্র্যতা এসেছে, পুষ্টি ঘাটতি পূরণ হবে এবং কৃষকের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে।
চ্যালেঞ্জসমূহ: প্রথমত; নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, দ্বিতীয়ত; বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তৃতীয়ত; যথাযথ কৃষি প্রশিক্ষণ ও যোগাযোগ সুবিধার সীমাবদ্ধতা, চতুর্থত; দুর্গম এলাকায়, বাজার ও আর্থিক সেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার।
চরাঞ্চল বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় সম্পদ। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বাজারব্যবস্থা, সেচ, সংরক্ষণের ব্যবস্থা,পরিবেশ বান্ধব কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে চরাঞ্চলকে দেশের কৃষি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত করা সম্ভব। বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে একদিকে যেমন চরের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে অন্যদিকে চরের উৎপাদিত ফসল জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
লেখক: মো. জিয়াউর রহমান
প্রকল্প পরিচালক
বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ







