মাহিউল কাদির
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বড়-ছোট ভাইবোন আর বন্ধুদের অনেকেই হাওড় এলাকার মানুষ। তাদের সঙ্গে মিশলে একটা জিনিস বারবার মনে হয়—তাদের মনটা ঠিক হাওরের মতোই বিশাল, খোলা আর উদার। দূর থেকে হাওরের জল যেমন নীল আকাশের প্রতিচ্ছবি হয়ে চোখ জুড়ায়, কাছে গেলে তেমনি বোঝা যায়—এই সৌন্দর্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে অনেক না-বলা গল্প, কষ্ট আর সংগ্রাম।
কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ—এই বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এই সৌন্দর্যের টানে আমি বারবার সেখানে গিয়েছি, এখনো সুযোগ পেলেই যাই। বর্ষায় মনে হয়—চারদিকে শুধু জল আর জল, যেন এক অন্তহীন সমুদ্র। আর শুষ্ক মৌসুমে সেই একই জায়গা হয়ে ওঠে দেশের ধানভান্ডার। কিন্তু এই রূপের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক কঠিন বাস্তবতা—কৃষকের অনিশ্চিত জীবন আর প্রতিদিনের লড়াই।
হাওরের জীবনটা অনেকটাই ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল। বছরের প্রায় অর্ধেক সময় এলাকা পানির নিচে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা বোরো ধান চাষ করেন—এই একটি ফসলই তাদের সারা বছরের ভরসা। কিন্তু সমস্যা হলো, ফসল ঘরে তোলার ঠিক আগ মুহূর্তেই শুরু হয় প্রাক-বর্ষার বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢল। কয়েক ঘণ্টার পানিতে ভেসে যায় এক বছরের পরিশ্রম, পরিবারের সব আশা।
প্রতি বছর একই দৃশ্য। ধান পাকার মুখে হঠাৎ পানি ঢুকে পড়ে মাঠে। কৃষক তখন দিশেহারা—এখনই কাটবেন, না আর একটু অপেক্ষা করবেন! অনেক সময় অর্ধেক পাকা ধানই পানির নিচে তলিয়ে যায়। আবার যেটুকু কেটে আনা যায়, সেটাও রোদ না থাকায় শুকাতে না পেরে নষ্ট হয়ে যায়। একজন কৃষকের সেই কষ্টের কথা—‘একটা ধানও ঘরে তুলতে পারলাম না’—আসলে হাজারো কৃষকের একই গল্প।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার স্বাভাবিক নিয়ম ভেঙে গেছে। কখন বৃষ্টি হবে, কখন পাহাড়ি ঢল নামবে—কোনো নিশ্চয়তা নেই। একদিনেই অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হচ্ছে, আর মুহূর্তেই তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধানের ক্ষেত। কৃষক বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ।
হাওরের আরেকটি বড় সমস্যা হলো; এখানে মূলত ‘একটাই’ ফসল হয়। বোরো ধানের ওপরই নির্ভর করে পুরো এলাকার অর্থনীতি। ফলে এই একটি ফসল নষ্ট হলে কৃষকের সারা বছরের আয় বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব শুধু কৃষকের ঘরে নয়, দেশের খাদ্য ব্যবস্থাতেও পড়ে।
তবে সব দায় শুধু প্রকৃতির নয়। মানুষের তৈরি সমস্যাও কম নয়। হাওরে ফসল রক্ষার জন্য যে বাঁধ তৈরি করা হয়, তা অনেক সময় উল্টো বিপদ ডেকে আনে। যত্রতত্র অপরিকল্পিত বাঁধ তৈরি হওয়ার ফলে স্বাভাবিক পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারে না, আর বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তার ওপর রয়েছে নির্মাণে অনিয়ম, দুর্নীতি আর অবহেলা। অনেক বাঁধ সময়মতো শেষ হয় না, আবার অনেকগুলো দুর্বলভাবে তৈরি হওয়ায় সামান্য চাপেই ভেঙে যায়। তখন কৃষকের সামনে ডুবে যায় তার সারা বছরের স্বপ্ন।
ধান কাটার সময় শ্রমিক সংকটও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। পানিতে কাজ করতে অনেকে রাজি হন না, ফলে শ্রমিকের মজুরি অনেক বেড়ে যায়। আধুনিক যন্ত্র থাকলেও সব জায়গায় তা ব্যবহার করা যায় না। কৃষক তখন এক ধরনের অসহায় অবস্থায় পড়ে যান।
এদিকে, কোনোভাবে ফসল ঘরে তুললেও বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। অনেক সময় উৎপাদন খরচও ওঠে না। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। সরকারিভাবে সহায়তার কথা বলা হলেও তা অনেক সময় ঠিক সময়ে কৃষকের কাছে পৌঁছায় না।
হাওরের মানুষের জীবন শুধু কৃষির সমস্যায় আটকে নেই। বছরের বেশিরভাগ সময় পানি বন্দি হয়ে থাকতে হয় বলে শিক্ষা, চিকিৎসা আর যোগাযোগ—সবকিছুতেই সীমাবদ্ধতা। একফসলি কৃষির কারণে বছরের বাকি সময় অনেকেই কাজ পান না। ফলে ঋণ নিতে হয়, আর ফসল নষ্ট হলে সেই ঋণের বোঝা আরও বেড়ে যায়। অনেকেই বাধ্য হয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে পাড়ি জমান।
যে কৃষক কোনোভাবে ফসল বাঁচাতে পারেন, তারও শেষ পর্যন্ত স্বস্তি থাকে না। বৃষ্টি আর রোদহীন আবহাওয়ার কারণে ধান শুকানো যায় না। ফলে তা নষ্ট হয়ে যায়, কম দামে বিক্রি করতে হয়। অর্থাৎ, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই ঝুঁকি।
তাহলে সমাধান কী?
প্রথমত, হাওরে টেকসই ও বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করতে হবে এবং সেগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আগাম সতর্কতা কৃষকের কাছে দ্রুত পৌঁছে দিতে হবে। তৃতীয়ত, একফসলি কৃষির বদলে বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করতে হবে—যেমন মাছ চাষ, হাঁস পালন। চতুর্থত, হাওর উপযোগী কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, কৃষি বীমা ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাও উন্নত করতে হবে, যাতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পান।
সবশেষে একটা কথা—হাওরের কৃষককে শুধু সহানুভূতির চোখে দেখলে হবে না। তিনি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম ভরসা। কারণ, হাওরের মাঠে যখন ধান ডুবে যায়, তখন শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন নয়—আমাদের সবার ভবিষ্যতের একটা অংশ ডুবে যায়।
তাই এখন সময়—কথা নয়, কাজের। হাওরের কৃষক বাঁচলে, বাঁচবে বাংলাদেশের কৃষি। এই সত্যটা বুঝে আমাদের এগোতেই হবে।
(হাভার্ড স্কলার ও কলাম লেখক)








