দেশে মসলার চাহিদা প্রতিবছর বাড়লেও উৎপাদন সেই হারে বাড়ছে না। ফলে দেশের চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে দেশে মসলার চাহিদা পূরণে উৎপাদন বাড়ানোর নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও আমদানিনির্ভরতা ‘কমানো যাচ্ছে না’। একারণে মসলার চহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে প্রতি বছর মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যায় করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মসলা আমদানিতে রাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৫৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা ।
ইতিমধ্যে কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের ফলে দেশে পেঁয়াজ, রসুন, আদা ও কালোজিরাসহ কয়েকটি মসলার উৎপাদন বেড়েছে। জিরা চাষ বাড়াতেও নেওয়া হয়েছে নতুন উদ্যোগ।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান—উন্নত জাত, মানসম্মত বীজ, আধুনিক চাষাবাদ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে মসলা খাত কৃষকের আয় বৃদ্ধি, গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তারা বলছেন, মসলার আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশে উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য ১২টি সুনির্দিষ্ট কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, বিশেষ করে ‘মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প’-এর কার্যকারী পদক্ষেপে দেশের মসলা উৎপাদনে এক বিপ্লব সাধিত হয়েছে। এই প্রকল্পের সুফল হিসেবে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত স্বল্পতম সময়ের ব্যবধানে দেশের মাটিতে আদা, পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ ও কালোজিরার মতো গুরুত্বপূর্ণ মসলার উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের পিডি (প্রকল্প পরিচালক) কৃষিবিদ মো. মাসুদুর রহমান মসলা জাতীয় পণ্যের উৎপাদন প্রসঙ্গে তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি জানান ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে আদার উৎপাদন ছিল ২ দশমিক ৪৭ লাখ টন, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৫১ লাখ টনে। একই সময়ে পেঁয়াজের উৎপাদন ৩৪ দশমিক ৫৬ লাখ টন থেকে বেড়ে রেকর্ড ৫০ দশমিক ৯১ লাখ টনে পৌঁছেছে। এছাড়া রসুনের উৎপাদন ৬ দশমিক ৪১ লাখ টন থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৪৮ লাখ টন, হলুদের উৎপাদন ১ দশমিক ৫৮ লাখ টন থেকে ১ দশমিক ৫৯ লাখ টন এবং কালোজিরার উৎপাদন ০ দশমিক ১২ লাখ টন থেকে বেড়ে ০ দশমিক ১৩ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে।
মসলা জাতীয় ফসলের মধ্যে সবচেয়ে বড় চমক এসেছে পেঁয়াজ উৎপাদনে। বাংলাদেশের রান্নাঘরের প্রধান অনুষঙ্গ হলো পেঁয়াজ, যার জন্য অতীতে বহু বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হতো। ‘মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প’-এর আওতায় গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ জনপ্রিয়করণ এবং উন্নত সংরক্ষণের ব্যবস্থা করায় পেঁয়াজের উৎপাদনে অভূতপূর্ব সাফল্য এসেছে।
এদিকে ২০২২ সালের জুলাই থেকে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের কার্যকারিতা বিচারে প্রকল্পটির ২য় সংশোধনীতে সময় ও বরাদ্দ বাড়িয়ে চলমান ধারা বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পণ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মসলা আমদানিতে প্রায় ৪৫৯ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। একই অর্থবছরে এই শ্রেণিতে রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার। ফলে রপ্তানির তুলনায় আমদানির ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০৫ মিলিয়ন ডলার।
এদিকে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মসলার প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিতে মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে। গুঁড়া ও মিশ্র মসলা, আদা ও হলুদের গুঁড়া, রসুনের পেস্ট ও গুঁড়া এবং মরিচের গুঁড়ার মতো পণ্যে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে কৃষিপণ্যভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ঘটতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পণ্যের গুণগত মান, নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, পরীক্ষাগারভিত্তিক মান যাচাই এবং রপ্তানি মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।
মসলা খাতের উন্নয়নে শুধু আবাদ ও উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। ফসল তোলার পর সঠিকভাবে শুকানো, বাছাই, গ্রেডিং, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা না থাকলে পণ্যের মান কমে যেতে পারে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এ কারণে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদনোত্তর ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
এজন্য কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে জানান কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।
তারা বলেন, ফসলভিত্তিক চাহিদা, উৎপাদন ঘাটতি, আমদানির পরিমাণ এবং আঞ্চলিক কৃষি-উপযোগিতা বিশ্লেষণ করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। মানসম্মত বীজ ও রোপণ উপকরণের প্রাপ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ, সার ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাই দমনের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।
তারা আরো বলেন, উৎপাদন এলাকায় সংরক্ষণাগার, শুকানোর সুবিধা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কৃষক সংগঠন ও উৎপাদক দলকে শক্তিশালী করে কৃষকের সঙ্গে পাইকার, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান এবং রপ্তানিকারকদের সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে। এতে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন ও সরবরাহ পরিকল্পনা সহজ হবে।
বিদেশি জিরার মাঠে দেশীয় সাফল্য
বিশ্বের ১০৯ প্রকার মসলার মধ্যে বাংলাদেশে ব্যবহৃত হয় প্রায় ৫০ ধরনের মসলা। এর মধ্যে পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, আদা, হলুদ ও ধনিয়া প্রধান হলেও জিরা, এলাচ, দারুচিনি ও লবঙ্গ মূলত বিদেশি মসলা হিসেবে আমদানি করা হতো। তবে এ চিত্র বদলাতে ‘বারি জিরা-১’ মাঠপর্যায়ে চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয় সরকার।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১০টি জেলায় জিরার প্রদর্শনী স্থাপন করে প্রাথমিক সফলতা আসে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্র থেকে ৬০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ দিয়ে মাঠে চাষের প্রদর্শনী প্লট দেওয়া হয়। সাফল্য অব্যাহত থাকায় চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৩০ কৃষককে প্রশিক্ষণ ও বীজ সরবরাহ করা হয়েছে, যা দেশে জিরা উৎপাদনে নতুন দিগন্তের পথ দেখাচ্ছে। তবে জিরা চাষের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা নির্ধারণে একাধিক মৌসুমের ফলন, উৎপাদন ব্যয়, রোগবালাইয়ের ঝুঁকি, আবহাওয়ার উপযোগিতা এবং বাজারদর পর্যবেক্ষণ জরুরি বলে মনে করছেন কৃষিবিদরা।
ভবিষ্যৎ ভাবনা ও সুপারিশ
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় চাহিদার ঘাটতি পূরণ, বাজারদরের অস্থিরতা কমানো এবং উৎপাদনোত্তর ক্ষতি কমাতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। এই কার্যক্রমের দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি গবেষণায় উদ্ভাবিত জাত ও প্রযুক্তি দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সমস্যা গবেষণার আওতায় আনতে হবে।
একই সঙ্গে প্রকল্পের অর্জন মূল্যায়নে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধিই নয়—কৃষকের আয়, উৎপাদন ব্যয়, ফলন, বাজারদর এবং আমদানি প্রতিস্থাপনের পরিমাণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। মানসম্মত বীজ সরবরাহ, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা বাড়ানো এবং সরাসরি ‘কৃষক থেকে ক্রেতা’ বাজার সংযোগ স্থাপন করা গেলে বাংলাদেশ খুব দ্রুত মসলায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘পেঁয়াজের উৎপাদন বর্তমানে বেড়েছে। সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে এবং আগামী ২-৪ বছর উৎপাদনের এই ধারা অব্যাহত রাখা গেলে পেঁয়াজ আমদানির আর কোনো প্রয়োজন থাকবে না।’
তিনি আরো বলেন, রসুনের উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব। এছাড়া পাহাড়ি অঞ্চলে আদা ও অন্যান্য মসলা জাতীয় ফসলের চাষ বৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার ও ধারাবাহিক উদ্যোগে ইতোমধ্যে আদার উৎপাদনও বেশ বেড়েছে। তবে মসলা উৎপাদনে ইতিবাচক ফলাফল ধরে রাখতে একবার প্রকল্প নিয়ে তা বন্ধ করে না দিয়ে নিয়মিত ও সম্প্রসারিত আকারে প্রকল্প চালিয়ে যেতে হবে।
কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহিত করতে বর্তমান পর্যায়ে প্রকল্প সহায়তা, চাষিদের উদ্বুদ্ধকরণ এবং ভর্তুকি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তবে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পর আস্তে আস্তে প্রকল্প সহায়তা কমানো যেতে পারে বলে মত দেন এই কৃষি অর্থনীতিবিদ।
খামারবাড়ীর কৃষিবিদদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, দেশে মসলার উচ্চফলনশীল জাতের বিস্তার, রোগমুক্ত বীজ সরবরাহ, পাহাড়ি অঞ্চলে সেচ ও বৈজ্ঞানিক চাষাবাদ নিশ্চিত করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমে যাবে। সেইসাথে তারা আদার মতো মসলা বস্তায় চাষ, যান্ত্রিকীকরণ, প্রশিক্ষণ, সংরক্ষণ এবং মার্কেট লিংকেজ জোরদারের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়িয়ে দেশকে উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা সম্ভব। এতে করে একদিকে যেমন প্রান্তিক কৃষক লাভবান হবে তেমনি মসলার আমদানিনির্ভরতা কমলে বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।







