বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিতে সেচে মানেই ছিল চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার এক অন্তহীন অধ্যায়। ভূপ্রকৃতি ও আবহাওয়ার বৈরিতার কারণে এ অঞ্চলের কৃষকদের বছরের পর বছর ধরে মুখোমুখি হতে হয়েছে নানা প্রতিকূলতার। কোথাও বিদ্যুত গ্রিডের দীর্ঘ লোডশেডিং, আবার কোথাও খোলা বাজারে ডিজেলের অস্বাভাবিক চড়া দাম ও কৃত্রিম সংকট—সব মিলিয়ে সময়মতো জমিতে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করা ছিল কৃষকদের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। বছরের পর বছর ধরে চলা এই জ্বালানি সংকটের যাতাকলে বরেন্দ্র অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী চাষাবাদ প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিল।
তবে সেই নিরাশার চাদর ভেদ করে বরেন্দ্রভূমির উর্বর মাটি ও ফসলের মাঠে এখন পরিবর্তনের সোনালি হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সূর্যের আলোর অপার সম্ভাবনাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে সেচ কার্যক্রম পরিচালনার এই পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক প্রযুক্তি ধীরে ধীরে এ অঞ্চলের লাখো কৃষকের কাছে নতুন আস্থার ঠিকানা ও আশার আলো হয়ে উঠেছে।
রূপান্তরের প্রেক্ষাপট ও সরকারি উদ্যোগ:
কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বহুগুণ বাড়ানো, কৃষকদের সেচ ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা এবং পানির দক্ষ ও পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে বরেন্দ্র অঞ্চলে এখন ব্যাপকভিত্তিক সৌরশক্তিচালিত সেচ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর(ডিএই)এর যৌথ প্রচেষ্টায় এই যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে।
প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানি বা ডিজেল এবং জাতীয় বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের ওপর কৃষকদের নির্ভরতা কাটিয়ে একটি স্বাবলম্বী কৃষি কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যেই মূলত এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিকে জলবায়ু সহনশীল ও আধুনিক রূপ দেওয়ার কাজ নিরলসভাবে এগিয়ে চলেছে।
বিনামূল্যে প্রযুক্তি বিতরণ ও মাঠপর্যায়ের চিত্র:
প্রকল্পের সবচেয়ে ভালো দিক হলো, প্রান্তিক ও দরিদ্র কৃষকদের আর্থিক বোঝা লাঘব করতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তাদের হাতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি তুলে দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় সুনির্দিষ্টভাবে তিনটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে সোলার ইরিগেশন ব্যবস্থা বা সৌর সেচ পাম্প নির্মাণ ও স্থাপন করে দেওয়া হয়েছে।
ফিক্সড সোলার ইরিগেশন (২ অশ্বশক্তি): এই ক্যাটাগরির আওতায় বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মোট ২৪টি স্থায়ী সোলার ইরিগেশন প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত জমিতে অত্যন্ত নিয়মিতভাবে এবং ঝামেলাহীনভাবে সেচ কাজ পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।
পোর্টেবল সোলার ইরিগেশন: কৃষকদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে সম্পূর্ণ সহজে স্থানান্তরযোগ্য বা বহনযোগ্য ৮টি পোর্টেবল সোলার ইউনিট দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কৃষকরা সহজেই এসব ইউনিট এক জমি থেকে অন্য জমিতে বা ভিন্ন ভিন্ন প্লট ও বাগানে দ্রুত নিয়ে গিয়ে সেচ দিতে পারছেন।
প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন: আধুনিক ফলবাগান ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়ে মোট ১০টি প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এগুলোর প্রতিটি এক একর আয়তনের সুনির্দিষ্ট ফলবাগানের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে সুবিধা হলো, এটির জন্য জাতীয় বিদ্যুৎ সংযোগের প্রয়োজন হয় না এবং ডিজেলের চড়া দাম বা সংকটের চিন্তা করতে হয় না। বিদ্যুৎবিহীন দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকাতেও এটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালনা করা যাচ্ছে।
ফলবাগানে ড্রিপ ইরিগেশন এবং পানি সাশ্রয়ের বিপ্লব:
বরেন্দ্র অঞ্চল মুলত; খরা ও পানি সংকট প্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। বিগত কয়েক দশক ধরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ায় পানির সাশ্রয়ী ব্যবহারের বিকল্প কিছু নেই। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই কৃষি বিজ্ঞানীরা পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছেন। প্রকল্পের আওতাভুক্ত ‘প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন’ প্রযুক্তিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে সৌরচালিত পাম্পের সাথে ‘ড্রিপ ইরিগেশন’ বা ফোঁটায় ফোঁটায় সেচ পদ্ধতি যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পাইপলাইনের সাহায্যে সরাসরি গাছের গোড়ায় ফোঁটা ফোঁটা পানি ফেলা হয়।
এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে পানির অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মাটির উপরিভাগের আর্দ্রতা দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকছে। গাছের শিকড় প্রয়োজনীয় পরিমাণ আর্দ্রতা পেলেও আগাছার উপদ্রব কম হচ্ছে। ফলের উৎপাদন এবং গুণগত মান আগের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কৃষক ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া:
এই প্রযুক্তির সুফল সরাসরি পেতে শুরু করেছেন ওই অঞ্চলের মাঠপর্যায়ের কৃষকরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার উপকারভোগী কৃষক মোঃ আলমগীর বিশ্বাস জানান, ‘আগে ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে জমিতে বা বাগানে সেচ দিতে গিয়ে আমাদের পকেট ফাঁকা হয়ে যেত। উৎপাদন খরচের সিংহভাগ চলে যেত সেচ বাবদ। তাছাড়া, সেচ মৌসুমের ঠিক ওই সময়টিতে চাহিদামতো ডিজেল পাওয়াও যেত না, যা চরম দুশ্চিন্তার কারণ ছিল। এখন সরকারের সহায়তায় সৌরশক্তিতে খুব সহজে বাগানে পানি দিচ্ছি।’
তিনি আরোও বলেন, ‘এখন আমার খরচ এবং পানির অপচয়—দুটোই একযোগে কমেছে, আর গাছের পরিচর্যা আগের চেয়ে অনেক সহজ ও স্বস্তিদায়ক হয়েছে।’
এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা সম্পর্কে ইতিবাচক মূল্যায়ন কৃষি কর্মকর্তাদের। রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল মান্নান জানান, এই প্রযুক্তির সুফল ও কার্যকারিতা মাঠপর্যায়ে ইতিমধ্যেই সফলভাবে প্রমাণিত হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো তীব্র খরা প্রবণ ও পানি সংকটপূর্ণ এলাকায় জাতীয় গ্রিড বা আমদানিনির্ভর ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের নিজস্ব সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে এই প্রযুক্তি অনন্য ভূমিকা পালন করছে।
ভবিষ্যতে এই প্রকল্পের পরিধি আরও সম্প্রসারিত করা গেলে বরেন্দ্র অঞ্চলের সার্বিক পানি ব্যবস্থাপনা আরও বেশি দক্ষ ও বিজ্ঞানসম্মত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রকল্প পরিচালক ও কৃষিবিদ এস এম হাসানুজ্জামান জানান, গত দুই বছরে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৩২টি সোলার সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে কৃষকদের সেচ খরচ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপগুলোর কার্যক্ষমতা কমে গিয়েছিল। সোলার পাম্প চালুর ফলে অনাবাদি ও পতিত জমিতে বছরে তিনটি ধানসহ অন্যান্য ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে বলে তিনি জানান।
ফলে ফসলের নিবিড়তা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করলে এসব পাম্প ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত টেকসই হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জলবায়ু সহনশীল ও টেকসই কৃষির ভবিষ্যৎ রূপরেখা:
প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ এস এম হাসানুজ্জামান বলেন, আধুনিক এসব প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলে ফসলের বহুমুখীকরণ ও নিবিড়তা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষকদের স্বাবলম্বী করতে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় সরকারের এমন যুগোপযোগী ও টেকসই উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
কৃষি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মতে, প্রচলিত ডিজেল চালিত পাম্পের পরিবর্তে নবায়নযোগ্য সৌরশক্তির এই ব্যাপক ব্যবহার জীবাশ্ম জ্বালানির আমদানির ওপর দেশের সামগ্রিক চাপ কমাচ্ছে। একই সাথে এটি পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করে সবুজ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সুরক্ষায় বিরাট অবদান রাখছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নজনিত পানির সংকট, জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তন এবং কৃষিপণ্যের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়ের এই কঠিন যুগে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক আধুনিক সেচ প্রযুক্তি বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি খাতকে টেকসই, লাভজনক ও জনবান্ধব করে তোলার ক্ষেত্রে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছে। অদূর ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি দেশের অন্যান্য খরাপ্রবণ অঞ্চলেও মডেল হিসেবে বিবেচিত হবে বলে সকলের দৃঢ় বিশ্বাস।








