দেশের জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম এলাকার অতিদরিদ্র মানুষের আয়, সম্পদ, পুষ্টি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে পিকেএসএফ-এর পাথওয়েজ টু প্রসপারিটি ফর এক্সট্রিমলি পুওর পিপল-ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (পিপিইপিপি-ইইউ) প্রকল্প। জীবিকা, দক্ষতা, অর্থায়ন, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং জলবায়ু সহনশীলতাকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রকল্পভুক্ত পরিবারগুলোর অতিদারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং শিশুদের খর্বাকৃতির হার অর্ধেকেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে বাস্তবায়িত চার বছর মেয়াদি (অক্টোবর ২০২২-সেপ্টেম্বর ২০২৬) পিপিইপিপি-ইইউ প্রকল্পের সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এ মন্তব্য করেন। আজ আগারগাঁওস্থ পিকেএসএফ ভবনে পিকেএসএফ চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের হেড অব ডেভেলপমেন্ট কোপারেশন Michal Krejza স্বাগত বক্তব্য রাখেন পিকেএসএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ ফজলুল কাদের। অনুষ্ঠানে প্রকল্প বিষয়ক উপস্থাপনা প্রদান করেন পিকেএসএফ-এর মহাব্যবস্থাপক এবং পিপিইপিপি-ইইউ এর প্রকল্প পরিচালক সেলিনা শরীফ। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের বক্তব্য পড়ে শোনানো হয়।
নাজমা মোবারেক এর বক্তব্যে বলা হয় যে, অতিদারিদ্র্য একটি বহুমাত্রিক বাস্তবতা; এটি শুধু আয় বা সম্পদের ঘাটতি নয়। ‘পিপিইপিপি-ইইউ থেকে পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- দারিদ্র্য নিরসনের চূড়ান্ত লক্ষ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা নয়, বরং সক্ষমতা ও স্বাবলম্বিতা। আর্থিক সহায়তা, দক্ষতা, বাজারসংযোগ, স্বাস্থ্য-পুষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে একজন অতিদরিদ্র মানুষও ধীরে ধীরে উৎপাদক, উদ্যোক্তা ও অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদারে পরিণত হতে পারেন।’
বিশেষ অতিথি মিখাল ক্রেজজা বলেন, প্রকল্পটিতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অবদানের কথা তুলে ধরেন এবং অর্জিত সাফল্য ও ফলাফলকে এগিয়ে নেয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, কোনো প্রকল্পের অর্থায়ন শেষ হয়ে গেলেই প্রকল্পের কার্যক্রম শেষ হয়ে যাওয়া উচিত নয়। প্রকল্পের সাফল্যের মূল মাপকাঠি হলো—উপকারভোগী পরিবারগুলো যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা তারা ধরে রাখতে পারছে কি না; তাদের ব্যবসা ও জীবিকা আরও বিকশিত হচ্ছে কি না; তাদের সম্পদ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে কি না; এবং তাদের সন্তানরা আগের তুলনায় ভালো পুষ্টি পাচ্ছে কি না তার ওপর।
পিকেএসএফ চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান বলেন, পিপিইপিপি-ইইউ-এর সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু প্রকল্পের নির্দিষ্ট ফলাফলে নয়; বরং মানুষের সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসকে শক্তিশালী করে তাদের নিজেদের উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করার মধ্যে নিহিত।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অতিদরিদ্র সদস্যদের ঋণ গ্রহণের উপযুক্ততা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল। কিন্তু এ প্রকল্প প্রমাণ করেছে উপযুক্ত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে অতিদরিদ্রদের ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা সৃষ্টি করা যায় যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই দারিদ্র হ্রাসকরণে ভূমিকা রাখবে। তিনি জানান, প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও পিকেএসএফ ও এর সহযোগী সংস্থাসমূহের নিয়মিত কর্মসূচির মাধ্যমে প্রকল্পের সদস্যরা মূলধারার আর্থিক সেবা পেতে থাকবেন এবং প্রকল্পের অভিজ্ঞতা পিকেএসএফ-এর ভবিষ্যৎ কর্মসূচি প্রণয়নে কাজে লাগানো হবে।
স্বাগত বক্তব্যে মোঃ ফজলুল কাদের বলেন, গত চার বছরে প্রকল্পের লক্ষ্যভুক্ত অতিদরিদ্র খানার তিন-চতুর্থাংশের অধিক দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করেছে এবং এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ২২.৮১ মিলিয়ন ইউরো অনুদানের পাশাপাশি পিকেএসএফ ও এর সহযোগী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে প্রকল্পভুক্ত পরিবারগুলোর মধ্যে প্রায় ৩,২১৭ কোটি টাকা সহজ শর্তের ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি, অতিদরিদ্র মানুষকে শুধু সাহায্য দিলে তাদের সমস্যা সাময়িকভাবে মেটে কিন্তু তাদের সক্ষম করে তুললে এবং সুযোগ তৈরি করে দিলে তারা নিজেরাই নিজেদের জীবন বদলে দিতে পারে। এই প্রকল্পের হাজারো পরিবার সেটাই করে দেখিয়েছে।
প্রকল্প বিষয়ক উপস্থাপনায় জানানো হয়, প্রকল্পের আওতায় ১৯টি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে দেশের ১২টি জেলার ৩৪টি উপজেলার ১৪৫টি ইউনিয়নে ২.১৫ লক্ষ অতিদরিদ্র পরিবারের প্রায় ৮.৬ লক্ষ মানুষকে সমন্বিত সেবা দেয়া হয়েছে। প্রকল্পভুক্ত পরিবারগুলোতে অতিদারিদ্র্যের হার ৬২.৭ শতাংশ থেকে প্রায় ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের খর্বাকৃতির হার ৪৮ শতাংশ থেকে কমে ২২.৮ শতাংশ হয়েছে, যা জাতীয় গড়ের চেয়েও কম; কৃশতার হার ১৭ শতাংশ থেকে কমে ১২.৪ শতাংশ হয়েছে। সমাপনী অনুষ্ঠানে পিকেএসএফ, উন্নয়ন সহযোগী ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ, পিকেএসএফ-এর সহযোগী সংস্থাসমূহ এবং প্রকল্পের অন্যান্য অংশীজনসহ প্রায় ৪০০ জন অতিথি অংশগ্রহণ করেন।







