বাতাসে দুলছে বাঁশপাতা, ঘাসে পা রাখতেই নরম এক অনুভূতি। পাশে টলটলে জলের লেকে মাছের ছুটোছুটি।কাঠের দোলনায় বসে গল্প করছেন কেউ, কেউ আবার মোবাইলের ক্যামেরায় বন্দী করছেন চারপাশের সবুজ। দূর থেকে মনে হবে, কোনো গ্রামের উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছেন। অথচ জায়গাটি রাজধানীর শেরেবাংলা নগর। জাতীয় বৃক্ষমেলার ভেতরে গড়ে তোলা হয়েছে এমন একটি সবুজ পরিসর, যেখানে কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও ভুলে যাওয়া যায় নগরের যানজট, ধুলো আর কংক্রিটের ক্লান্তি।
এই ছোট্ট সবুজ গ্রামের নেপথ্যে রয়েছেন মো. রকিবুল আমিন। তিনি শুধু একজন উদ্যোক্তা নন; প্রকৃতিকে মানুষের প্রতিদিনের জীবনের অংশ করে তোলার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করা এক মানুষ। তার প্রতিষ্ঠানের নাম গার্ডেনিং বাংলাদেশ। ছাদ, বারান্দা, অফিস, দেয়াল কিংবা ছোট্ট একটি ঘরের কোণ যেখানে সামান্য জায়গা আছে, সেখানেই সবুজের ছোঁয়া পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। রকিবুলের গল্প তাই একজন উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প নয়; এটি কংক্রিটের শহরে হারিয়ে যেতে বসা প্রকৃতিকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনার গল্প।
কুষ্টিয়ার সবুজে ঘেরা পরিবেশে তার বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই গাছের প্রতি ছিল অন্যরকম টান। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় নিজের বাড়ির আঙিনায় গোলাপসহ নানা ফুলের বাগান করেছিলেন। সেই বাগান দেখতে আশপাশের মানুষও আসতেন। তখন হয়তো তিনি বুঝতে পারেননি, শখের সেই বাগানই একদিন জীবনের বাঁক বদলে দেবে দেখাবে নতুন পথ!
২০০১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আসেন। ঢাকা কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর শহরটিকে তিনি নতুন চোখে দেখতে শুরু করেন। চারদিকে উঁচু ভবন, কংক্রিটের দেয়াল, ব্যস্ত সড়ক। খোলা জায়গা কমছে, সেইষাথে জ্যামিতিক হারে কমছে গাছের সংখ্যাও। এই শহরের শিশুরা মাটিতে খেলে না, পাতার গন্ধ চেনে না। রকিবুল বলেন, ‘বড় হয়ে দেখলাম, শহরের মানুষ চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী। সবুজ যেন প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে। তখনই মনে হয়েছিল, মানুষের ঘরে যদি প্রকৃতির স্পর্শ ফিরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে শহরও কিছুটা প্রাণ ফিরে পাবে।’
তবে, রাজধানীতে এসে শুরুর পথটাও তার সহজ ছিল না। ছাত্রাবস্থায় বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে ১৪ হাজার টাকার গোলাপ কিনে শাহবাগে বিক্রি শুরু করেছিলেন। বিক্রিও ভালো হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে সব ফুল নষ্ট হয়ে যায়। বড় ধরনের লোকসান হয়, তবে সেই ব্যর্থতা তাকে থামাতে পারেনি। এরপরে ২০০৮ সালে বসুন্ধরা সিটিতে ছোট্ট একটি দোকান ভাড়া নেন। নাম দেন ‘একেশিয়া’। শুরুতে ব্যবসা খুব একটা ভালো চলেনি। তবে একদিন ইনডোর প্ল্যান্ট বিক্রি করে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা আয় করেন। সেদিনই তার উপলব্ধি হয়, মানুষ শুধু ফুল নয়, নিজের বাসা কিংবা কর্মস্থলের পরিবেশও সবুজও চায়। কিন্তু ভ্যাগ্যের ফেরে সেই দোকানও ছাড়তে হয়। বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ ফুলের দোকান না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দোকানটি ছেড়ে দিতে হয়।
হতাশ না হয়ে নতুন করে শুরু করেন আরেকটি প্রতিষ্ঠান। এবার সেই প্রতিষ্ঠানের নাম রাখেন গার্ডেনিং বাংলাদেশ। ২০১৯ সালে সেটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। এখন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, রিসোর্ট, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, পোশাক কারখানা, আবাসন প্রকল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ইকোপার্ক, লেক ও ব্যক্তিগত বাড়িতে সবুজায়নের কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। ইতিমধ্যে শতাধিক ছোট-বড় ল্যান্ডস্কেপ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে তার প্রতিষ্ঠান।
রকিবুলের কাছে গাছ কেবল সৌন্দর্যের উপকরণ নয়; মানুষের সুস্থতারও অংশ। তিনি বলেন,‘মানুষ গাছের পাতা ছুঁয়ে দেখার অভ্যাসও হারিয়ে ফেলছে। আমি চাই, প্রতিদিন অন্তত একবার মানুষ একটি গাছের কাছে দাঁড়াক। একটি গাছ শুধু অক্সিজেন দেয় না, মানুষের মনও ভালো রাখে। সবুজের দিকে তাকালেই চোখের ক্লান্তি কমে, মন শান্ত হয়।’ এই ভাবনা থেকেই তিনি এখন ‘জিরো সয়েল’ ধারণা নিয়ে কাজ করছেন। তার বিশ্বাস, কোনো খোলা মাটি অনাবৃত রাখা উচিত নয়। ঘাস, লতা কিংবা অন্য উদ্ভিদ দিয়ে প্রতিটি ফাঁকা জায়গা সবুজে ঢেকে দেওয়া সম্ভব। এতে শুধু শহরের সৌন্দর্য বাড়বে না; তাপপ্রবাহ কমানো, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এখন তার লক্ষ্য ‘গার্ডেন মিশন’ বাস্তবায়ন। তিনি চান, নগর সবুজায়ন একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হোক। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন জনপ্রিয় করা এবং পলিথিনের ব্যবহার কমাতেও কাজ করতে চান।
‘আমি চাই আগামী প্রজন্ম এমন একটি বাংলাদেশ পাক, যেখানে গাছ খুঁজে বেড়াতে হবে না। প্রতিটি ছাদ, প্রতিটি বারান্দা, প্রতিটি স্কুল, প্রতিটি অফিসে অন্তত কিছুটা সবুজ থাকবে,’ বলেন তিনি।
দীর্ঘদিনের এই প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার–২০২৫’-এ বৃক্ষ গবেষণা, সংরক্ষণ ও উদ্ভাবন শাখায় জাতীয় পরিবেশ পুরস্কার পেয়েছেন রকিবুল আমিন।
তবে তার কাছে পুরস্কার কোনো গন্তব্য নয়; বরং নতুন দায়িত্বের সূচনা। তিনি বলেন, ‘এই পুরস্কার আমাকে আরও বড় দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমি চাই মানুষ আবার গাছের কাছে ফিরুক। কারণ একটি সবুজ শহর শুধু সুন্দর নয়, সেটিই বাসযোগ্য শহর।’
প্রতিদিন আরও উঁচু হচ্ছে ঢাকার ভবন, আরও ঘন হচ্ছে কংক্রিটের দেয়াল। সেই শহরেই যদি একটি ছাদে জন্ম নেয় ছোট্ট একটি বাগান, একটি বারান্দায় বেড়ে ওঠে কয়েকটি গাছ, কিংবা একটি অফিসের কোণে জায়গা করে নেয় সবুজÍতাহলে হয়তো মানুষ আবার প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কটা নতুন করে গড়ে তুলতে পারবে।
সেই সম্পর্ক ফিরিয়ে আনতেই কাজ করে চলেছেন মো. রকিবুল আমিন। তাঁর স্বপ্ন একটি সবুজ শহর, একটি সবুজ বাংলাদেশ এবং আগামী প্রজন্মের জন্য আরও বাসযোগ্য পৃথিবী।







