নিম্নচাপ ও তীব্র মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা কয়েক দিনের রেকর্ড ভাঙা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের বন্যা পরিস্থিতি এক ‘ভয়াবহ’ ও ‘নজিরবিহীন’ রূপ ধারণ করেছে। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদকে সম্পূর্ণ জলমগ্ন করে চরম মানবিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগে টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। নদীর পানি বৃদ্ধি, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় পাঁচ জেলার ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গতকাল প্রকাশিত সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। এছাড়া চট্টগ্রামে আটজন, বান্দরবানে ছয়জন এবং রাঙ্গামাটিতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে চট্টগ্রাম নগরীসহ জেলার ১৬ উপজেলায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মোট ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৬৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ২৩ হাজার ৮৫৩ জন।
বন্যার্তদের সহায়তায় সরকার ৭০০ টন চাল ও ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩০০ টন চাল, ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ১৮ হাজার ৩৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য আরও ৪০০ টন চাল ও ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা মজুত রয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ১২ জুলাই পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে।
সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ:
সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। দুই উপজেলায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।গতকাল বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নে আকস্মিক বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে আশিক (১১) ও মিরাজ (৬) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দুর্গম উপকূলীয় অনেক ইউনিয়নে এখনো ত্রাণ পৌঁছায়নি। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় যোগাযোগ ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাতকানিয়ার কাছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের একটি অংশ বৃহস্পতিবার থেকে পানির নিচে রয়েছে। যান চলাচল এখনো চালু থাকলেও পানি আরও বাড়লে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সাতকানিয়ায় সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলে বাজালিয়া, কেওচিয়া, ছদাহা, কালিয়াইশ, ধর্মপুর, খাগরিয়া, আমিলাইশ, ঢেমশা, নলুয়া, চরতি ও পুরানগড় ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বসতঘর, কৃষিজমি, মাছের ঘের, বাজার ও গ্রামীণ সড়ক। অনেক এলাকায় নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম।বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকটেও পড়েছেন বাসিন্দারা। ছদাহা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোরশেদুর রহমান জানান, তার ইউনিয়নের অন্তত পাঁচটি ওয়ার্ড পুরোপুরি প্লাবিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘অনেক এলাকায় কোমর থেকে গলা সমান পানি। প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন থেকে এক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বন্যার পানির কারণে তা এখনো আনা সম্ভব হয়নি।’
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, চার লাখের বেশি মানুষ এখনো পানিবন্দি রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রায় অর্ধেক কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৎস্য খাতের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা যায়নি। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো, যেখানে সড়ক যোগাযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক এখনো বিচ্ছিন্ন রয়েছে।’ তিনি আরও জানান, দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে সেনাবাহিনী স্পিডবোট ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পাশের বাঁশখালী উপজেলায়ও বন্যার পানি ১৪টি ইউনিয়নেই ছড়িয়ে পড়েছে। জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় খানখানাবাদ, কাথারিয়া, বাহারছড়া, গণ্ডামারা, শেখেরখীল, সরল, ছনুয়া ও গুণাগরী ইউনিয়নে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, হাজার হাজার কাঁচাঘর ধসে পড়েছে। টানা তিন দিন ধরে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও ওষুধের সংকটও বাড়ছে। বাহারছড়ার বাসিন্দা শাহেদ হোসেন বলেন, দুর্গম কয়েকটি ইউনিয়নে এখনো সরকারি ত্রাণ পৌঁছেনি। বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন জানান, উপজেলার প্রায় অর্ধেক এখনো পানির নিচে এবং এক লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত ৪৬ টন চাল, ৫ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ৬ হাজার জনের রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। তবে পানি বেশি থাকায় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় কয়েকটি এলাকায় এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।’
এদিকে ফটিকছড়ি, রাউজান, হাটহাজারী, মিরসরাই ও আনোয়ারার নিম্নাঞ্চলও বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে বসতঘর, কৃষিজমি ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কক্সবাজারেও বন্যায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। চকরিয়া ও মাতামুহুরীতে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা প্লাবিত হওয়ায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এতে যান চলাচল ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নলকূপগুলো বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক বাড়িতে কোমর থেকে বুকসমান পানি উঠেছে এবং রান্নাঘর ডুবে যাওয়ায় বহু পরিবার রান্না করতে পারছে না। এদিকে ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ধস ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাঙ্গামাটির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক উপত্যকায় আটকে পড়া ৪৬১ জন পর্যটককে উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ডুবে যাওয়া সড়কগুলো নৌকায় পার করে দেওয়ার পর তারা সড়কপথে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হন। নিরাপত্তাঝুঁকি অব্যাহত থাকায় বান্দরবান জেলা প্রশাসন জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের সময় আরও তিন দিন বাড়িয়েছে। ফলে পর্যটনকেন্দ্রগুলো ১৫ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (রাইমস) ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের যৌথভাবে জারি করা বিশেষ পাহাড়ধস সতর্কতা বুলেটিনে বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং ভারতের উত্তর-পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ ও সংলগ্ন এলাকায় সুস্পষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে ১২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
বুলেটিনে পাঁচটি জেলাকেই পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ৯ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে টেকনাফে ১৬৯ মিলিমিটার, রাঙ্গামাটিতে ১০৬ মিলিমিটার এবং কক্সবাজারে ৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
*খোয়াইয়ের বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জে ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি:
টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জের তিন উপজেলার চার ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের একটি অংশ ভেঙে যায়। বাঁধ ভেঙে সদর উপজেলার লস্করপুর ও পইল ইউনিয়ন, বাহুবল উপজেলার লামাতাশি ইউনিয়ন এবং বানিয়াচং উপজেলার মক্রমপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানি বাড়তে থাকায় অনেক পরিবার গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে গেছে। বানিয়াচংয়ের রাধাপুরেও বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করেছে। এতে আশপাশের হাওর এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে বন্যার পানি। অন্যদিকে মছুলিয়া পয়েন্টে শহররক্ষা বাঁধ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ রক্ষায় কাজ করছেন।
এদিকে হবিগঞ্জ শহরের কামড়াপুর ও দানিয়ালপুর এলাকাও প্লাবিত হয়েছে। পানি বেড়ে যাওয়ায় হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের কয়েকটি অংশ তলিয়ে গেছে, ফলে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পানির উচ্চতা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় আরও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তারা দ্রুত নদীভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ, পর্যাপ্ত ত্রাণ বিতরণ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে টানা বৃষ্টিতে বাগেরহাটেও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। নিম্নাঞ্চল ও কয়েকটি সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব পড়েছে।
উপকূলীয় জেলাজুড়ে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর মোংলা সমুদ্রবন্দরের জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রেখেছে।
*বান্দরবানের সাথে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ:
শুক্রবার সারাদিন বন্যার পানি কমলে ও গতকাল শনিবার টানা ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বান্দরবানে আবারও পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। ফলে সড়কের ওপর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বান্দরবানের সাথে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। অপরদিকে কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজঘাট সেতু ধসে পড়েছে। এতে শনিবার (১১ জুলাই) সকাল থেকে রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয় সিএনজি চালক নুনু বাদশা ও মানিক জানান, দুধপুকুরিয়া এলাকার রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর তীব্র পানির স্রোতে ব্রিজঘাট সেতু ধসে পড়ে। ফলে সড়কটি দিয়ে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বান্দরবান সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার ফলে পানির তীব্র স্রোতে ব্রিজঘাট সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধসে পড়েছে। যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের জন্য সওজের একটি টিম প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসহ প্রস্তুত রয়েছে। তবে বালাঘাটা ও স্বর্ণমন্দির এলাকায় সড়কের ওপর এখনো পানি থাকায় সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, পানি কমে গেলে দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের কাজ শুরু করা হবে।
* রাঙামাটির ফারুয়া ইউনিয়ন পানির নিচে শুরু হয়েছে খাবার সংকট
রাঙামাটির বিলাইছড়ির দুর্গম ফারুয়া ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। পাশাপাশি সেখানে দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট। তবে ওই এলাকায় এখনও পৌঁছায়নি কোন সরকারি ত্রাণ। টানা দ্বিতীয় বাবের মতো পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এলাকাটিতে।
শনিবার সকালে ফারুয়া ইউনিয়নের উলুছড়ি গ্রামের বাজার ও বেশকিছু বাড়ি উজানের পানির স্রোতে তলিয়ে গেছে। স্থানীয়রা জানান, গত সোমবার থেকে টানা বর্ষণে ফারুয়া ও উলুছড়ি ডুবে যায়। বৃহস্পতিবার বৃষ্টি কমে আসায় পানিও কমতে শুরু করে। তবে শুক্রবার রাতের বৃষ্টিতে আবারও তলিয়ে যায় উলুছড়ি গ্রামের বাজার ও বেশকিছু বাড়ি।
স্থানীয় বাসিন্দা মিলন তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, আশপাশের স্কুলে ঠাঁই নিয়েছে গ্রামের মানুষ। দুর্গম ও মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় এখনও ঠিকমতো ত্রাণ পৌঁছায়নি। বিলাইছড়ির স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হক বলেন, ফারুয়া যাওয়ার কোনও অবস্থা নাই এখন। তীব্র স্রোত নামায় নৌকা নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। আবার সীমান্ত সড়ক ভেঙে যাওয়ায় সেদিন দিয়েও গাড়ি চলাচল বন্ধ। কয়েকটি বাজার ডুবে যাওয়ায় খাদ্য সংকট দেখা দিচ্ছে বলে জেনেছি।
রাঙামাটির বিলাইছড়ির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকির হোসেন বলেন, উপজেলায় ২৫ হাজার মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ফারুয়া ইউনিয়নে প্রায় ১২ হাজার মানুষ। তীব্র স্রোতের কারণে সেখানে ত্রাণ পৌঁছানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না নিয়মিত। আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। যেহেতু ত্রাণ পৌঁছানো যাচ্ছে না কোনোভাবেই। বলেছি, স্থানীয় বাজার থেকে কিনে ব্যবস্থা করার জন্য।
* ৫ বিভাগে ভারি বৃষ্টির আভাস:
দেশের চার সমুদ্রবন্দর থেকে সতর্কতা সংকেত নামিয়ে ফেলা হয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। গতকাল শনিবার আবহাওয়ার সবশেষ পরিস্থিতি বিষয়ক এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে সংকেত নামিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে। তবে, উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে এদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ নদীবন্দর সম্পর্কিত এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, টাংগাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং সিলেট অঞ্চলের উপর দিয়ে দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘন্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি, বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোতে তাই এক নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। এদিন দেশের পাঁচটি বিভাগে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
ভারি বৃষ্টিপাতজনিত এক সতর্কবার্তায় আবহাওয়া অধিদপ্তর বলেছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে শনিবার দুপুর ১২টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘন্টায় রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি (৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার) থেকে অতিভারি (৮৮ মিলিমিটারের বেশি) বর্ষণ হতে পারে। আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক গতকাল শনিবার বলেন, “আগামী কয়েকদিন ভারি বৃষ্টিপাত থাকতে পারে দেশের পাঁচটি বিভাগে। ১৪ জুলাইয়ের পর থেকে বৃষ্টিপাতের যে প্রবণতা সেটা কিছুটা কমে যেতে পারে।”ভারি বৃষ্টিপাতের প্রভাবে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি জেলায় শনি ও রোববার ভূমিধস হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
অধিদপ্তরের শনিবার সকালের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, ভারতের মধ্য উত্তর প্রদেশ এবং ওই এলাকায় লঘুচাপটি অবস্থান করছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে।
*ত্রাণ তৎপরতা জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর:
বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানান, প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং জেলা প্রশাসনগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
*বন্যার্তদের অতন্দ্র প্রহরী সরকার- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী:
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেইন এমপি বলেছেন, বন্যার্তদের দুর্ভোগ লাঘবে সরকার সম্ভব সকল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এবং আগামী দিনগুলোতে এ কার্যক্রম আরও জোরদার হবে। পাশাপাশি এ সমস্যার টেকসই সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে; বন্যার্তদের অতন্দ্র প্রহরী সরকার। তিনি বলেন, খাদ্য সামগ্রী, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিশুদ্ধ পানি সবই পর্যাপ্ত পরিমাণে বিতরণ করা হচ্ছে। যাঁদের ঘর ডুবে গেছে তাঁদের নিকটস্থ আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে প্রতিমন্ত্রী অনুরোধ জানান।
প্রতিমন্ত্রী গতকাল সকালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ শেষে আয়োজিত এক সভায় এসব কথা বলেন। ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর।







