নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার খারনৈ ইউনিয়নের বগাডুবি গ্রামের বাসিন্দা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী(হাজং) সম্প্রদায়ের শেফালী হাজং। তার তিপেন্দ্র হাজং ও ছেলে মিতুল হাজং নিয়ে তার সংসার। পরিবারটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও জীবিকা নির্বাহের সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আর্থসামাজিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় ধরনের ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
‘সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প’ সুবিধাভোগী শেফালী হাজং বলেন, ‘প্রকল্প থেকে পাওয়া ভেড়া থেকে ২৫ টি ভেড়া হয়েছে। গত ঈদে ৫টি ভেড়া ৩০ হাজার টায় বিক্রি করেছেন। সেই টাকা দিয়ে ঘর মেরামত করেছেন। কিছু টাকা ছেলের স্কুলে শিক্ষার খরচ করেছেন।
কলমাকান্দার গোপালবাড়ি চেংনিয়ের সুজিতা হাজং একজন সুবাধাভোগী। তিনিও প্রকল্প থেকে সুবিধা পেয়ে নিজের আত্ন সামাজিক উন্নয়ন করেছেন। তিনি বলেন, ‘১ বকনা থেকে পাঁচটি গরু হয়েছে। প্রতিদিন একটি গরু থেকে ৪/৫ লিটার দুধ পায়। কিছু দুধ নিজেরা খায় এবং কিছু বিক্রি করে পরিবারের খরচ ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালান।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, আইএমইডি, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প কার্যক্রম পরবর্তী এর আউটপুট পর্যবেক্ষণ শেষে সুফলভোগী নৃ-গোষ্ঠীদের আর্থিক স্বনির্ভরতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, জীবনমানের উন্নয়ন, প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনা সূচকে ‘তাৎপর্যপূর্ণ উন্নয়ন’ হয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানাগেছে, সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পটি বর্ধিতকরণ প্রকৃয়াধীন আছে। ইতিমধ্যে মৎস্য ও প্রানী মন্ত্রাণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে স্টিয়ারিং কমিটির সভায় অর্থ, পরিকল্পনা আইএমইডিসহ সকল নীতি নির্ধারণী মন্ত্রণালয় প্রকল্পটির ২ বছর বৃদ্ধির বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে এসছেন। এ প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ের সচিব ও মন্ত্রী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দিয়েছেন।
সম্প্রতি সমতল ভূমিতে বসবাসরত অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক ও জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে নেত্রকোনার কলমাকান্দায় শতাধিক উপকারভোগী পরিবারের মাঝে বিনামূল্যে ছাগল ও গৃহনির্মাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের আয়োজনে ‘সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প’ এর আওতায় এ বিতরণ কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পরিবারগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বাবলম্বী করে তোলা এবং টেকসই জীবিকায়নের সুযোগ সৃষ্টি করাই এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। প্রকল্পের আওতায় বাছাইকৃত একশো জন উপকারভোগীর প্রত্যেককে দুটি করে ছাগল, পাঁচটি করে ফ্লোরম্যাট এবং গৃহনির্মাণের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রদান করা হয়।অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বিতরণকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ছাড়া দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।’
উপকারভোগীদের উদ্দেশে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘প্রদত্ত এই সম্পদ যেন যথাযথভাবে ব্যবহার করে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটানো যায়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।’ এছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে ভাষা চর্চা কার্যক্রম চালুর বিশেষ উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান তিনি।
প্রকল্প পরিচালক(পিডি) ড. অসীম কুমার তার বক্তব্যে বলেন,‘এই প্রকল্পটি শুধু বিভাগীয় কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই বিবেচিত নয়। এর মধ্য দিয়ে পিছিয়ে পরার জনগোষ্ঠীকে মূলধারার সাথে যুক্ত করে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার দায়বদ্ধতাও আছে । ইতিমধ্যে বাস্তবায়নকৃত কার্যক্রমের মাধ্যমে নৃ- গোষ্ঠীর জীবন মানোয়ন্নয়, পুষ্টির উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় হতে ১০০ জন নৃ-গোষ্ঠী সুফলভোগীদের মাঝে ২ টি করে ছাগল, গৃহ নির্মাণ উপকরণ, ৫০কেজি দানাদার খাদ্য বিতরণ করা হয়।’
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান, প্রকল্প পরিচালক ড. অসীম কুমার, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কনিকা সরকার, কলমাকান্দা থানার ওসি (তদন্ত) সজল কুমার সরকার, কলমাকান্দা প্রেসক্লাবের সভাপতি শেখ শামীম ও সাধারণ সম্পাদক ওবাইদুল হক পাঠানসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সুধীসমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ।
উপকারভোগী পরিবারগুলো জানিয়েছেন, সরকারি সহায়তা পেয়ে তারা ব্যাপক সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা প্রকল্পটিকে তাদের জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আর্থসামাজিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় ধরনের ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।







