দক্ষিণ এশিয়ার ওপর দিয়ে নজিরবিহীন ও প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তাপমাত্রা পৌঁছেছে বিপজ্জনক উচ্চতায়। ফলে ব্যাহত হচ্ছে কয়েকশ কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন। এতে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যর সবচেয়ে প্রভাবশালী গণমাধ্যম আল-জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রীষ্মের এ সময়ে তীব্র গরমে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠতে দেখা গেছে। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে তাপমাত্রা ঋতুভিত্তিক গড় সীমার চেয়ে অনেক ওপরে উঠে গেছে। এতে এই অঞ্চলের কয়েক শ কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বা তার বেশি রেকর্ড করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এই চরম আবহাওয়াকে ‘বিপর্যয়কর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ তীব্র দাবদাহে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত ঢাকা, ফরিদপুর, রাজশাহী ও পাবনা জেলায় তাপমাত্রা ৩৭ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করেছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব। ২০২৪ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশে মোট ২৪ দিন তাপপ্রবাহ অনুভূত হয়, যা গত ৭৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১৯ সালে ২৩ দিন তাপপ্রবাহের রেকর্ড ছিল। দেশের কিছু জেলায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসও ছাড়িয়ে গেছে।
প্রতিবেশী ভারতেও পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। ইন্ডিয়া মেটিওরোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট (আইএমডি) জানিয়েছে, ভারতের পশ্চিম ও উপকূলীয় অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। উত্তর-পশ্চিম ও মধ্য ভারতের কিছু অংশে তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। গত ২৬ এপ্রিল মহারাষ্ট্রের আকোলা ও অমরাবতী শহরে তাপমাত্রা ছিল যথাক্রমে ৪৬.৯ ও ৪৬.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র গরমে পশ্চিমবঙ্গে দুই স্কুলশিক্ষকসহ বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এমনকি ২৪ এপ্রিল বিশ্বের ১০০টি উষ্ণতম শহরের মধ্যে ৯০টিরও বেশি ছিল ভারতের।
পাকিস্তানেও এই তাপপ্রবাহ প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি সিন্ধু প্রদেশের করাচিতে গরমে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সোমবার করাচির তাপমাত্রা ছিল ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ২০১৮ সালের পর শহরটির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। সিন্ধুর জ্যাকোবাবাদ এবং সুক্কুর শহরে তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
অকাল ও তীব্র তাপপ্রবাহের কারণ:
বছরের শুরুতেই এমন তীব্র তাপপ্রবাহের পেছনে বায়ুমণ্ডলীয় উচ্চচাপবলয়কে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভারতী ইনস্টিটিউট অব পাবলিক পলিসির গবেষণা পরিচালক আঞ্জাল প্রকাশ জানান, বায়ুমণ্ডলে উচ্চচাপের কারণে গরম বাতাস ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি আটকে গিয়ে একটি ‘ডোম’ বা গম্বুজের মতো তৈরি করেছে। এর ফলে গরম বাতাস ওপরে উঠে ঠাণ্ডা হতে পারছে না। এ ছাড়া প্রাক-বর্ষার অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এবং ‘এল নিনো’র প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে এল নিনোর পূর্ণ বিকাশ ঘটার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যা বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক কার্তিকেয়া ভাতোটিয়া বলেন, এই তীব্র তাপ সরাসরি শরীরের ওপর প্রভাব ফেলে। এতে হৃদরোগের ঝুঁকি, কিডনিতে আঘাত এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের অবনতি ঘটে। বিশেষ করে বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। দাবদাহের প্রভাব সব শ্রেণির মানুষের ওপর সমান নয়। নিচু আয়ের শ্রমিকরা, যারা বাইরে কাজ করতে বাধ্য হন, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ভারতে প্রায় ৩৮ কোটি শ্রমিক সরাসরি রোদে কাজ করেন। কাজের কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় তাদের আয় কমছে, যা পুষ্টি ও চিকিৎসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশেও নিম্ন আয়ের মানুষ একই রকমভাবে ভুগছেন।
ভারত তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম, কুলিং সেন্টার এবং বাধ্যতামূলক বিশ্রামের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, ক্রমবর্ধমান চরম তাপমাত্রার বিপরীতে এই পরিকল্পনাগুলো এখনো প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে পুরোপুরি সুরক্ষা দিতে পারছে না। পাকিস্তান ও বাংলাদেশেও স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং নাগরিকদের সরাসরি সূর্যের আলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এ ধরনের চরম আবহাওয়ার তীব্রতা ও স্থায়িত্ব দিন দিন বাড়ছে।








