বিশেষ প্রতিনিধি, কক্সবাজার থেকে ফিরে:
পর্যটন নগরী কক্সবাজারে দীর্ঘদিনের অভিশাপ ‘বিশুদ্ধ পানির সংকট’। একদিকে সমুদ্রের নোনা জল, অন্যদিকে মাটির গভীরে হারিয়ে যাওয়া মিঠা পানি এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আসছিল পর্যটন রাজধানীর পাঁচ লক্ষাধিক বাসিন্দা। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাঁকখালী নদীর পানি শোধনাগার প্রকল্পের পরীক্ষামূলক সরবরাহ শুরু হয়েছে, যা শহরবাসীর দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি নিয়ে এসেছে। ইতিমধ্যে পানির সংযোগ দিতে স্থানীয় পৌরসভা থেকে মাইকিং করা হয়েছে।
সংকটের পটভূমি ও গভীরতা:
কক্সবাজার পৌরসভার আয়তন মাত্র ৩২ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটার হলেও এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যাধিক।জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজার পৌর এলাকায় ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির স্তর প্রতি বছর গড়ে ৬ থেকে ১৪ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে। শহরের কলাতলী ও টেকপাড়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এখন ৯০ থেকে ১১০ ফুট গভীরে গিয়ে স্বাদু পানি পাওয়া যাচ্ছে, যা এক দশক আগেও ছিল অনেক কম গভীরে। সেখানে যে পানি পাওয়া যাচ্ছে, তাতেও রয়েছে তীব্র লবণাক্ততা ও লৌহ দূষণ। একারণে শহরের বাহারছড়া, টেকপাড়া ও নুনিয়াছড়ার মতো এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। ডিপিএইচই সূত্র জানায়, কক্সবাজার জেলায় বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার গভীর ও অগভীর নলকূপ চালু রয়েছে। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক নলকূপ থেকেই অনিয়ন্ত্রিতভাবে পানি উত্তোলনের ফলেও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বেড়েছে।
টেকপাড়ার গৃহিণী সাদিয়া আক্তার মিলির ভাষ্যমতে, তার যৌথ পরিবারের জন্য প্রতিদিন আধা কিলোমিটার দূর থেকে পানি বয়ে আনা ছিল এক দুঃসহ লড়াই। অনেকেরই গৃহস্থালি কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে অ্যালার্জি ও চুলকানির মতো চর্মরোগ নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে পানি শোধনাগার হওয়ায় তিনি আশার আলো দেখছেন।
বাহারছড়ার বাসিন্দা আব্দুল মান্নান বলেন, ‘পানির পানি কিনতে হয়। বাড়িতে পানি ব্যবহার করলে চুলকানি ও অ্যালার্জির সমস্যা হয়। গত দুই বছরে তিনবার বাড়ি বদল করেছি।’ একই অভিযোগ করেছেন নুনিয়াছড়ার আব্দুল আজিজ। তিনি বলেন, ‘নলকূপ থেকে শুধু লবণাক্ত পানি বের হয়। আমরা যতই গভীরে যাই না কেন, নোনা পানি পাওয়া যায়।’
পর্যটন শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব:
শুধু আবাসিক এলাকা নয়, সংকটের আঁচ লেগেছে কক্সবাজারের প্রাণ পর্যটন শিল্পেও। কয়েকশ হোটেল-মোটেল জোন প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার বোতলজাত ও বেসরকারি শোধনাগারের পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে এই চাহিদা চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়, যা পর্যটন ব্যবসার ব্যয় বাড়ায় ও পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
পাওয়া যাচ্ছে সুপেয় পানি:
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে ‘কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন কার্যক্রমে জরুরী সহায়তা’ প্রকল্পের সহায়তায় বাঁকখালী নদীর ওপর নির্মিত সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে।
ডিপিএইচই সূত্রে জানাগেছে, প্রথমে সরাসরি বাঁকখালী নদী থেকে পানি সংগ্রহ করা হবে। তা জমা হবে ইনটেক পাম্প স্টেশনে। তার জন্য স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। যার মাধ্যমে পানি ও আবর্জনা আলাদা করা হবে। সংগৃহীত পানি ‘রেপিড মিক্সিং’ পদ্ধতিতে পরিশোধন করে খাবার উপযোগী করা হবে। সেই পানি ৫টি পয়েন্টে স্থাপিত ট্যাংক তথা জলাধারে পাইপ লাইনের মাধ্যমে জমা করা হবে। সেখান থেকেই সরবরাহ করা হবে খাবার উপযুক্ত বিশুদ্ধ পানি। বর্তমানে এই পানি এখন নগরীর অনেক জায়গায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের কলাতলিতে কথা হয় রিক্সা চালক আয়নাল হোসেনর সাথে। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা আগে পানির জন্য অনেক কষ্টে ছিলাম। এমনও দিন গেছে যখন আমার মাকে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হত এবং মাত্র এক কলসি পানির জন্য তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হত।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন আমার মা বাসাতে খাবার উপযোগী পানি পাচ্ছে। আর আমাদের পানির কষ্ট নাই।’
কক্সবাজার সদরের গ্রীণভ্যালী বিজনেস সেন্টারের পানির সুবিধা পাওয়া জসিম উদ্দিন সিদ্দিকী বলেন, ‘ আমার মার্কেটে এখন স্বচ্ছ পানি। এই পনি পান করা যায়। এই পানি পান করলে মনেহয় ডাবের পনি খাচ্ছি।’
সার্বিক অবস্থা:
কক্সবাজার জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী আবুল মনজুর বলেন, ‘ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক এর আর্থিক সহায়তায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন জরুরী সহায়তা প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজার সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে কক্সবাজার পৌরসভাতে পানি সরবরাহ করার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে প্রকল্পের অধীনে ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, ফিডার লাইন, ট্রান্সমিশন লাইন, ডিস্ট্রিবিউশন লাইন ওভারগ্রাউন্ড রিজার্ভার, ওভারহেড রিজার্ভার সহ প্রায় সকল কাজ শেষ। ৫ হাজার হোল্ডিংয়ে সংযোগ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে যারমধ্য প্রায় ৩ হাজার টি সংযোগ দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। বাকি সংযোগ দেওয়ার কাজ চলছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এই টোটাল ট্রিটমেন্ট প্লান্টের ক্যাপাসিটি প্রতি ঘন্টায় ১০ লাখ লিটার পরিশোধন করতে পারবে। সেই হিসাবে যদি আমরা ১৫ ঘণ্টা বা ১৬ ঘণ্টা চালাই, এতে শহরে প্রায় ৪০থেকে ৪৫ শতাংশ কভারেজ দেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরতা কমবে।’
পানির সংযোগ দিতে মাইকিং:
কক্সবাজার পৌরসভায় দীর্ঘদিনের পানির সমস্যা লাঘবে করতে বাঁকখালী নদীর পানি শোধনাগারের পনি স্থানীয় মানুষের বাসতবাড়িতে পৌঁছে দিতে মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে কক্সবাজার পৌরসভা। তারা পৌরসভা বা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে পানির সংযোগ পাওয়া যাবে এই তথ্যটি জানানোর জন্য ইতিমধ্যে এলাকায় মাইকিং করেছেন। এ বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক মো: শামীম আল ইমরান বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বাড়ির সংযোগ বা হাউস কানেকশনের কাজগুলো করছে। কেউ পানির সংযোগ নিতে চাইলে কেউ পৌরসভায় আবেদন করলে আমরা তাদের সহায়তা প্রদান করছি।’বাসা-বাড়িতে সংযোগ দেওয়ার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম বিতরণ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরোও বলেন, ‘পৌরসভার মাধ্যমে এই প্রকল্পের প্রচারের জন্য আমরা ইতিমধ্যে এলাকায় মাইকিং করেছি। মূলত স্থানীয় প্রশাসন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে সহায়তার জন্যই এই কাজগুলো করা হচ্ছে।’
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে নিরবচ্ছিন্ন পানি সংযোগ দেয়া হবে। পরে চাহিদা অনুযায়ী হয়তো রেশনিংয়ে যেতে হতে পারে। ধাপে ধাপে পুরো পৌর এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।








