চলতি মৌসুমের শুরুতে রাজশাহী অঞ্চলের আম বাগানগুলোতে মুকুলের সমারোহ দেখে বড় স্বপ্ন বুনেছিলেন চাষিরা। সোনালি মুকুলের সেই দৃশ্য ভালো ফলনের জোরালো ইঙ্গিত দিলেও সময়ের ব্যবধানে সেই আশা এখন হতাশায় রূপ নিচ্ছে। তবে রাজশাহীতে শঙ্কা থাকলেও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরা এবং উত্তরের জেলা দিনাজপুরে আমের বাম্পার ফলনের খবর পাওয়া গেছে।
রাজশাহী ও নওগাঁ জেলায় খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, সেখানকার অনেক বাগানেই আশানুরূপ আম নেই। খরা, অনিয়মিত আবহাওয়া ও পোকার আক্রমণে বিস্তীর্ণ এলাকায় গাছ থেকে ঝরে পড়েছে আমের গুটি। এতে করে উৎপাদন ‘কমে যাওয়ার’ শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে পাশের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে পরিস্থিতি তুলনামূলক
দিনাজপুর জেলার হাকিমপুর ও ঘোড়াঘাট উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, বাগানে কিংবা বসত বাড়ির সব গাছে প্রচুর আম ধরেছে। আবার আম ব্যবসায়ীরা বাগান মালিকদের নিকট থেকে বাগান ক্রয় করার জন্য যোগাযোগ করছেন। এই জেলায় আমরুপালি, ন্যাংড়া ভোগ, নাগ ফজলি, হাঁড়িভাঙা, ফজলি সহ বিভিন্ন জাতের আম চাষ হয়ে থাকে। মৌসুমের শুরুতে রাজশাহী অঞ্চলের বাগানজুড়ে সোনালি মুকুলের সমারোহ দেখা দিলেও সময়ের ব্যবধানে বদলে গেছে দৃশ্যপট। খরা, অনিয়মিত আবহাওয়া ও পোকার আক্রমণে ঝরে পড়ছে আমের গুটি। ফলে মিলছে না প্রত্যাশিত ফলন। রাজশাহী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়া এই পরিস্থিতি চাষিদের স্বপ্নে বাধার পাশাপাশি তৈরি করেছে উৎপাদন ঘাটতির ‘আশঙ্কা’। তবে এখনো গাছে যে পরিমাণ আম রয়েছে, তা যদি ভরা মৌসুমে ভালো দামে বিক্রি করা যায়, তাহলে কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজশাহী পবা উপজেলার চাষি আব্দুর রহিম বলেন, ‘ভালো মুকুল এসেছিলো। খরার কারণে টিকিয়ে রাখা যায়নি। কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেব, বুঝতে পারছি না।’
বাগমারা উপজেলার আমচাষি মতিউর রহমান জানান, শুরুতে বাম্পার ফলনের আশা থাকলেও এখন গাছে অর্ধেকেরও কম আম রয়েছে। প্রতিদিনই আম ঝরে পড়ছে। সার, কীটনাশক, সেচ সবকিছুর খরচ বেড়েছে, কিন্তু ফলন কমে গেছে। এতে আমরা দিশেহারা।
গোদাগাড়ী উপজেলার চাষি আজমত আলী বলেন, ‘আম বাঁচাতে সব ধরনের চেষ্টা করেছি। কিন্তু পানি সংকটের কারণে অনেক গাছে ঠিকমতো ফল ধরেনি। এখন যদি বাজারে ভালো দাম না পাই, তাহলে ঋণ শোধ করাই কঠিন হয়ে যাবে।’
দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার রানীগঞ্জ বাজারের মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘আমার বাড়িতে একটি হাঁড়িভাঙা, দুই আমরুপালি, একটি নাগ ফজলি আম গাছ আছে। গাছগুলো বেশি পুরাতন না। তাই সব গাছে পর্যাপ্ত আম ধরে। এবছরও ধরেছে। এসব আম বাড়ির সবাই খেয়ে শেষ করা যায় না। প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনদের বিতরণ করেও বিক্রি করি।’
ঘোড়াঘাট উপজেলার কুলানন্দপুর গ্রামের বাগান মালিক আনোয়ার বলেন, ‘৬ বিঘার উপরে আমার আম বাগান। বাগানে সব জাতের আম গাছ রয়েছে। গত বারের চেয়ে এবার ফলন ভালো আছে। আম ব্যবসায়ীরা বাগান কিনতে আসছেন। আর কয়েক দিনের মধ্যে বাগান বিক্রি করে দিবো।’
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা ইউনিয়নের বড় ভগবানপুর গ্রামের আমচাষি রাশেদুল জানান, এবারের আবহাওয়া আমের জন্য ভালো ছিল। শীত শেষে সময়মতো তাপমাত্রা বৃদ্ধি, স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় অধিকাংশ বাগানে এ বছর মুকুলের পরিমাণ ব্যাপক বেড়েছে। গুটি ঝরাও তুলনামূলক কম হয়েছে। কিন্তু গত কিছুদিনের টানা বৃষ্টিতে আমাদের ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে। সেইসাথে এমন বৃষ্টি থাকলে স্বাদ কমে যাওয়া নিয়ে চিন্তায় আছি।
রংপুরের হাঁড়িভাঙ্গার ভালো ফলনের আশা:
স্বাদ-গন্ধে অতুলনীয় রংপুরের ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের প্রতীক হাঁড়িভাঙ্গা আম। যার সুনাম ছড়িয়েছে বিদেশেও। যার ফলে এই আমটি এখন জিআই পণ্য। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে এই আমকে কেন্দ্র করে রংপুর অঞ্চলে ২৫০ কোটি টাকারও বেশি বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় ৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে হাঁড়িভাঙ্গা আমের চাষ হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহের বৃষ্টি আম বড় হতে ও রসালো হতে সাহায্য করেছে। যদিও মাঝখানে কিছু এলাকায় শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় সামান্য ক্ষতি হয়েছে, তবে সার্বিকভাবে ফলন গত বছরের চেয়ে ভালো হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ ও আমচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত জুন মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে পাকা হাঁড়িভাঙা আম বাজারে মিলবে। এরআগে বাজারে হাঁড়িভাঙা আম পাওয়া গেলেও তা অপরিপক্ব থাকে। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার হাঁড়িভাঙা আমের ‘অন ইয়ার’। এবার গাছে প্রচুর আম ধরেছে, যা গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি। কৃষি বিভাগ আশা করছে, এবার ঠিক সময়ে গাছ থেকে আম পাড়া শুরু হবে।
মিঠাপুকুরের পদাগঞ্জ এলাকার আমচাষি নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘ঝড়ো হাওয়ার কারণে আমের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। সামনে আরও ঝড় হলে লোকসান গুনতে হবে।’ পদাগঞ্জের তরুণ উদ্যোক্তা ও আমচাষি নাজমুল ইসলাম জানান, তিনি ১২ একরের বেশি জমিতে আমের চাষ করেছেন। গত কয়েকদিন আগে শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে বাগানের কিছু ক্ষতি হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, এবার আমের অন ইয়ার। প্রচুর আম ধরেছে। কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করা হচ্ছে। হাঁড়িভাঙা আমের বৈশিষ্ট্য হলো এটি আঁশবিহীন, মিষ্টি ও সুস্বাদু। এই আমের আঁটিও খুব ছোট। চামড়াও পাতলা। প্রতিটি আমের ওজন হয় ২শ’-৩শ’ গ্রাম।
বিশ্ববাজারে বাড়ছে বাংলাদেশি আমের চাহিদা:
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৬ লাখ ৬৬ হাজার মেট্রিক টন। তবে আবহাওয়া সহায়ক থাকলে এবার সেই লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে।
ডিএই’র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে ২১ লাখ ৪৩ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়, যার মধ্যে রপ্তানি হয় মাত্র ৩০৯ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে উৎপাদন প্রায় ২৫ লাখ টন হলেও রপ্তানি হয় ২৮৩ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ২৩ লাখ ৫০ হাজার ৪৯৯ টন, রপ্তানি ১ হাজার ৭৫৭ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ২৭ লাখ ৭ হাজার ৪৫৯ টন, রপ্তানি ৩ হাজার ১০০ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ২৫ লাখ ৮ হাজার ৯৭৩ টন, রপ্তানি হয় ১ হাজার ৩২১ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ লাখ ৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ করে ২৬ লাখ ৭০ হাজার টন আম উৎপাদন হয়, রপ্তানি হয় ২ হাজার ১৯৪ টন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন ২৭ লাখ টন ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ বাংলাদেশের আমের প্রধান রপ্তানি বাজার। ক্ষীরসাপাতি, গোপালভোগ, ফজলি, হাঁড়িভাঙ্গা ও আম্রপালি জাতের আম যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, জার্মানি ও সুইডেনসহ অন্তত ৩৮টি দেশে রপ্তানি করা হয়। গত বছর প্রথমবারের মতো চীনে আম রপ্তানি শুরু হয়।
ডিএই’র তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৮টি দেশে ২ হাজার ১৯৪ মেট্রিক টন আম রপ্তানি করে রেকর্ড গড়েছিল। এবারও রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের আশা, অন্তত ৩ হাজার মেট্রিক টন আম রপ্তানি সম্ভব হতে পারে। নতুন করে মালয়েশিয়া ও জাপানের বাজারেও আম রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
রপ্তানিযোগ্য আম উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত উৎপাদনে বড় কোনো বিপর্যয় দেখা দেয়নি। মে মাস থেকে আম সংগ্রহ শুরু হবে। আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছি। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার রপ্তানিতেও আমরা নতুন রেকর্ড গড়তে পারব।’
চাষিরা মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে শুরুর দিকের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।








