হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এবার নেই বৈশাখের চিরাচরিত উৎসব। নতুন ধান ঘরে তোলার মৌসুমে যেখানে ব্যস্ত থাকার কথা কিষাণ-কিষাণীদের, সেখানে এখন বিরাজ করছে স্থবিরতা ও হাহাকার। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর ফসলের অনিশ্চয়তায় ফিকে হয়ে গেছে পিঠাপুলির আনন্দ, এমনকি শহুরে স্বজনদের আগমনও এবার আর ফেরাতে পারেনি হাওরবাসীর মুখের হাসি।
জানা গেছে, হাওরাঞ্চলের জেলাগুলোর এক-তৃতীয়াংশ জমির ধান কাটতে পারলেও দুই-তৃতীয়াংশ পানিতে ডুবে আছে। কারও সব ধানই তলিয়ে গেছে, কেউবা কিছু কাটতে পারলেও বৃষ্টির কারণে শুকাতে পারেনি। স্তূপ করে রাখা ধানে চারা গজিয়েছে, ধরেছে পচন। চোখের সামনে হাড়ভাঙা খাটুনির ফসল নষ্ট হতে দেখে শোকে পাথর হয়ে পড়েছেন অনেকেই।
হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জের বৈলাকিপুর গ্রামের বাসিন্দা অলিউর রহমান বলেন, ‘রোদ না থাকায় সব ধান পচে গেছে। খাওয়ার উপযোগী এক মণ ধানও টিকবে না। এসব পচা ধান বিক্রি করা যাবে কি না, তাও জানি না। যদি কেউ নেয়ও, দাম পাওয়া যাবে সামান্য। এখন আর কৃষিকাজ করে কোনো লাভ নেই।’
নতুন বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুর শতমুখা গ্রামের মাহবুবুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘খোয়াই নদীতে সামান্য পানি বাড়লেই হাওরের সব জমি তলিয়ে যায়। এবার ধান পাকা শুরু করতেই সব তলিয়ে গেল। দু-এক কেদার জমির ধান কাটতে পারলেও তাতে পচন ধরেছে।’
তিনি আরোও বলেন, ‘ধান তোলার সঙ্গে চলে পিঠাপুলির উৎসব। এবার সেই আনন্দ নেই, কারো মুখে হাসি নেই।’
বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুর শতমুখা গ্রামের বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘এবার ধান পাকা শুরু হতেই সব পানিতে তলিয়ে গেছে। দুয়েক কেদার জমির ধান কাটতে পারলেও শুকাতে পারিনি। ধানে পচন ধরেছে। বৈশাখ এলেই আমাদের মনে এক অন্যরকম আনন্দ দেখা দেয়। নতুন ধান কাটব। সারা বছরের খাবার জোগাড় করব। আত্মীয়স্বজন আসবে, নতুন ধানের পিঠার উৎসব হবে। কিন্তু এবার কী দিয়ে আনন্দ করব। নিজেরই তো খাবার নেই।’
মৌলভীবাজার জেলার কাউয়াদিঘি হাওরের কৃষক লিপন মিয়া বলেন, ‘পাঁচ একর জমির মধ্যে মাত্র এক একর জমির ধান কাটতে পেরেছি। বাকি জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। দুদিন ধরে রোদ থাকায় আধা পাকা কাটা ধান শুকানোর চেষ্টা করছি। তবে হাওরে ডুবে যাওয়া ধান আর ফিরে পাবো না।’
হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, হাওড় এলাকায় কাটা হয়েছে ২৯ হাজার ৮৩৫ হেক্টর এবং নন হাওড় এলাকায় কাটা হয়েছে ১৪ হাজার ৯০৪ হেক্টর জমির ধান। এখনো কাটার বাকি আছে ৭৮ হাজার ৯০৫ হেক্টর জমির ধান। পানিতে পুরোপুরি নিমজ্জিত রয়েছে ১০ হাজার ৪৩৯ হেক্টর জমির ধান।
দিশাহারা কৃষকের আর্তনাদ:
দুদিন ধরে মৌলভীবাজারের আকাশে সূর্যের দেখা মিলেছে। এতে অনেক কৃষক তাদের কাটা ধান শুকাচ্ছেন। তবে হাওরে যেসব ধান পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে, এগুলো আর ঘরে তোলার সুযোগ নেই কৃষকের। নন হাওর এলাকা থেকে পানি কমে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত ধান কিছুটা হলেও কাটতে পারছেন কৃষকরা।
তবে, কিশোরগঞ্জের কৃষক রোদের দিকে তাকিয়ে আছেন। যদিও কিছু জায়গায় কিঞ্চিত রোদের দেখা মিললেও তাতে তেমন কোন উপকার পাচ্ছেন না কৃষকরা। বেশিরভাগ কুষকের ভেজা ধান খলায় স্তূপ করে রাখা। রোদ না থাকায় সেগুলোতে গজিয়েছে অঙ্কুর। তেমনি কিশোরগঞ্জের ইটনার কৃষক কামরুল হাসান। তিন একর জমিতে বোরো আবাদ করতে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করেছিলেন তিনি। কিন্তু অতিবৃষ্টি আর উজানের ঢলে অর্ধেক ফসল তলিয়ে গেছ, যা বাঁচানো গেছে, তা-ও আধাপাকা অবস্থায় কাটতে হয়েছে। এখন সেই ধান তিনি বিক্রি করছেন মাত্র ৬৫০ টাকা মণে। উৎপাদন খরচের হিসাবে যা মণে ৩০০-৪০০ টাকা লোকসান।
ভেজা ধানের পাশে দাঁড়িয়ে হতাশ কণ্ঠে এসব কথা জানান কামরুল হাসান। মলিন মুখে বলেন, ‘ঋণ শোধ করমু না সংসার চালামু, এই চিন্তায় আছি।’
স্থানীয় কৃষকরা জানান, গত বছর এ সময় ধানের দাম তুলনামূলক বেশি ছিল। কিন্তু এবার একদিকে দুর্যোগ, অন্যদিকে দামের পতন, দ্বিমুখী চাপে পড়েছেন তারা। উৎপাদন খরচ যেখানে মণপ্রতি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, সেখানে ৭০০ টাকায় বিক্রি মানে মণপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা লোকসান। অষ্টগ্রামের আলীনগর গ্রামের কৃষক তৌহিদ বলেন, ‘শ্রমিক সংকট, বাড়তি মজুরি, আবার জমিতে পানি থাকায় হারভেস্টারও নামানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। এখন বাঁচমু কেমনে? এভাবে চলতে থাকলে বাপ-দাদার পেশা কৃষি ছাড়তে হবে।’
জেলার কয়েকটি হাওরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইটনা, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, নিকলীসহ বিভিন্ন এলাকায় একই অবস্থা। কোমর পানির মধ্যেই ধান কাটছেন কৃষকরা। খলায় এনে শুকাতে না পেরে ভেজা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অনেক জায়গায় সেই ধানে অঙ্কুর গজাচ্ছে। মিঠামইনের গোপদীঘির গ্রামের কৃষক আলাল মিয়া বলেন, ‘ঋণ করে সাত বিঘা জমিতে ধানচাষ করেছি। খলায় আনার পর ৬০০-৭০০ টাকা দাম বলে। ভেজা ধান কেউ নিতে চায় না। সরকার ১ হাজার ৪৪০ টাকায় ধান কিনবে বলে শুনেছি, তবে সেই খবরও ঠিকমতো পাইনি। পেলেই বা কী, তলিয়ে যাওয়া ধানের রং ও ভালোমতো না শুকানোয় সরকারি গুদামে ধান নেবে না।’নিকলীর কৃষানি আমেনা খাতুন বলেন, ‘রোদ নাই, ধান শুকায় না। খলাতেই নষ্ট হচ্ছে। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। সরকারি গুদামে দিতে গেলে শুকনো ধান লাগে, চকচকে রং লাগে সেই সুযোগ তো এবার আমরা পাইনি।’ ধান ব্যবসায়ী মজলু খাঁ বলেন, ‘ভেজা ধান কিনলে ঝুঁকি বেশি থাকে। শুকাতে খরচ, ওজন কমে যাওয়া ও মান নষ্টের কারণে কম দামেই ধান কিনছি।’
তবে কৃষকদের অভিযোগ, সংকটাবস্থার সুযোগে ফঁড়িয়ারা ইচ্ছেমতো দাম চাপিয়ে দিচ্ছে। গত রোববার থেকে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জেলা খাদ্য বিভাগের তথ্য মতে, এলএসডির মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হচ্ছে ও মূল্য ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে।
হাওরাঞ্চলে এবার বোরো মৌসুমে প্রায় সব কৃষকের অবস্থাই এমন। সরকারিভাবে কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা, অর্থাৎ মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা দাম নির্ধারণ থাকলেও বাস্তবে সেই তার কোনো প্রতিফলন নেই। খলা থেকে মাত্র ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকায় ধান কিনে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা।
কিশোরগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, এ মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়। হাওড়াঞ্চলে ১০ সহস্রাধিক হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৬ হাজারেরও বেশি বোরো চাষি।এর মধ্যে সোমবার বিকেল পর্যন্ত অতিবৃষ্টি ও ঢলে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রায় ৪৯ হাজার কৃষক।
এই ধানে ভালো চাল হবে না:
হাওরের কৃষি কতটা অনিশ্চিত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই অনিশ্চয়তা দিন দিন বাড়ছে। সেখানকার কৃষকের উৎপাদিত ধানের প্রায় অর্ধেকই নষ্ট হয়ে গেছে, যা একজন প্রান্তিক কৃষকের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। সুনামগঞ্জে হাওরের উত্তরপারে নিয়ামতপুর গ্রামের শরিয়ত উল্লাহ বলেন, আমার যেসব জমি তলিয়েছে, সেগুলো গভীর হাওরে ছিল। কৃষকেরা ভাবতে পারেননি, এবার এত দ্রুত বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে হাওর তলাবে। অন্য বছর পানি ধীরে ধীরে আসে। এবার আগে বৃষ্টিতে হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। পরে ঢলের পানি ঢুকে ফসল তলিয়ে যায়।
শরিয়ত উল্লাহ বলছিলেন, ২৫ এপ্রিল হাওরে কম পানি দেখে যান মানুষজন। পরদিন সকালে এসে দেখেন জমি তলিয়ে যাচ্ছে। আবহাওয়ার যে অবস্থা ছিল, তাতে ধান কাটা ও মাড়াই নিয়ে চরম সংকটে আমরা। এরপর জমির ধান তলিয়ে যায়।
নিরুপায় হয়ে এই কৃষক বলেন,‘পানির তলের সব ধান পচি গিছে। এই ধান আর কাটা যাইত না। আর কাটলেও কোনো কামে আইত না।’
অতিবৃষ্টির কারণে কাটা ধান নিয়ে বিপাকে পড়া শরিয়ত উল্লাহ জানান, এক সপ্তাহ এই ধান খলায় স্তূপ করে রাখা ছিল। ঝড়বৃষ্টি আর বজ্রপাতের হাওরে কোনো কাজ করতে পারেননি। রোববার রোদ ওঠায় একটা মেশিন এনে ধান মাড়াই করেছেন। এখন শুকানোর চেষ্টা করছেন।
সরকারি গুদামে ধান দেওয়া নিয়ে জটিলতা:
কিশোরগঞ্জের সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোশারফ হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে জেলার ১৩ উপজেলা থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে ১৮ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত মান বজায় থাকলে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা হবে।এদিকে নির্ধারিত আর্দ্রতা বজায় রাখতে না পারায় অনেক কৃষকই সরকারি গুদামে ধান দিতে পারছেন না। পাশাপাশি অনেকেই এই কার্যক্রম সম্পর্কে জানেন না বলে জানা গেছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে তথ্য না পৌঁছানো, ক্রয়প্রক্রিয়ার জটিলতা ও সংরক্ষণ সুবিধার অভাব- এই তিন কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, সরকারি দাম আর বাস্তব বাজারের মধ্যে এই বিশাল ব্যবধান শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, এটি এখন কৃষকের অস্তিত্বের লড়াই। এই পরিস্থিতি নিরসনের ব্যবস্থা না নিলে কৃষিতে আগ্রহ হারাবে কৃষক।
ইটনার কৃষক কামরুল হাসানের কাতর কণ্ঠেও একই কথা শোনা গেলো। তিনি বলেন, ‘ধান ফলাইছি, কিন্তু দামে বিক্রি করতে পারছি না। এভাবে আর কৃষিকাজে কতদিন টিকমু?’
দুর্যোগ-দরপতনে দিশাহারা কৃষক:
কিশোরগঞ্জ পৌর মহিলা কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাদেকুর রহমান বলেন, ‘ইউনিয়ন পর্যায়ে অস্থায়ী ধান শুকানোর ব্যবস্থা করা, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে দ্রুত ক্রয়, মোবাইল বা এসএমএসের মাধ্যমে তথ্য পৌঁছানো এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। না হলে কৃষকরা হতাশ হয়ে কৃষিতে আগ্রহ হারাবে। এতে খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দেবে।’
সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোশারফ হোসেন বলেন, ‘কৃষকরা যাতে সহজে সরকারি গুদামে ধান দিতে পারেন সেজন্য উপজেলায় উপজেলায় মাইকিংসহ সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ পরিস্থিতি বিবেচনায় ১৫ মে থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ধান সংগ্রহ কার্যক্রম এগিয়ে ৩ মে থেকেই শুরু করা হয়েছে।’পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত মান বজায় রেখে ধান গুদামে দিতে হবে, এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে তিনি বলেন, ‘মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা যাতে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করতে না পারে, সে বিষয়ে জেলা মনিটরিং কমিটির সভায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’








