শাফিউল আল ইমরান: বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ‘থামিয়ে দিয়েছে’ সৌর বিদ্যুত। ২০২৫ সালে সৌর বিদ্যুতের রেকর্ড প্রবৃদ্ধিকে বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার বৈশ্বিক জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এম্বার কর্তৃক প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আধুনিক বিশ্বে প্রথমবারের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লাকে ছাড়িয়ে গেছে।
এম্বার তাদের প্রতিবেদনটি সপ্তম বার্ষিক গ্লোবাল ইলেকট্রিসিটি রিভিউ-এর অংশ হিসেবে প্রকাশ করেছে। যেখানে ২১৫টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ খাতের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর বৈশ্বিক বিদ্যুৎ চাহিদা যতটা বেড়েছে, তার পুরোটা যোগান দিয়েছে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎসগুলো। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় স্থির ছিল। এককভাবে সৌর শক্তিই চাহিদা বৃদ্ধির ৭৫ শতাংশ মিটিয়েছে, আর সৌর ও বায়ু শক্তি মিলিয়ে প্রায় পুরো (৯৯ শতাংশ) চাহিদা পূরণ হয়েছে।
২০২৫ সালে বিশ্বে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে ৬৩৬ টেরাওয়াট-ঘণ্টা (টিডব্লিউএইচ) হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি যেটি আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। ২০১৫ সালের পর থেকে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ১০ গুণেরও বেশি বেড়েছে এবং বর্তমানে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার সমান। এ ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল চীন, যা বৈশ্বিক সৌর সক্ষমতা ও উৎপাদন বৃদ্ধির অর্ধেকের বেশি যোগান দিয়েছে।
বলা হচ্ছে; ২০২৫ সালে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে ৮৮৭ টেরাওয়াট ঘণ্টা, যা বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধির (৮৪৯ টেরাওয়াট ঘণ্টা) চেয়েও বেশি। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ০ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। এ শতকে এ নিয়ে মাত্র পঞ্চমবার এমন হলো যে জীবাশ্ম জ্বালানীতে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রবৃদ্ধির চেয়ে সৌর শক্তি চালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন বেশী হয়েছে।
কয়লা থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর এবং বিদ্যুৎ খাতের নীতি বিশ্লেষণে একজন বিশেষজ্ঞ ও এনার্জি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এম্বার এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক(এমডি) আদিত্য লল্লা বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে সৌর শক্তিতে উৎপাদিত জ্বালানির প্রবৃদ্ধির যুগে প্রবেশ করেছি, এই জ্বালানি এখন এমন গতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে যে এটি ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক বিদ্যুৎ চাহিদা সামলাতে পারছে, ফলে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন তার অনিবার্য পতনের আগে স্থিতিশীল রয়েছে।’
‘সৌর শক্তির আমরা যে গতি দেখছি, তা আর কেবল উচ্চাকাঙ্খা নয়, এটি ধীরে ধীরে একটি কাঠামোগত বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে’, বলে তার মত।
এম্বার- তার প্রতিবেদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে বড় উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর ভূমিকাকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেন। চলতি শতকে প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালে চীন ও ভারতে একসঙ্গে জীবাশ্ম বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। গত দুই দশকে এ দুই দেশই জীবাশ্ম বিদ্যুৎ বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল। চীনে জীবাশ্ম বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ৫৬ টিডব্লিউএইচ এবং ভারতে কমেছে ৫২ টিডব্লিউএইচ, যা সৌর, বায়ু ও অন্যান্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণের ফল।
এই পরিবর্তনে বৈশ্বিক ভারসাম্যেও বড় প্রভাব পড়েছে। একবিংশ শতাব্দ¦ীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালে বিশ্বে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩৪ শতাংশ এসেছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে, যা কয়লার ৩৩ শতাংশ অংশীদারিত্বকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০২০ সালের পর এবারই প্রথম বিশ্বব্যাপী কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ৬৩ টিডব্লিউএইচ।
প্রতিবেদনটি আরও জানায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরবর্তী ধাপের প্রসারে ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৫ সালে এত পরিমাণ ব্যাটারি স্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে নতুন যোগ হওয়া সৌর বিদ্যুতের ১৪ শতাংশ দিনের মধ্যভাগ থেকে অন্য সময়ে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে, ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও ব্যবহারের সময়সীমা বেড়েছে।
আদিত্য লল্লা বলেন, ‘বৈশ্বিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি এখন সৌর শক্তি, যেখানে ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তি সার্বক্ষণিক নিরাবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের পথ খুলে দিচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌর শাক্তির মাধ্যমে পাওয়া জ্বালানির দ্রুত বিস্তার আমদানি নির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতিকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করছে। একই সঙ্গে সস্তা ও সহজলভ্য নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে বিদ্যুতায়ন ত্বরান্বিত করবে।
ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর এনার্জি ট্রানজিশন স্টাডিজ(আইএসইটিএস)-এর সভাপতি চুনপেং শি বলেন, ‘জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কিভাবে বাড়তে থাকা বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা যায় তা চীন সৌর শক্তিতে জ্বালানি স্থাপন করে দেখিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় নির্মাতা হিসেবে চীন সৌর ও বায়ু শক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাচ্ছে, পাশাপাশি বৈশ্বিক বিদ্যুৎ খাতের রূপান্তরেও প্রভাব ফেলছে। চীনের অগ্রগতি বিশ্বের অনান্য দেশকে সৌর বিদ্যুতের রুপান্তার হওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে।’
এনার্জি ট্রানজিশনস কমিশনের সহ-চেয়ার এডেইর টার্নার বলেন, ‘বিশ্বের বেশিরভাগ জায়গায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে সস্তা উপায় এখন সৌর পিভি। আর ব্যাটারির খরচ দ্রুত কমে যাওয়ায় সৌর ও ব্যাটারি একসঙ্গে অনেক দেশে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি যুগপদ সমাধান হিসেবে দেখা দিয়েছে। যা ওই সবদেশগুলোতে অর্থনৈতিক সমাধানের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।’
তারমতে, ‘ ইতোমধ্যে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধির প্রায় পুরোটা জুড়েই রয়েছে সৌর ও বায়ু শক্তি, এবং ভবিষ্যতের এই প্রবৃদ্ধি জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দেবে। এটি মূলত উন্নততর প্রযুক্তির দ্বারা চালিত এক অপ্রতিরোধ্য বিপ্লব।’
বিশ্লেষকদের মতে, সৌর বিদ্যুতের নতুন যুগে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যুৎ গ্রিড ও নীতিমালা আধুনিকায়ন করা, যাতে নবায়নযোগ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়।








