বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য বক্তারা জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার জন্য প্রচলিত আইন ও নীতি সংস্কার চান।
গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বৈশ্বিক অস্থিরতা: জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু ন্যায্যতা নিশ্চিতের উপায়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেন।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ (ডব্লিউকেবি), এশিয়ান পিপলস মুভমেন্ট অন ডেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এপিএমডিডি) এবং ফসিল ফুয়েল ট্রিটি (এফএফটি) ইনিশিয়েটভ এর যৌথ আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মো. আশরাফ উদ্দিন (বকুল) বলেন, ‘জ্বালানি ও পরিবেশ এর বিষয়টি একাধিক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় সমন্বিত পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি।’ তিনি উল্লেখ করেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা ও তদারকির অভাবে পরিবেশ দূষণ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, বিশেষ করে রামপাল প্রকল্পের উদাহরণ তুলে ধরেন।
তিনি সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা তুলে ধরে বলেন, দেশের বিপুল পরিমাণ অব্যবহৃত ছাদ ও শিল্পকারখানার জায়গা ব্যবহার করে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি শক্তি সাশ্রয় ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘গ্যাস ও জ্বালানির সাশ্রয়ের জন্য শিল্পখাতে বিকল্প ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়াতে হবে। জ্বালানি খাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকারকে বাস্তবমুখী ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।’
‘ধরা’-র সহ-আহ্বায়ক এম এস সিদ্দিকী-র সভাপতিত্বে সুচনা মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের রিভারফক্স এনভায়রনমেন্টাল-এর সিইও ডোনা লিসেনবি, ফিলিপাইন থেকে আসা এপিএমডিডি-র সমন্বয়কারী লিডি ন্যাকপিল, এবং ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ-এর সমন্বয়কারী শরীফ জামিল।
রিভারফক্স এনভায়রনমেন্টাল-এর সিইও ডোনা লিসেনবি ‘জ্বালানি খাতে যুদ্ধের প্রভাব’ বিষয়ে আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার মারাত্মক ঝুঁকি ও অস্থিরতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করছে, যার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়াসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেশি পড়বে।’
আলোচনায় তিনি জ্বালানি নির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সেইসাথে, দেশীয় গ্যাস ও কয়লা তাৎক্ষণিক সমাধান নয় বলে উল্লেখ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তরের ওপর জোর দেওয়া বিশেষ করে রামপাল, পায়রা ও মাতারবাড়ী এলাকায় সোলার হাব গড়ে তোলাকে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে দেখেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক সহযোগিতা ও ন্যায়ভিত্তিক নীতির আহ্বান জানান।
এপিএমডিডি-র সমন্বয়কারী লিডি ন্যাকপিল ‘জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু ন্যায্যতা’ বিষয়ে বক্তব্যে বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে। তিনি উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়াতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর চাপ বেড়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করছে বলে তিনি সতর্ক করেন। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত ও ন্যায্যভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরকে তিনি জরুরি হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই রূপান্তর শুধু জলবায়ু নয়, জ্বালানি নিরাপত্তা ও মানুষের বেঁচে থাকার সঙ্গেও সম্পর্কিত। একই সঙ্গে উন্নত দেশগুলোর ‘ফেয়ার শেয়ার’ অনুযায়ী জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
শরীফ জামিল ‘বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তরের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব’ বিষয়ে বলেন, ‘বিদ্যমান বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর অধিগ্রহণকৃত অতিরিক্ত জমি ব্যবহার করে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ করলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব পাশাপাশি যুদ্ধের কারনে সৃষ্ট সংকটকালেও মানুষ নিরাপত্তা পাবে।’
তিনি সতর্ক করেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষণ সুন্দরবন, মৎস্যসম্পদ ও স্থানীয় জীবিকায় গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পায়রা ও পটুয়াখালী অঞ্চলের বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ইলিশের প্রজননক্ষেত্র ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে এবং অপরিকল্পিত ড্রেজিং ও অবকাঠামো উন্নয়ন অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয় এবং বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করছে। মাতারবাড়ী অঞ্চলে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক শিল্পায়ন দেশের লবণ উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পরিবেশ ও জীবিকা রক্ষায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তরের জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পরিবেশ অধিদপ্তর এর অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোঃ জিয়াউল হক, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির, ফসিল ফুয়েল ট্রিটি ইনিশিয়েটিভ’র এশিয়া ক্যাম্পেইনার মেগা মাসকি, ব্রাইট গ্রিন এনার্জি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান দিপাল বড়ুয়া এবং সিপিআরডি’র নির্বাহী পরিচালক মো. শামসুদ্দোহা। বক্তারা জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে আইনি ও নীতিগত কাঠামো সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।








