গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে পাঁচজনের মর্মান্তিক মৃত্যু দেশজুড়ে এক চরম উদ্বেগ ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ধুবনী বাজার গ্রামের ৫২ বছর বয়সী ফুল মিয়াও ছিলেন, যিনি মূলত চিকিৎসায় বিলম্বের কারণে জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। গত মে মাসে বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে ১৪ জন আহত হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, লক্ষণ প্রকাশের পর এই ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচার কোনো উপায় থাকে না। তবে সময়মতো ক্ষতস্থান পরিষ্কার না করা, মাথায় কামড় বা ভ্যাকসিনের সঠিক কার্যকারিতা ও ইমিউনোগ্লোবুলিনের (আরআইজি) অভাবও এই মৃত্যুর কারণ হতে পারে। স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতায় এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ায় এখন তীব্র আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা উদ্বেগজনকহারে বাড়লেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বাজার, রাস্তা ও আবাসিক এলাকায় অবাধে ঘুরে বেড়ানো কুকুরের কারণে প্রায়ই মানুষ আক্রমণের শিকার হয়।
মারা যাওয়া ব্যক্তিরা হলেনÍ সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি গ্রামের খোকা রামের স্ত্রী নন্দ রানী (৫৫),পূর্ব ছাবারহাটি গ্রামের খোকা বর্মণের ছেলে রতনেশ্বর বর্মণ (৪২), মতিয়ার রহমানের স্ত্রী আফরোজা বেগম (৪০) এবং আবদুস সালামের স্ত্রী সুলতানা বেগম (৩৯)।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণের শিকার হয়ে এখানে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯৪ হাজার ৩৮০ জন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৩ জনে। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা আরও বেড়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩ জনে পৌঁছেছে। আর ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত সেবা নিয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫১ জন। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৩ সালে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় ৪২ জন মানুষের। ২০২৪ সালে ৫৮ জনের, ২০২৫ সালে ৫৯ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের।
হাসপাতাল–সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা দীর্ঘদিন কম থাকলে সম্প্রতি সেটা আবার বাড়ছে। বিষয়টি এখনই উদ্বেগের কারণ নয়। তবে দ্রুত সময়ে কুকুর নিয়ন্ত্রণ ও জলাতঙ্কপ্রতিরোধী ভ্যাকসিন মানুষ ও কুকুরের মাঝে ব্যাপক হারে দিতে হবে।
অদৃশ্য ভাইরাসের মরণকামড়:
লক্ষণ ও পরিণতি: জলাতঙ্ক মূলত একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়। সাধারণত আক্রান্ত কুকুর বা বিড়ালের কামড় অথবা আঁচড়ের মাধ্যমে এই রোগের জীবাণু মানবদেহে প্রবেশ করে। ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর রক্তবাহিকার মাধ্যমে নয়, বরং স্নায়ুতন্ত্র বেয়ে সরাসরি মস্তিষ্কে গিয়ে হানা দেয় এবং সেখানে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কামড়ের এক থেকে তিন মাসের মধ্যে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। লক্ষণ প্রকাশের পর রোগীর শরীরে তীব্র ছটফটানি, রোদ ও বাতাসের প্রতি চরম ভীতি এবং জল বা পানির প্রতি এক অবিশ্বাস্য আতঙ্ক (হাইড্রোফোবিয়া) তৈরি হয়। পানি পান করতে গেলেই রোগীর গলায় তীব্র খিঁচুনি ওঠে। একপর্যায়ে রোগী চরম অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং লক্ষণ দেখা দেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে অবধারিত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগেও এই রোগের লক্ষণ প্রকাশের পর রোগীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব।
পাগলা কুকুরের আচরণ ও তাৎক্ষণিক করণীয়:
একটি কুকুর বা বিড়াল জলাতঙ্কে আক্রান্ত কি না, তা কিছু লক্ষণ দেখে সহজেই বোঝা যায়। আক্রান্ত প্রাণীর মুখ থেকে অনবরত অতিরিক্ত লালা ঝরতে থাকে। তারা অস্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং রোদ বা আলো ভয় পায়। অনেক সময় তারা অবাস্তব ও জড় বস্তু যেমন ইট, পাথর, কাঠ বা ময়লা কামড়াতে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো কুকুর বা বিড়াল কামড়ালে কিংবা আঁচড়ালে মুহূর্তও দেরি না করে আক্রান্ত স্থানটি কমপক্ষে ১৫ মিনিট কোনো নলকূপ বা ট্যাপের চলমান পানিতে কাপড় কাচার সাবান দিয়ে খুব ভালোভাবে ধুতে হবে। সাবানের ক্ষার এই ক্ষতিকর রেবিস ভাইরাসকে ধ্বংস করতে অত্যন্ত কার্যকর। এরপর অ্যালকোহল বা আয়োডিন সলিউশন দিয়ে ক্ষতস্থান জীবাণুমুক্ত করে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক ইনজেকশন নিতে হবে।
যদি কোনো ক্ষ্যাপা বা সন্দেহভাজন পশু কাউকে কামড়ায়, তবে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কোনো সমাধান নয়। প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের গাইডলাইন অনুযায়ী, পশুটিকে একটি নিরাপদ স্থানে আটকে রেখে টানা ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং স্বাভাবিক খাবার ও পানি সরবরাহ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘এই ১৫ দিনের মধ্যে যদি পশুটি স্বাভাবিক থাকে তবে বুঝতে হবে তার শরীরে জলাতঙ্কের জীবাণু ছিল না। আর যদি এই সময়ের মধ্যে পশুটি মারা যায়, তবে দ্রুত নিকটস্থ ভেটেরিনারি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করে জলাতঙ্ক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।’ রোগটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে পোষা এবং বেওয়ারিশ কুকুরকে নিয়মিত জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো এলাকায় টানা তিন বছর অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুরকে টিকা দেওয়া গেলে সেই এলাকা কার্যত জলাতঙ্কমুক্ত করা সম্ভব।
কী করছে প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর:
প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনের প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর বলছে, সারাদেশে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে কুকুরের টিকাদান (এমডিভি)কার্যক্রমটি চলমান ছিল। পরবর্তীতে কার্যক্রমটি বন্ধ থাকায় কুকুরে রেবিস বা জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধে সমস্যা দেখা দেয়। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানা যায়, ইতোমধ্যে জলাতংক রোগ প্রতিরোধে সরকারী অর্থায়নে একটি প্রকল্প প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর হাতে নিয়েছে। প্রকল্পের কার্যক্রম জুলাই মাস হতে শুরু হবে। এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকা শহরের পোষা প্রাণি (কুকুর ও বিড়াল) এর জলাতংক টিকা প্রদান, বন্ধ্যাকরন করা হবে।
অন্যদিকে, অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বর্তমানে বাজারে জলাতংক বা রেবিস টিকার ঘাটতি থাকার কারণে ২০ লক্ষ ডোজ টিকা আমদানির অনুমতির জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক(ডিজি) মো. শাহজামান খান বলেন, ‘জলাতঙ্ক প্রতিরোধের জন্য প্রায় ২০ লাখ ডোজ টিকা আমদানির অনুমতির সুপারিশ করা হয়েছে।বর্তমানে এই টিকা আমদানির জন্য ওষুধ প্রশাসনের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে,যা চলতি মাসের মধ্যেই পাওয়া যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে ।’
তিনি আরোও বলেন, ‘কুকুরের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া জলাতঙ্ক রোধ করতে ব্যাপকভাবে কুকুরের টিকাদান বা ‘ম্যাস ডগ ভ্যাক্সিনেশন’ (এমডিভি) কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে । বিশেষ করে ঢাকা শহরের বেওয়ারিশ কুকুরগুলোকে এই টিকার আওতায় আনা হবে যাতে সাধারণ মানুষের জন্য কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি না হয়।’
শাহজামান খান বলেন, ‘শুধু টিকাদানই নয়, বরং বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভ্যাসেকটমি বা বন্ধ্যাকরণ করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে । এর মাধ্যমে কুকুরের বংশবৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব হবে ।’
দেশ ব্যাপী জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। এ বিষয়ে শাহজামান খান বলেন, ‘বর্তমানে চলমান কার্যক্রমগুলোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাস্তবায়নের জন্য প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্পও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
*সেন্ট মার্টিন দ্বীপের বিশেষ প্রকল্প:
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপে লোকসংখ্যা ১০ হাজার ৭০০ জন। কুকুর আছে সাত হাজারের বেশি। কুকুরের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে দ্বীপে ডিম পাড়তে আসা কাছিমও কুকুরের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এ ছাড়া কোনো একটি প্রজাতির অনিয়ন্ত্রিত বংশবৃদ্ধিও প্রাকৃতিক খাদ্যচক্রের জন্য হুমকি বলে মনে করেন পরিবেশবিদেরা।
ডিজি মো. শাহজামান খান বলেন, ‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপে কুকুরের বংশরোধ এবং জলাতঙ্ক নির্মূলের জন্য একটি বিশেষ কার্যক্রম চলমান রয়েছে, যেখানে বন্ধ্যাকরণের পাশাপাশি জলাতঙ্ক নিরোধক টিকা দেওয়া হচ্ছে। ’








