ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার রূপাপাত ইউনিয়নের বনমালীপুর গ্রামের পার্থ কুমার মন্ডল। তার ক্ষেত্রে এবার পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। আরো অধিক লাভের আশায় আধুনিক পদ্দতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেছেন তিনি। পার্থ কুমার বলেন, ‘এবার পেঁয়াজের ফলন খুব ভালো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় রোগবালাইও কম ছিল। আশা করছি ভালো দামে বিক্রি করতে পারব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর যে পেঁয়াজ পাই তার থেকে অনেক বেশি, কল্পনাতীত পরিমাণ পেঁয়াজ এবার পেয়েছি। কারণ এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর এক শতাংশে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ফলন হয়েছে।’
একই ইউনিয়নের সুতালিয়া গ্রামের আরেক পেঁয়াজ উৎপাদনকারী সাধন হীরা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার শতাংশপ্রতি উৎপাদন অনেক বেশি হয়েছে। প্রতি শতাংশে এবার সাড়ে তিন মনের মতো পেঁয়াজ পেয়েছি। গত বছর দুই মনের মতো পেয়েছিলাম। পেঁয়াজ এখনই সব বিক্রি না করে ঘরে রেখে দিয়েছি। সামনে দাম আরও বাড়বে ,আশা করছি। পাশের বাজিতপুর গ্রামের স্কুল শিক্ষক সুব্রত বিশ্বাস বলেন, এবার আমাদের গ্রামের সবাই এত পেঁয়াজ পেয়েছে যে, সব বাড়ির উঠানেই টিনের ছাপড়া নয়তো সামিয়ানা টাঙিয়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা হয়েছে। ফলনে আমরা আশাবাদী। দামও এবার আশানুরূপ আছে। ভবিষ্যতে বাড়বে।
বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ এক হাজার টাকা কিংবা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তারা বলছেন, ফলন বেশি হওয়ায় শতাংশ প্রতি খরচ কমে এসেছে, ফলে কৃষকরা লাভের মুখ দেখার আশায় রয়েছেন।
শুধু ফরিদপুর নয় সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেখানে পেঁয়াজের চাষ হয় সেসব জায়গায় পেঁয়াজের ‘বাম্পার’ ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, সময়োপযোগী চাষাবাদ এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে উৎপাদন করায় এবার ফলন যেমন বেশি হয়েছে, তেমনি বাজারদরও রয়েছে কৃষকের অনুকূলে। ফলে স্থানীয় কৃষকদের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি। একারণে এই অর্থ বছরে ইতিহাসের সবচেয়ে কম পেঁয়াজ আমদানী হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১০ লাখ ৯১ হাজার টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ছয় লাখ ৬৭ হাজার ১৫১ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ছয় লাখ দুই হাজার ২৯ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাত লাখ ৫০ হাজার ৬৮ টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছয় লাখ পাঁচ হাজার ৩৩৭ টন, ২০২৪-২৫ সালে পেয়াজ আমদানি চার লাখ ৭৩ হাজার ৮১১ দশমিক ২৭ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ সালে ৮৬ হাজার ৩৯৮ দশমিক ৮৪ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চারা, কন্দ ও বীজ মিলিয়ে দুই লাখ ৮০ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে ৪২ লাখ ৫০ হাজার টন পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই লাখ ৮৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪২ লাখ ৬৪ হাজার ১০০ টন।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘ এবার পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। তাই অনান্য বছরের তুলনায় আমদানী সবচেয়ে কম হয়েছে। একটি মডেল ঘরে ৩০০ মণ পেঁয়াজ রাখা যাবে। পাঁচজন কৃষকের জন্য একটি ঘর করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য এই ঘর দেখে চাষিরা নিজেরা মডেল ঘর নির্মাণ করে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করবেন। তাহলে তাদের পেঁয়াজ নষ্ট হবে না। ’ পেঁয়াজ সংরক্ষণের বিষয়ে আগামীতে সরকার কোন পদক্ষেপ নিবে কিনা জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ পেঁয়াজ সংরক্ষণের প্রকল্প নিয়ে কতগুলো আমরা চিন্তা করছি, আমাদের কিছু অর্থ সংস্থানের বিষয় আছেতো এটার উপর আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহে একটা মিটিং হবে সেখানে আমাদের করনীয় ঠিক হবে। যেখানে কৃষি বিপননেরও কম্পোনেন্ট আছে।’
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানাগেছে, সরকার ‘বায়ু প্রবাহ পদ্ধতিতে পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণ পদ্দতি আধুনিকায়ণ এবং বিপনন কার্যক্রম’ নামের একটি প্রকল্প কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন,‘ পেঁয়াজ শুধু সঠিক সংরক্ষণ করতে না পারায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। এরইমধ্যে আমাদের নতুন যে আমরা এয়ার-ফ্লো মেশিনের মাধ্যমে যে সংরক্ষণ চালু করেছি। আমি আগেই বলে দিয়েছি এটা ওই যেই উপজেলাগুলোতে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। আগামী কিছুদিনের মধ্যে আমরা এজ আর্লি এস পসিবল এটাতে ট্রাই করে দেখা যায়- আট থেকে নয় মাস পর্যন্ত ওই নিয়মে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যায়। সেখানে অপচয় মাত্র দুই থেকে চার পারসেন্ট। শুধু অপচয়টা যদি রোধ করা যায় তাহলে পেঁয়াজে একেবারে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যাব। ’
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট গবেষণা করে পেঁয়াজ-রসুন সংরক্ষণের জন্য মডেল ঘরের নকশা ডিজাইন করেছে। কৃষকদের বাড়ির উঠানে ১ শতাংশ জমিতে টিন-বাঁশ, লোহা, কংক্রিটের সমন্বয়ে বানানো এই ঘরে তিন স্তরের মাচা রয়েছে। ঘরের নিচে আলো-বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ছয়টি ফ্যান দেওয়া হয়েছে। ঝড়-বৃষ্টি থেকে পেঁয়াজ রক্ষা করতে চারপাশে রাখা হয়েছে ত্রিপল। প্রতিটি মডেল ঘরে ৩০০ মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যাবে। এসব ঘরে ৬ থেকে ৯ মাস পেঁয়াজ ভালো থাকবে। প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। প্রতিটি ঘরে পাঁচজন কৃষক তাদের পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারবেন।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হবেন। একই সঙ্গে পেঁয়াজ উৎপাদনে এ অঞ্চলের সাফল্য দেশের কৃষি খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।








