জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় স্বাস্থ্যগত সুফল বিবেচনায় ৩২-এর মধ্যে ১৩ পয়েন্ট পেলেও অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে কোনো নম্বর পায়নি বাংলাদেশ। গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ অ্যালায়েন্সের (জিসিএইচএ) প্রকাশিত ২০২৬ সালের ‘হেলদি এনডিসি স্কোরকার্ডে’ এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল সোমবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে আটটি বিভাগে বিশ্বের ১৩২টি দেশের ১১৭টি জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনা মূল্যায়ন করা হয়।
মূল্যায়নে স্বাস্থ্যগত সহ-সুফলের স্বীকৃতিতে বাংলাদেশ ৪-এর মধ্যে ৪ এবং স্বাস্থ্য খাতের কার্যক্রমে ৪-এর মধ্যে ৩ পয়েন্ট অর্জন করেছে। বায়ুদূষণ ও সমন্বিত শাসনব্যবস্থায় ২ পয়েন্ট করে পেলেও স্বাস্থ্যগত প্রভাব এবং ন্যায়সংগত রূপান্তরে পেয়েছে ১ পয়েন্ট করে। দক্ষিণ আফ্রিকাও বাংলাদেশের সমান ১৩ পয়েন্ট পেয়েছে। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার স্কোর ১১ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১২। সর্বোচ্চ ২৯ পয়েন্ট পেয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে কলম্বিয়া। ২৫ পয়েন্ট নিয়ে নাইজেরিয়া দ্বিতীয় এবং ২৪ পয়েন্ট নিয়ে কম্বোডিয়া তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। জাপান, ভারত ও নিউজিল্যান্ড পেয়েছে মাত্র ২ পয়েন্ট করে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সর্বোচ্চ স্কোর পাওয়া ২০টি দেশের মধ্যে ১৯টিই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আওতায় দেশগুলো জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পরিকল্পনা জমা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য এবং একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও টেকসই পরিবেশের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় জলবায়ু কার্যক্রমে জনস্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনের মূল্যায়নে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষম স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে আগাম পরামর্শসেবা চালু এবং জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। চিকিৎসাশিক্ষার পাঠ্যক্রম ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণে জলবায়ু ও স্বাস্থ্যবিষয়ক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে এতে। স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য পোড়ানো ছাড়া অন্যান্য পদ্ধতির ব্যবহার, হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যমান সরকারি ভবন, প্রতিষ্ঠান, বিদ্যালয় ও হাসপাতালের ৫০ শতাংশে এবং নতুন সব স্থাপনায় ছাদে সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ।
পরিবহন, কৃষি, পানি, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জলবায়ুবান্ধব উদ্যোগের স্বাস্থ্যগত সুফলও মূল্যায়নে স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হাঁটা ও সাইকেল চালানোয় উৎসাহ প্রদান, জলবায়ু সহনশীল খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য ও পুষ্টির মান উন্নত করা। পয়োনিষ্কাশন, কঠিন বর্জ্য ও পানি সরবরাহসেবা থেকে নির্গমন কমালে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে, যার ফলে শিশু ও ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে উপকৃত হবে। বন্যা ও চরম আবহাওয়ার সময় এবং পরবর্তী সময়ে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি কমাতে সহনশীল পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে বায়ুদূষণ কমানো এবং পরিচ্ছন্ন রান্নার ব্যবস্থা উৎসাহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মূল লক্ষ্য শিশুদের শ্বাসযন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এ ছাড়া ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরের ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার’-এর তথ্য উদ্ধৃত করে স্কোরকার্ডে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ২৫৯ দশমিক ২।
জিসিএইচএর নির্বাহী পরিচালক ডা. জেনি মিলার বলেন, সরকারগুলোকে অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে যে কার্যকর জলবায়ু পদক্ষেপের জন্য বায়ুর মান উন্নত করা অত্যন্ত জরুরি; কারণ উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সরাসরি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
মূল্যায়নে অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের শূন্য স্কোর মূলত জলবায়ু ও স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে আরও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে এনেছে। বৈশ্বিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনা সফল করতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সেই সঙ্গে প্যারিস চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নীতিনির্ধারকদের নিজ দেশের জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনার শক্তিশালী দিক, ঘাটতি ও সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করতে সহায়তা করতেই এই স্কোরকার্ড তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি, জলবায়ু প্রতিশ্রুতিতে বিভিন্ন দেশ স্বাস্থ্যকে ঠিক কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা তুলনা করার সুযোগও তৈরি করে দেয় এই বৈশ্বিক মূল্যায়ন।
উল্লেখ্য, জিসিএইচএ হলো বিশ্বের ৩০০টিরও বেশি স্বাস্থ্য পেশাজীবী সংগঠন, স্বাস্থ্যবিষয়ক নাগরিক সমাজের সংগঠন ও নেটওয়ার্কের একটি সুপরিচিত জোট। এই সংগঠনটি মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যগত ক্ষতি কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনের সুবাদে স্বাস্থ্য খাতে প্রাপ্ত সুফল বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করে থাকে।







