জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং এর টেকসই সংরক্ষণে সরকার জোরালো ও বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে এবং জিআই পণ্য হিসেবে জাতীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে এর ভূমিকা অপরিসীম। তবে গত দুই অর্থবছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ইলিশের উৎপাদন কিছুটা কমে যাওয়ায় নীতিনির্ধারক, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট মহল নতুন করে পরিকল্পনা সাজাতে শুরু করেছে।
পাশাপাশি ইলিশ মাছের উৎপাদন বাড়াতে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত ও নাব্যতা বজায় রাখা, ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ, মোহনা ও উপকূলীয় পরিবেশের সুরক্ষা, বৈজ্ঞানিকভাবে মৎস্য আহরণ ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এসবের পাশাপাশি জেলেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে তাদের জীবিকা ও সংরক্ষণ কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে পারলেই বাড়বে ইলিশের উৎপাদন।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ২৯ হাজার টন, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ২০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কম। উৎপাদনের এই ধারাবাহিক উত্থান-পতনের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্য সংকট, দূষণ, অপরিকল্পিতভাবে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন এবং ইকোসিস্টেমের পরিবর্তনকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে এ নিয়ে বিচলিত না হয়ে সরকার নতুন প্রকল্প প্রণয়ন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার কাজ শুরু করেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা শাখার উপ-পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে’র মেয়াদ শেষ হলেও নতুন করে ‘মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণের মাধ্যমে ইলিশের টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প’ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা খুব শীঘ্রই অনুমোদিত হবে।
মৎস্য অধিদপ্তরের পরিকল্পনা শাখার একজন উপপরিচালক বলেন, ‘এটা তো রাজস্ব প্রকল্প। তবে, আগে তো নিয়ম ছিলনা ফিজিবিলিটি করার এখন ফিজিবিলিটি স্টাডি বা বাস্তবায়নযোগ্যতা নিরীক্ষার কাজ একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান করছে। তারা এড্রেস করবে কি কি কম্পোনেন্ট দেওয়া যাবে । তবে, এবার মেরিন সাইট ও ক্লাইমেন্ট চেঞ্জ ইস্যুটাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন এই প্রকল্পে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং কর্মসংস্থানের পাশাপাশি জেলেদের জন্য ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং বা ভিজিএফ বরাদ্দের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে ভিজিএফ সুবিধাভোগী জেলের সংখ্যা ৬ লাখ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ ৪৬ হাজার জনে উন্নীত করা হয়েছে।
চলতি বছরও ইলিশ আহরণ কমের দিকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, ইকোসিস্টেম এবং ন্যাচারাল সাকসেশনের কারণে ইলিশের উৎপাদন এবারও নিচের দিকে। তবে সরকারি নানা উদ্যোগের কারণে আগামী বছরগুলোতে ইলিশের উৎপাদন বাড়তে পারে বলে তিনি আশাবাদী।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ইলিশ রক্ষার দায়িত্ব একা সরকারের নয়, এটি আমাদের সবার জাতীয় দায়িত্ব। ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা (৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর) যেকোনো মূল্যে সফল করতে হবে। সম্মিলিতভাবে এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা গেলে জেলেরা দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল ভোগ করবেন।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের চেয়ারম্যান ড. মাসুদ রানা উল্লেখ করেন যে, ইলিশের উৎপাদন হ্রাসের পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী নয়; বরং জাটকা আহরণ, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা, ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার, নদীর নাব্য হ্রাস, পানি দূষণ, পানিপ্রবাহের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ ধরার চাপ সম্মিলিতভাবে এই সংকট তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, একটি প্রজননক্ষম মা ইলিশ নদীতে ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে পরবর্তী প্রজন্মে বিপুলসংখ্যক ইলিশের জন্ম হয়, তাই নিষেধাজ্ঞার সময় নৌযান পর্যবেক্ষণ ও নিয়মিত অভিযান জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি স্যাটেলাইট, জিআইএস, এআই, মেশিন লার্নিং, আইওটি সেন্সর এবং ড্রোন প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি ‘স্মার্ট হিলসা ম্যানেজমেন্ট’ গড়ে তোলার ওপরও তিনি জোর দিয়েছেন।
ভারতের গুজরাট রাজ্যের নর্মদা নদীর মোহনায় অতিবৃষ্টির ফলে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার পরিবর্তনের কারণে ইলিশ উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে, যা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর অববাহিকার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. আব্দুল ওহাব জানান, ২০১৬ সালে ৩ লাখ ৯৬ হাজার টন উৎপাদনের পর থেকে টানা বাড়লেও গত দুবছর ধরে উৎপাদন নিম্নমুখী। তার মতে, ইলিশের টেকসই উৎপাদন প্রতিবছর সাড়ে ৫ থেকে ৬ লাখ টনের মধ্যে রাখা সম্ভব।
প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা এবং নির্বিচার জাটকা নিধন বন্ধকেই তিনি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ২০০৫ সালে নির্ধারিত পাঁচটি অভয়াশ্রমের পুনর্মূল্যায়ন ও সীমানা পুনর্নিধারণ এবং জাটকা নিধনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলেছেন তিনি।
বিষখালী নদীর জেলে লিটন হোসেন, কাইয়ুম ও নিরু খান জানান, ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পরই ছাঁকনির মতো সূক্ষ্ম জাল দিয়ে চাপিলার মতো ছোট জাটকা নির্বিচারে ধরে ফেলা হয়, যা ইলিশের পূর্ণাঙ্গ বৃদ্ধিতে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করছে। এদিকে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলমের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইলিশের প্রধান খাদ্য প্ল্যাংকটন মেঘনা নদীতে ৬৮ শতাংশ কমে গেছে, যার মূল কারণ নদীদূষণ।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ওয়ার্ল্ড স্টেট অব ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৪ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিঠাপানির মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় এবং ইলিশ আহরণে প্রথম অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ মানুষ ইলিশের সাথে জড়িত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে।
২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট ইলিশ মাছকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এমতাবস্থায় আইনের কঠোর প্রয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার, নদীর নাব্যতা ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা এবং জেলেদের জীবিকার সাথে সমন্বয় করে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলেই ইলিশের উৎপাদন পুনরায় কাঙ্ক্ষিত মানে উন্নীত করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।







