চর এলাকার মাটি ও আবহাওয়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন এবং পরিবর্তনশীল। এখানে প্রতিবছর বন্যা, নদী ভাঙন এবং খরাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করে কৃষকদের ফসল ফলাতে হয়। এই বাস্তবতায় চর অঞ্চলের কৃষকদের আধুনিক কৃষি জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে ডিএই এই বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। ৫ দিনব্যাপী এই কার্যক্রমে ৬০ জন নির্বাচিত কৃষককে চর উপযোগী শস্য বিন্যাস, আধুনিক সেচ প্রযুক্তি, সমলয় চাষাবাদ, উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু সহনশীল জাতের ফসল উৎপাদন, সার ও কীটনাশকের সুষম ব্যবহার এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
প্রশিক্ষণ সমাপণীতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক (ডিজি) কৃষিবিদ আব্দুর রহিম বলেন, চর অঞ্চলকে আর পিছিয়ে থাকা বা প্রান্তিক ভাবার কোনো অবকাশ নেই। এখানকার কৃষকদের অদম্য পরিশ্রমের ফলে আজ চরগুলো সবুজ ফসলে ভরে উঠছে। আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে চর এলাকাকে দেশের অন্যতম প্রধান খাদ্য উৎপাদন অঞ্চলে রূপান্তরিত করা সম্ভব।
তিনি আরোও বলেন, ‘কৃষিকে লাভজনক, সম্মানজনক এবং আধুনিক পেশা হিসেবে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। একসময়ে কৃষিকে কেবল বেঁচে থাকার বা জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কৃষির ধারণা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমান যুগে কৃষিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক খাত হিসেবে রূপান্তর করার ওপর জোর দিচ্ছেন ।’
বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প (১ম সংশোধিত)-এর আওতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সাভারের রাজালাক হর্টিকালচার সেন্টারে পলিসেড হাউস প্রাপ্ত ৬০ জন কৃষকের ৫ দিনব্যাপী দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে উদ্বধোনকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
আজ শনিবার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সমাপ্ত ঘোষণা করেন ডিএই- এর ডিজি কৃষিবিদ আব্দুর রহিম। প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ জিয়াউর রহমানের সঞ্চালনা ও উপস্থাপনায় উপস্থিত ছিলেন ডিএই এর উপপরিচালক (প্রশাসন) কৃষিবিদ মো: মুরাদুল হাসান। প্রশিক্ষণে কৃষকরা পলিসেড হাউসে ট্রে-তে চারা উৎপাদন কলাকৌশল ও এর প্রয়োজনীয়তা এবং রক্ষণাবেক্ষণ (মেইনটিন্যান্স) বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারেন।
এ সময় মহাপরিচালক কৃষিবিদ আব্দুর রহিম বলেন, ‘পলিসেড হাউস প্রাপ্ত কৃষকরা সমাজের লিড ফার্মার হিসেবে পরিচিতি লাভ করবেন। তারা একদিকে যেমন সফল উদ্যোক্তা হবেন, অন্যদিকে পলিসেডে উৎপাদিত চারা স্থানীয় চরের কৃষকদের কাছে স্বল্পমূল্যে বিক্রি করবেন। ফলে চরের কৃষকরা সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো মানের চারা পাওয়ার পাশাপাশি সার্বিকভাবে সবজির উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।’
কৃষির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হবে কৃষি এবং কৃষি পেশা হবে একটি আধুনিক পেশা। কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সবাই সম্মান করবে।’
এ সময় তিনি দেশের বিভিন্ন সফল উদ্যোক্তা কৃষকের সাফল্যগাথা তুলে ধরেন, যা উপস্থিত কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক (প্রশাসন) কৃষিবিদ মো: মুরাদুল হাসান প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান শুধু খাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠের প্রতিটি জমিতে প্রয়োগ করার জন্য প্রশিক্ষণার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান।তিনি বলেন, একজন প্রশিক্ষিত কৃষক শুধু নিজের ভাগ্য বদলান না, বরং আশপাশের আরও ১০ জন কৃষককে নতুন পথ দেখান।
প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ জিয়াউর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, ‘গত বছর বাস্তবায়িত পলিসেড হাউসগুলোতে অত্যন্ত সফলভাবে ট্রে-তে চারা উৎপাদিত হয়েছে এবং কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, চলতি অর্থবছরেও এই প্রকল্পের মাধ্যমে ১২১টি (৫ শতাংশ আয়তনের) পলিসেড হাউস সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে। পলিসেড হাউসগুলো যেন সঠিকভাবে পরিচালিত ও উৎপাদনমুখী হয়, সে বিষয়ে তিনি সকল কৃষকের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন।
৫ দিনের এই প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারী ৬০ জন কৃষকের মাঝে অভূতপূর্ব উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। অনেক কৃষক জানান যে, তারা এতদিন নিজেদের মতো করে চাষাবাদ করতেন, যার ফলে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতেন না এবং খরচও বেশি হতো। কিন্তু এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা মাটি পরীক্ষা, কম খরচে অধিক ফলন এবং পোকা দমনের জৈব ও আধুনিক উপায় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেয়েছেন। সমাপনী অনুষ্ঠানে সার্টিফিকেট বিতরণের মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সফল সমাপ্তি ঘটে।
‘বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প’-এর এই উদ্যোগ চর অঞ্চলের কৃষিতে একটি নীরব বিপ্লব ঘটাতে শুরু করেছে। ডিএই মহাপরিচালকের দিকনির্দেশনামূলক মন্তব্য ও উৎসাহ চর অঞ্চলের কৃষকদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আধুনিক প্রযুক্তি, সঠিক পরিকল্পনা এবং কৃষকদের অদম্য স্পৃহা কাজে লাগিয়ে দেশের চর এলাকাগুলো অচিরেই খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—এটাই সংশ্লিষ্ট সকলের প্রত্যাশা।







