গাজীপুরের তামিমা আক্তার ন্যান্সি। জেলার সদর থানার পিরুজালী ইউনিয়নের সরকারপাড়া গ্রামের ন্যান্সী পড়ালেখার পাশাপাশি নিজের উদ্যোগে কিছু করার তাগিদ অনুভব করতেন। অল্প সময়ের মধ্যেই শুরু করেন কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তাতে কিছুটা সফলও হন। স্থানীয় লোকজন তাদের পণ্যের প্রশংসা করেন। এরপর তারা জ্যাম, জেলি, আচার, কাঁঠাল ও মাছের চিপস তৈরি করে স্থানীয় বাজারে স্বল্প পরিসরে বিক্রি শুরু করেন।
ন্যান্সি জানান, শুরুতে সঠিকভাবে পণ্য উৎপাদন, নির্বাচন ও সংরক্ষণে কিছু সমস্যা হচ্ছিল। তখন তিনি কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ১২ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক দক্ষতা অর্জন করেন। এই প্রশিক্ষণের ফলে তার আয় প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
গাজীপুর কৃষি বিপণন কর্মকর্তার সহযোগিতায় তিনি ট্রেড লাইসেন্স, স্বাস্থ্য সনদসহ প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স সংগ্রহ করেন। তার প্রতিষ্ঠিত ‘ন্যান্সি অ্যাগ্রো অ্যান্ড ফুড’-এ বর্তমানে চারজন কাজ করছেন। ভবিষ্যতে পণ্য রপ্তানি, ১০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসার লাভের অংশ দিয়ে এতিমখানা ও বৃদ্ধাশ্রম গড়ার স্বপ্ন রয়েছে তার।
শুধু ন্যান্সিই নয়, উদ্যমী ও তরুণদের আয়বর্ধন কাজে নিয়োজিত করতে দেশব্যাপী উদ্যোক্তা তৈরি করা। আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করা। এরই ধারাবাহিকতায় সারা দেশে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি বিপনন অধিদপ্তরের ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচালাল এন্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্ট্রিপ্রিনিউরশিপ এন্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার-ডিএএম অংগ)’ প্রকল্পের মাধ্যমে সারাদেশে ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি কাজ করছে সরকার।
প্রকল্পের আওতায় ২০ হাজার সম্ভাব্য উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যের মধ্যে ৬০ শতাংশ নারী এবং ৪০ শতাংশ পুরুষ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বীজ, নার্সারি, মাশরুম, ভার্মিকম্পোস্ট, পাটজাত ও দুগ্ধজাত পণ্যসহ বিভিন্ন উপখাতে উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের জন্য ভ্যালুচেইনভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। উদ্যোগতাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হতে হবে।
প্রকল্প সূত্রে জানাগেছে, প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ পাওয়া উদ্যোগতাদের অন দ্যা জব প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ইনকিউবেশন সাপোর্টের মাধ্যমে ৫টি কৃষি পণ্যের প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানি নিশ্চিতে কাজ করছে। প্রকল্প হতে ৫টি কৃষিপণ্য যেমন; আলু, আম, কাঁঠাল, টমেটো এবং সুগন্ধি চাল এর ভ্যালু চেইন প্রমোশনাল বডি গঠন করা হবে। ইতিমধ্যে ভ্যালুচেইন প্রমোশনাল বডির নীতিমালা মন্ত্রণালয় অনুমোদিত হয়েছে।
জানাগেছে, প্রশিক্ষিত উদ্যোগতাদের ম্যাচিং গ্রান্ট সহায়তা করা হবে। ম্যাচিং গ্র্রান্ট হিসেবে গৃহ পর্যায়ে খাদ্য প্রকৃয়াকরণ যন্ত্রপাতি দেওয়া হবে। এসব যন্ত্রপাতি ক্রয়ে প্রকল্প হতে ৭০ শতাংশ ভর্তূকি দেওয়া হবে। বাকি ৩০ শতাংশ উদ্যোগতারা নিজে বহন করবে।
কৃষি বিপনন অধিদপ্তরের পার্টনার-ডিএম অংগ এর এজেন্সি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ড. মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, মাশরুম, নার্সারি, ভার্মিকম্পোস্ট, পাটজাত পণ্য, দুগ্ধজাত পণ্যসহ বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক খাতে উদ্যোক্তা তৈরির কাজ চলছে। এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৮৭৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরে প্রায় ৭ হাজার উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন,‘ সারা দেশের ৬৪ জেলা ও ২০৮টি উপজেলায় এ কার্যক্রম চলছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শুধু উদ্যোক্তা তৈরি নয়, তাদের ব্যবসায়িক দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা জ্ঞান এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরির করে দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরোও বলেন, ‘প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর প্রশিক্ষিত উদ্যোগতাদের ইনকিউবেশন সাপোর্ট প্রদান করা হচ্ছে। তাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য যে সকল বাধা রয়েছে তা দূর করার প্রকৃয়া নিয়ে ইনকিউবেশন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করে চলছে।’
জানা যায়, ডিএএমের আওতায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন কৃষিপ্রধান এলাকায় এ ধরনের ৭৬৭টি স্কুল গঠন করা হয়েছে। আবদুল্লাহ আল-ফারুক বলেন, ‘যে এলাকায় যে পণ্যের উৎপাদন বেশি, সেখানে সেই পণ্যকে কেন্দ্র করে মার্কেট অ্যাক্টরস বিজনেস স্কুল গড়ে তোলা হচ্ছে। আলুর ক্ষেত্রে ২২৭টি স্কুল করা হয়েছে। এ বছর আরও ৩৩৫টি স্কুল করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
তিনি বলেন, এসব স্কুলের মাধ্যমে কৃষক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, হিমাগার মালিক, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও অন্যান্য বাজার-অংশীজনকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে। এর ফলে নির্দিষ্ট কৃষিপণ্যের পুরো বাজারব্যবস্থার সমস্যা ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করা সহজ হবে।
উদ্যোক্তাদের দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অগ্রগতির কান্ডারি উল্লেখ পার্টনার প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘উদ্যোক্তারা শুধু নিজে স্বাবলম্বী হয় না তারা সমাজের আরও দশজনকে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হতে হলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদেরও বিভিন্ন নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা নিয়ে কাজ করে সেগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে।’‘
তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কৃষিকে আধুনিক ও সম্মানজনক পেশায় পরিণত করা সম্ভব হবে। প্রশিক্ষণ নেওয়া উদ্যোগতারা তাদের প্রাণচাঞ্চল্য, কর্মস্পৃহা এবং জীবনী শক্তি দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবেন।’
বিশ্লেষকরা মনে করেন, কৃষি খাত বাংলাদেশের জন্য সব সময়ই সম্ভাবনাময়। সেই সম্ভাবনার তুলনায় অনেক পিছিয়ে দেশের কৃষি খাত। এর বড় কারণ কৃষি খাতে বাস্তবধর্মী ও ব্যাপকভিত্তিক পরিকল্পনার অভাব, কাঙ্ক্ষিত আধুনিকায়ন না হওয়া এবং এ খাতে নতুন উদ্যোক্তা গড়ে না ওঠা। অথচ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি বাড়াতেও ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে কৃষি খাত।







