২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৯টি জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্রায় ৭২ লাখ মানুষ এবং দেশের ১০ শতাংশ ভূখণ্ড এই দুর্যোগে বিপর্যস্ত হয়। বিশেষ করে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলায় কৃষি খাত ও অবকাঠামোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলে। এই সংকট মোকাবিলায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর ২৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তায় এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে ‘ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশন ইমারজেন্সি এসিসটেন্স প্রজেক্ট (ফ্রিপ)’।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য বন্যাকবলিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান, জীবিকা এবং জলবায়ু সহনশীলতা উন্নত করা। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত চলবে এই প্রকল্প। সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৬৫টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে প্রকল্পটির কৃষি উপাদান। এর মাধ্যমে প্রায় দেড় লাখ কৃষককে ৪ হাজার ৯৫০টি দলে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
ফ্রিপ প্রকল্পের আওতায় ডিএই কৃষকদের আধুনিক ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বন্যা-সহনশীল, অধিক ফলনশীল স্বল্প মেয়াদী জাতের ধান চাষ, ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি, শস্য বহুমূখীকরণ, সেচ পদ্ধতি সম্পর্কে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও ভাসমান বেডে সবজি চাষ, বিনা চাষে রসুন চাষ, কমিউনিটি গার্ডেনিং, ভার্মিকম্পোস্ট সার সম্প্রসারণের মতো পরিবেশ-বান্ধব প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ভার্মিকম্পোস্ট সার উৎপাদন প্রদর্শনীর মাধ্যমে পুরুষ কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে তোলার পাশাপাশি নারী কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে তোলা হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় হাওর অঞ্চলে শ্রমিক সংকট সমাধানে ও সময়মতো ফসল কাটা ও রোপণ নিশ্চিত করতে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হচ্ছে। এরমধ্য প্রকল্পের আওতায় ধান রোপণ যন্ত্র (ট্রান্সপ্ল্যান্টার), রিপার, ট্রাক্টর, গার্ডেন টিলার, পাওয়ার থ্রেসার ও ড্রায়ার সরবরাহ করা হয়েছে। এসব যন্ত্রপাতি কৃষকরা ৭০ শতাংশ ভর্তুকি মূল্যে ক্রয় করতে পারছেন। ইতোমধ্যে কৃষি যন্ত্রপাতি বিতরনের লক্ষ্যমাত্রার ৮০ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
এছাড়া অনাবাদি ও পতিত জমি চাষের আওতায় আনা হয়েছে। সেখানে পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এলএলপি (থ্রেড পাইপসহ) বিতরণ, ড্রিপ ইরিগেশন সিস্টেম স্থাপন, বারিড পাইপ স্থাপন, সৌরবিদ্যুত চালিত সেচ সিস্টেম স্থাপন করা হচ্ছে। প্রকল্পভুক্ত এলাকার কৃষকরা সোলার সেচ সিস্টেমের মাধ্যমে বিনা জ্বালানী খরচে ফসলের মাঠে সেচ প্রদান করতে পেরেছে। বৈশ্বিক জ্বালানী সংকট পরিস্থিতিতে যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালণ করছে।
প্রকল্পটি ফসলের বহুমুখীকরণ এবং স্বল্পমেয়াদী উচ্চফলনশীল জাতের সম্প্রসারণে কাজ করছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ফসলের নিবিড়তা ১৭৪ শতাংশ থেকে ১৭৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের কৃষক মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বন্যায় যখন সব ফসল ভেসে গেল, ভেবেছিলাম আর কোনো উপায় নেই। ফ্রিপ প্রকল্পের বীজ ও সার পেয়ে আবার মাঠে নামতে পেরেছি।’ বন্যা-সহনশীল ব্রি ধান ৫২ চাষ করে তিনি ভালো ফলন পেয়েছেন এবং এখন অতিরিক্ত জমি বর্গা নিয়ে চাষ করছেন।
সিলেটের জকিগঞ্জের তরুণ কৃষক নুরুল আমীনের দল ফ্রিপ প্রকল্পের আওতায় ৭০% ভর্তুকিতে ট্রাক্টর পেয়েছে। তিনি বলেন, ‘এই যন্ত্র পাওয়ার কারণে আমার নিজের জমি সময়মত চাষ করতে পেরেছি এবং এলাকার অন্য কৃষকদের সেবা দিয়ে এক মৌসুমে অতিরিক্ত দেড় লাখ টাকা আয় করেছি।’
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের কৃষক ছুরুক তালুকদার বন্যাকালীন পরিস্থিতিতে আউশ মৌসুমে ব্রি ধান ৯৮ জাতের ১৬ বিঘা জমির চারা বাড়ির ছাদে প্রকল্প থেকে পাওয়া ৫০০ ট্রে তে উৎপাদন করে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে জমিতে রোপন করেন। একই উপজেলার আরেক জন কৃষক মো: আবদুস শহিদ গত বোরো মৌসুমে প্রকল্পের ড্রায়ারের মাধ্যমে ব্রি ধান ১০২ জাতের প্রায় ৫০ মণ ধান শুকাতে পেরেছেন।
প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি ৮০ শতাংশের বেশি। কৃষক প্রশিক্ষণের ৮০ শতাংশ, প্রযুক্তি প্রদর্শনের ৮৫ শতাংশ এবং সেচ সিস্টেম স্থাপনের ৮৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকি কাজ দ্রুত শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন জনিত আকস্মিক বন্যা ও বন্যার ঝুঁকি মোকাবেলায় এবং খাদ্যের উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এ প্রকল্পটি কাযকর ভূমিকা রাখতে পেরেছে। এই প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা ও হাওড় অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কৃষি ও কৃষককে টিকিয়ে রাখতে উৎপাদনব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে আগাম ও আকস্মিক বন্যা এবং সেচের পানির সংকট ফসল উৎপাদনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে বাস্তবায়িত ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশন ইমার্জেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রজেক্ট (ফ্রিপ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় কৃষিকে আরও আধুনিক, উৎপাদনশীল ও জলবায়ু-সহনশীল করে তুলতে ফ্রিপ প্রকল্পের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রকল্পের আওতায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, কৃষিযান্ত্রিকীকরণ, জলবায়ু-সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি ফসলের জাতের ব্যবহার এবং দক্ষ সেচব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য শুধু বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তাৎক্ষণিক সহায়তা দেওয়া নয়; বরং ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলায় কৃষকদের সক্ষমতা বাড়ানো। আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার, জলবায়ু-সহনশীল জাতের সম্প্রসারণ এবং পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, টেকসই ও দুর্যোগসহনশীল করে তোলাই প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য।







