জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা এবং মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সারা দেশে অভিযান, মনিটরিং ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। এরই অংশ হিসেবে গত এক সপ্তাহে রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ লঙ্ঘনের দায়ে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সাতটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৯ আগস্ট থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এক সপ্তাহে ঢাকা মেট্রোপলিটনে সাতটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে আইন লঙ্ঘনের দায়ে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মোট চার লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং তিনটি মামলা করা হয়। রাজধানীর পাশাপাশি বিভিন্ন জেলাতেও নিরাপদ খাদ্য আইন বাস্তবায়নে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজার, ঢাকা ও মানিকগঞ্জে চারটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে মোট ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন ও বিভিন্ন জেলার অভিযান মিলিয়ে এক সপ্তাহে সাতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং সাতটি মামলা করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, শুধু অভিযান ও জরিমানার মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের বিভিন্ন পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিংও করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান, খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাদ্যস্থাপনায় তদারকি চালানো হয়েছে।
৯ থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এক সপ্তাহে সারা দেশে মোট ১৩০টি খাদ্যস্থাপনায় মনিটরিং করা হয়। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখা, খাদ্যের মান নিশ্চিত করা এবং ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের বিষয়টি তদারকি করা হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে ১৪ আগস্ট জয়পুরহাটে ‘খোলা ভোজ্যতেল বিক্রয় বন্ধের লক্ষ্যে স্থানীয় স্টেকহোল্ডারদের ভূমিকা’ শীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আয়োজনে এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত ওই সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী।
সেমিনারে খোলা ভোজ্যতেল বিক্রির ঝুঁকি, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন অংশীজনের ভূমিকা এবং ভোক্তা সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মোবাইল ল্যাবরেটরি ভ্যানের কার্যক্রমও পরিদর্শন করেন। নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে দ্রুত পরীক্ষা ও মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকির ক্ষেত্রে এ ধরনের ল্যাবরেটরি ভ্যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। একই সময়ে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমেও প্রচার কার্যক্রম চালানো হয়েছে। ট্রান্সফ্যাট বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ১৪ মিনিটের বার্তা প্রচার করা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে তিনটি পৃথক বার্তা বাংলাদেশ বেতারে মোট ৩৫ মিনিট প্রচার করা হয়েছে। এসব প্রচারণায় নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন এবং ভোক্তার অধিকার সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। প্রচলিত গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিরাপদ খাদ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য ও সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হচ্ছে। ছবি, রিলস ও ভিডিওর মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস এবং ভোক্তা সচেতনতার বিষয়গুলো তুলে ধরা হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে গবেষণা। খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিভিন্ন ধরনের খাদ্যঝুঁকি চিহ্নিত ও নিরূপণ এবং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে সহায়ক তথ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এসব গবেষণার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রেও সহায়তা পাওয়া যাবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আইন প্রয়োগ, নিয়মিত মনিটরিং, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, গবেষণা, গণসচেতনতামূলক প্রচারণা এবং অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি আরোও বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী, উৎপাদক, খাদ্য বিক্রেতা, ভোক্তা এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। চেয়ারম্যান আরও বলেন, জনস্বার্থে ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এ ধরনের কার্যক্রম আরও ব্যাপক ও কার্যকরভাবে অব্যাহত থাকবে। আইন ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ আরও জোরদার করা হবে।







