বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ এখন থেকে দেশে বসেই বাংলাদেশি মুদ্রা টাকায় কেনার সুযোগ পাবেন বাংলাদেশি ভ্রমণকারীরা। ট্যুর অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সদস্য ট্যুর অপারেটরদের এ সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন ব্যবস্থায় ভ্রমণকারীদের কাছ থেকে টাকায় প্যাকেজের মূল্য নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিদেশি ট্যুর অপারেটর, হোটেল বা ডেস্টিনেশন ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে সেবার মূল্য পরিশোধে সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে পারবেন অনুমোদিত ট্যুর অপারেটররা।
রোববার (৯ আগস্ট) এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন এই নির্দেশনার ফলে বিদেশ ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ঝামেলা কিছুটা কমবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ট্যুর অপারেটরদের মাধ্যমে বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ কেনাবেচার লেনদেন আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বচ্ছ হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
কারা এই সুবিধা পাবেন
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, টোয়াবের সদস্য এমন ট্যুর অপারেটররা এ সুবিধা পাবেন, যাদের বিদেশি ট্যুর অপারেটর, হোটেল কিংবা ডেস্টিনেশন ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি বা ব্যবসায়িক সমঝোতা রয়েছে।
এ ধরনের ট্যুর অপারেটররা বিদেশ ভ্রমণসংক্রান্ত প্যাকেজের মূল্য বাংলাদেশে বসবাসকারী নাগরিকদের কাছ থেকে টাকায় গ্রহণ করতে পারবেন। এরপর প্যাকেজের আওতায় থাকা প্রকৃত সেবার বিপরীতে অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ পরিশোধ করা যাবে।
প্যাকেজের আওতায় বিদেশে আবাসন, পরিবহনসহ ভ্রমণসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা থাকতে পারবে। অর্থাৎ একজন ভ্রমণকারী দেশে থাকা ট্যুর অপারেটরের কাছ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিদেশ ভ্রমণ প্যাকেজ কিনতে পারবেন এবং সেই প্যাকেজের মূল্য পরিশোধ করবেন বাংলাদেশি মুদ্রায়।
বছরে অতিরিক্ত ৩ হাজার ডলার পর্যন্ত
নতুন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নিয়মিত বার্ষিক ভ্রমণ কোটার অতিরিক্ত হিসেবে একজন ভ্রমণকারীর জন্য প্রতি ক্যালেন্ডার বছরে সর্বোচ্চ ৩ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো যাবে। তবে এই সুবিধা ব্যবহারে নির্দিষ্ট শর্ত মানতে হবে। ট্যুর অপারেটরকে সংশ্লিষ্ট ভ্রমণকারীর পাসপোর্ট নম্বরের বিপরীতে লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে।
একই সঙ্গে ভ্রমণকারী অন্য কোনো ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে নির্ধারিত বার্ষিক সীমা অতিক্রম করেননি—এ মর্মে তাঁর কাছ থেকে ঘোষণাপত্র নিতে হবে। ফলে একই ব্যক্তি একাধিক ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে নির্ধারিত সীমার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর সুযোগ পাবেন না।
প্যাকেজের মূল্য ৩ হাজার ডলারের বেশি হলে
তবে কোনো বিদেশ ভ্রমণ প্যাকেজের মূল্য ৩ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি হলে এ সুবিধার আওতায় পুরো অর্থ টাকায় গ্রহণ করে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো যাবে না। সেক্ষেত্রে প্যাকেজের মূল্য আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় গ্রহণ করতে হবে। এ ধরনের লেনদেনে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো অ্যাকোয়ারিং সেবা দিতে পারবে। অর্থাৎ ৩ হাজার ডলার পর্যন্ত নির্ধারিত ব্যবস্থায় ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে টাকায় প্যাকেজ কেনার সুযোগ থাকলেও এর বেশি মূল্যের প্যাকেজের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কার্ডে বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধের ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে।
কাগজপত্র যাচাই করবে ব্যাংক
বিদেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত ডিলার ব্যাংককে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইনভয়েস, বিদেশি ট্যুর অপারেটর বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিপত্র, বিস্তারিত ভ্রমণসূচি এবং ভ্রমণকারীদের তালিকা পরীক্ষা করতে হবে।
এ ছাড়া ভ্রমণকারীর কাছ থেকে টাকায় অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে—এমন প্রমাণও ব্যাংককে যাচাই করতে হবে। অর্থাৎ শুধু ট্যুর অপারেটরের দাবির ভিত্তিতে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর সুযোগ থাকবে না; প্যাকেজ ও সংশ্লিষ্ট সেবার বাস্তবতা যাচাই করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর সাত দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দাখিল করতে হবে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোকে।
লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়ার আশা
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ কেনার ক্ষেত্রে দেশে বসে টাকায় অর্থ পরিশোধের সুযোগ চালু হওয়ায় গ্রাহকদের জন্য লেনদেন সহজ হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধের প্রক্রিয়াটি ব্যাংকিং চ্যানেলের আওতায় আসায় লেনদেনে স্বচ্ছতাও বাড়তে পারে। বর্তমানে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্যাকেজ, হোটেল, পরিবহন ও অন্যান্য সেবার অর্থ পরিশোধের জন্য ভ্রমণকারীদের বিভিন্ন ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়। নতুন ব্যবস্থায় ট্যুর অপারেটররা দেশে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করে ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ পাঠাতে পারবেন। ফলে একজন ভ্রমণকারীকে বিদেশি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলাদাভাবে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করার প্রয়োজন কমবে।
আউটবাউন্ড পর্যটনে প্রভাব
বাংলাদেশ থেকে বিদেশ ভ্রমণ বা আউটবাউন্ড ট্যুরিজমের বাজার দিন দিন বড় হচ্ছে। বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে ট্যুর অপারেটরদের মাধ্যমে প্যাকেজ কেনার প্রবণতাও রয়েছে। এ অবস্থায় টাকায় প্যাকেজের মূল্য পরিশোধের সুযোগ চালু হওয়াকে খাতটির জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এতে বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ বিক্রির প্রক্রিয়া আরও প্রাতিষ্ঠানিক হবে। পাশাপাশি অনুমোদিত ট্যুর অপারেটরদের মাধ্যমে লেনদেন বাড়লে এ খাতের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের ওপরও নিয়মতান্ত্রিক নজরদারি বাড়বে।
তবে নতুন ব্যবস্থায় নির্ধারিত সীমা, পাসপোর্টভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণ, ঘোষণাপত্র গ্রহণ এবং ব্যাংকের মাধ্যমে কাগজপত্র যাচাইয়ের শর্তগুলো যথাযথভাবে মানা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় বিদেশ ভ্রমণকারীদের জন্য দেশে বসেই টাকায় প্যাকেজ কেনার একটি নতুন পথ তৈরি হলো। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধের প্রক্রিয়াকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় এনে বিদেশ ভ্রমণের প্যাকেজ ব্যবসায় আরও স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।







