ঢাকার আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানার কাজ করেন রহিমা খাতুন। একদিন কাজ করতে গিয়ে গুমোট তাপে তপ্ত বাতাসের ফ্যানে টিকতে না পেরে মাথা ঘুরে পড়ে যান। ২৯ বছর বয়সী রহিমা চিকিৎসকের নিকট গিয়ে জানতে পারেন, তীব্র গরমে পানিশূন্যতার কারণে এমন হয়েছে তার।
শারীরিক অসুস্থতার কারণে কিছুদিন কাজে যেতে না পারায় প্রোডাকশনের টার্গেট পূরণ না হওয়ায় হাতছাড়া হয় ওভারটাইমের সুযোগ, আর জমানো টাকার একটি বড় অংশ চিকিৎসার পেছনে ব্যায় করে নিঃশ্ব প্রায়।
এ গল্পটি শুধু রহিমা খাতুনের একার নয় দেশের বেশিরভাগ শ্রমজীবি মানুষের একই ঘটনা। তীব্র গরম ও তাপদাহ ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমজীবী মানুষের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় শুধু ২০২৪ সালেই দেশের অর্থনীতিতে আনুমানিক ১৩০ থেকে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের সমান। আর এতে শুধু ঢাকায় প্রতিবছর প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা হারিয়ে যাচ্ছে। এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্নআয়ের মানুষ, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, নারী, প্রবীণ ও শিশুরা।
সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘এ লিভেবল ফিউচার: প্রোটেক্টিং জবস অ্যান্ড গ্রোথ ফ্রম এক্সট্রিম হিট ইন সাউথ এশিয়াস সিটিজ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দক্ষিণ এশিয়ার এক অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের ভয়াবহ চিত্র। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি বছর প্রচণ্ড গরমের কারণে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ ‘ফুল টাইম’ বা পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা চিরতরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই গতি অপরিবর্তিত থাকলে এবং কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের অর্থনীতি প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে। অথচ বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন করে আরও ২৮ কোটি কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারে যুক্ত হবেন। কিন্তু ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এ অঞ্চলের কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৫২ কোটি মানুষ বছরে অন্তত এক মাস মারাত্মক ও বিপজ্জনক মাত্রার তাপপ্রবাহের মুখে পড়বেনÍযা বর্তমান সংখ্যার চার গুণেরও বেশি।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট পরিস্থিতির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এর শহরগুলোর ওপর। কিন্তু বাড়তে থাকা তাপমাত্রা কর্মসংস্থান, জীবিকা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাপসহনশীল শহর গড়ে তোলা শুধু মানুষকে গরম থেকে রক্ষা করার বিষয় নয়; এটি কর্মসংস্থান রক্ষা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শহরগুলোকে প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে ধরে রাখার কৌশল। এখনই পদক্ষেপ নিলে দেশগুলো আরও সহনশীল ও বসবাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে পারবে।’
বিশ্বব্যাংকের এই পরিসংখ্যান কোনো কাল্পনিক সংখ্যা নয়, রাজধানী শহর থেকে শুরু করে গ্রামগুলোতে এই বিপর্যয় প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান। দেশের অন্তত পাঁচটি ভিন্ন খাতের দিকে নজর দিলেই বোঝা যায়, তাপদাহ কীভাবে এ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিঃস্ব করছে।
রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে রিকশা চালায় ৩৫ বছর বয়সী পরেশ রায়। তিনি ডেসটিনিকে জানান, খুব (তীব্র) গরমে(তাপে) রিকশার প্যাডেল ঘোরানো তো দূরের কথা, শরীর থেকে দ্রুত ঘাম(পানি) বের হয়ে হাতপায়ে টান (মাংসপেশিতে) ধরে। তাই দুপুরের দিকে ২-৩ ঘণ্টা বসে থাকে(বিশ্রাম) নিতে হয় । এজন্য দিনে ট্রিপের কম হয়।’
‘গ্যারেজের জমা ও খাবারের খরচ মেটানোর পর দিনশেষে পকেটে খুব বেশিকিছু থাকেনা’, বলে ভাস্য তার। দেশের তৈরি পোশাক কারখানায় অপর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের মধ্যে কাজ করেন হাজার হাজার শ্রমিক। ঘন ঘন লোডশেডিং হলে কখনো কখনো তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে। এর ফলে শ্রমিকদের মধ্যে শারীরিক ক্লান্তি ও অসুস্থতা দেখা দেয়, যার প্রভাব কারখানার সামগ্রিক উৎপাদনশীলতায় পছে।
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের কুলানন্দ পুর গ্রামের কৃষি শ্রমিক আনোয়ার হোসেন জানান, জমির উপরের তাপ এত বেশি থাকে যে মাঠে বেশিক্ষণ টিকে থাকা যায় না। সকাল সকাল কাজ শেষ করতে হয়। এদিকে বসে থাকেও উপায় নাই, সময়মতো ফসলের যত্ন না নিয়ে আবাদ কমে যায়।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের গৃহপরিচারিকা রহেলা বেগম (৪৫) বাসাবাড়ির রান্নার উত্তাপ সহ্য করে যখন নিজের ঘরে ফেরেন, সেখানে টিনের চাল গরম হয়ে যেন আরেক চুল্লি তৈরি হয়। তার ওপর বস্তিতে পানি ও গ্যাসের তীব্র সংকট। অনিদ্রা, উচ্চ রক্তচাপসহ নানান জটিলতার কারণে আগামীমাসে বাসার সব কাজ ছেড়ে গ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য কাজের সময়সূচি পুনর্র্নিধারণ করা এবং দুপুরের খরতাপে বিশ্রামের আইনি সুরক্ষা দেওয়া দরকার। শহরের টিনের ঘরগুলোতে তাপ-রোধী প্রলেপ বা ছাদ-বাগান নিশ্চিত করা এবং পর্যাপ্ত গণ-বিকল্প পানির সংস্থান জরুরি। গরমজনিত কারণে কর্মহীন হওয়া শ্রমিকের জন্য বিশেষ ভাতা বা স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত বিনিয়োগের মাধ্যমে সবুজ প্রযুক্তি ও পরিকল্পিত নগরায়ণে তহবিল বাড়ানো প্রয়োজন।
বিষয়টি সম্পর্কে পরিবেশবিদ ও স্ট্যামফোর্ড বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, “আমাদের শহরের অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, সবুজ এলাকা ও জলাশয় ধ্বংসের কারণে তৈরি হওয়া ‘আর্বান হিট আইল্যান্ড’ এই সংকটকে বহু গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ, যারা প্লাস্টিক বা টিনের ঘিঞ্জি ঘরে থাকেন কিংবা খোলা আকাশের নিচে কায়িক পরিশ্রম করেন, তারা শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি মারাত্মক মানসিক চাপে ভুগছেন। এটি শুধু তাদের দৈনিক উৎপাদনশীলতাই কমাচ্ছে না, বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্যের চক্রে আটকে ফেলছে। নগর পরিকল্পনায় এখনই ‘হিট অ্যাকশন প্ল্যান’ অন্তর্ভুক্ত না করলে জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ে পড়বে।”
যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (এফসিডিও) এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জলবায়ু সহনশীলতা প্রধান জন ওয়ারবারটন বিষয়টিকে কেবল একটি আবহাওয়াজনিত সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ। তার মতে, দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে চরম তাপপ্রবাহ মানুষের জীবিকা ধ্বংস করছে, জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে, উৎপাদনশীলতা কমাচ্ছে এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এটি একটি গভীর উন্নয়ন সংকট, যার মোকাবিলায় বিভিন্ন খাতে জরুরি ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, তাপদাহকে বা তাপপ্রবাহকে আর কেবল মৌসুমি বা সাময়িক কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সরকারি নীতি এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ পরিকল্পনার মূলধারায় ‘হিট রেজিলিয়েন্স’ বা তাপসহনশীলতাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমস্যার সমাধানের অনেক উপায় ইতোমধ্যেই রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন শহরে হিট অ্যাকশন প্ল্যান, তাপসহনশীল অবকাঠামো, নগর সবুজায়ন, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং দক্ষ শীতলীকরণ প্রযুক্তি মানুষের জীবন রক্ষা, শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
তবে এসব উদ্যোগ বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্নত সমন্বয় এবং সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া দ্রুত নগরায়ণের পথে এগোচ্ছে। আজ সরকারগুলো যে সিদ্ধান্ত নেবে, তার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে শহরগুলো কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হয়ে থাকবে, নাকি বাড়তে থাকা তাপমাত্রার কারণে ক্রমেই পিছিয়ে পড়বে।







