শাফিউল আল ইমরান, মাদারীপুর থেকে ফিরে: দেশে কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহারের নীরব বিপ্লব চলছে। গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে দেশের কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর, লাভজনক ও টেকসই খাতে রূপান্তরে একগুচ্ছ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে সরকার। সেই পথের সরথী হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে মাদারীপুরের সরকারি হর্টিকালচার সেন্টার।
মাদারীপুরের হর্টিকালচার সেন্টারে ঢুকতেই চোখে পড়বে নানা রঙের, নানা ধরনের বিচিত্র কাঁটায় ভরা গাছ। যেন গরম-শক্ত ও রং-বেরঙের নানা মুগ্ধকর ও অদ্ভুত ধরনের গাছের সমাহার। সেখানে শোভা পাচ্ছে ২১০ প্রজাতির ক্যাকটাস। কম দামে গাছগুলো গাছপ্রেমীদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্যই চলছে মহাযজ্ঞ। পরম যত্নে গাছের চারা উৎপাদনের কাজ করছেন হর্টিকালচার সেন্টার সংশ্লিষ্টরা।
সেখানে আধুনিক টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে এখানে উৎপাদিত হচ্ছে মাতৃগাছের হুবহু বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ও সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত চারা। ল্যাবে বর্তমানে জারবেরা, হাইব্রিড অর্কিড, লিলিয়াম, আনারস, জি-নাইন কলা, স্ট্রবেরি ও স্টেভিয়া এই সাত ধরনের ফসলের চারা উৎপাদন হচ্ছে। একই সঙ্গে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ক্যাকটাস জার্মপ্লাজম সংগ্রহশালা। ফলে বিদেশনির্ভরতা কমার পাশাপাশি কৃষক, উদ্যোক্তা ও ফুলচাষিদের কাছে স্বল্পমূল্যে উন্নত চারা পৌঁছে যাচ্ছে।
ফল, ফুল ও উচ্চমূল্যের উদ্যান ফসলের ক্ষেত্রে বিদেশি চারার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের কৃষক ও উদ্যোক্তাদের হাতে স্বল্পমূল্যে উন্নত চারা পৌঁছে দিচ্ছে সরকারি এই প্রতিষ্ঠান। গত অর্থবছরে শুধু চারা বিক্রি করেই কেন্দ্রটির আয় হয়েছে প্রায় ৫২ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছর উৎপাদন ও বিক্রির লক্ষ্য আরও বাড়ানো হয়েছে। আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টারে ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা সাংবাদিক ফারুক আহমাদ আরিফ বলেন, ‘আজ মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টারের এই টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি ঘুরে আমি সত্যি অভিভূত। আমরা বাইরে থেকে শুধু শুনি যে কৃষিতে বিপ্লব হচ্ছে, কিন্তু এখানে এসে নিজের চোখে দেখলাম কীভাবে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এক নীরব রূপান্তর ঘটে চলেছে। আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা এবং কৃষি কর্মকর্তারা যেভাবে কাজ করছেন তাতে মাঠপর্যায়ের কৃষকরা এখন সরাসরি এই আধুনিক প্রযুক্তির সুফল পাচ্ছেন।’
তিনি আরোও বলেন, ‘তারা কম খরচে ও কম ঝুঁকিতে উচ্চ ফলনশীল চারা পাচ্ছেন, যা আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করছে। কৃষি বিভাগের এই উদ্যোগকে গণমাধ্যমের কর্মী হিসেবে আমি সাধুবাদ জানাই। ঢাকা ফিরে আমি অবশ্যই এই নীরব বিপ্লবের গল্প আমার লেখার মাধ্যমে সারা দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরব, যাতে অন্য জেলাগুলোও এই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়।’
মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টার কর্তৃপক্ষ জানায়, মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টারে সংগ্রহ করা বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাসগুলো থেকে চারা উৎপাদনের কাজ চলছে। এগুলো তৈরির জন্য আলাদাভাবে দুটি ক্যাকটাস হাউজ তৈরি করা হয়েছে। কিছু ক্যাকটাস বীজ থেকে আবার কিছু ডাল থেকে বানানো হচ্ছে। আগামী বছরের মার্চ মাসে এগুলো বিক্রির উপযোগী হবে। মাত্র ২ বছরে বিক্রি করেছেন ৫ লাখ টাকা। জেলা পর্যায়ে ক্যাকটাস মানুষ পছন্দ করবে কি না, তা ভাবনার বিষয় ছিল। কিন্তু চারা প্রস্তুত করার পর সেই ভাবনা বদলে গেছে। অল্পদিনেই গাছগুলো মানুষ কিনে নিয়েছে। জেলায় ক্যাকটাসের চাহিদা অনেক বেশি। তাই বিভিন্ন পদ্ধতিতে গাছ উৎপাদন করা হচ্ছে।
বিচিত্র গাছগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, চকলেট ক্যাকটাস, পদ্মসেজী, ওপানশিয়া, ইউফরবিয়া টুলিয়রেনসিস, ডিভাইন ক্যাকটাস, বিশপ’স ক্যাপ ক্যাকটাস, র্যাটস টেইল ক্যাকটাস, ফেইরি ক্যাসেল, ম্যামিলারিয়া, অ্যাস্ট্রোফাইটাম, রেইনবো ক্যাকটাস, ওল্ড লেডি, হেমাটো ক্যাকটাস, ব্রেইন ক্যাকটাস, পিনাট ক্যাকটাস, ব্যানানা ক্যাকটাস, বান্নি ক্যাকটাস, ইচিনোপসিস, ক্যাটস টেইল ক্যাকটাস, স্টেপেলিয়া, জিমনোক্যাকটাস, ফেরো ক্যাকটাস, গোল্ডেন ব্যারেল, লাভাভিয়া, কোরাল ক্যাকটাস, ইউফরবিয়া, ওল্ড ম্যান, নোটো ক্যাকটাস, প্যারোডিয়া, ক্রিস্টেড, লেডি ফিঙ্গার, মাংকিটেইল ক্যাকটাসসহ আছে ২১০ প্রজাতির ক্যাকটাস।
ক্যাকটাসগুলোর কোনোটায় কাঁটাভর্তি, কোনোটায় কাঁটা নেই, কোনোটা গরম, কোনোটা শক্ত, কোনোটা সবুজ, কোনোটা লাল, কোনোটা নীল, কোনোটা হলুদ, কোনোটার নকশা আছে আবার কোনোটা মসৃণ। এছাড়া বিচিত্র সমাহারে ভরা। যা দেখে যে কারোরই মন জুড়িয়ে যাবে। তবে এখানে শুধু ক্যাকটাস নয়, আছে নানা প্রজাতির ফল, ফুল, ওষুধিসহ নানাজাতের গাছ। গত অর্থবছরে ৪২ লাখ টাকার গাছ বিক্রি করা হয়েছে। হর্টিকালচারটি দিনে দিনে মাদারীপুরবাসীর জন্য সৌন্দর্যময় স্থান হয়ে উঠেছে। অনেকেই পরিবার নিয়ে গাছ কেনার পাশাপাশি ঘুরতে আসেন। নানা প্রজাতির গাছ দেখে মুগ্ধ হন। হর্টিকালচারটি গাছ দিয়ে সাজানো, যে কারোরই ভালো লাগবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের মোস্তফাপুর বড় ব্রিজ এলাকায় অবস্থিত মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টারটি। হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক কৃষিবিদ আশুতোষ কুমার বিশ্বাস প্রথমে ব্যক্তি উদ্যোগে ক্যাকটাস সংগ্রহ শুরু করেন। এরপর একধরনের ক্যাকটাসের প্রেমে পড়ে যান। সেই নেশা থেকেই শুরু হয় সংগ্রহের কাজ। অনলাইনে বিভিন্ন ক্যাকটাসের গাছ দেখে কিনে আনতে শুরু করেন। এরপর বিভিন্ন নার্সারি, মানুষের বাড়ি থেকে সংগ্রহ করেন। যখন যেখানে গেছেন বা কাজের জন্য বিভিন্ন জেলায় গিয়েও ক্যাকটাস সংগ্রহ করেন। মাত্র ২ বছরেই ২১০ প্রজাতির ক্যাকটাস শোভা পাচ্ছে হর্টিকালচারে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়ও কিনে নেওয়া হচ্ছে গাছগুলো।
মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক কৃষিবিদ আশুতোষ কুমার বিশ্বাস বলেন,‘ ছাত্রজীবন থেকে ক্যাকটাস কিছু কিছু কালেকশন করতাম। তারপরও বিভিন্ন সময়ে ওই ঢাকা থেকে কিছু কিনে সংগ্রহ করতাম। তখন প্রায় আমার ১০ থেকে ১৫ জাত আমার ব্যক্তিগত কালেকশনে ছিল ।
তিনি আরোও বলেন, ‘পরবর্তীতে আমি যেখানে চাকরি করছি সেখানেই ক্যাকটাস করার চেষ্টা করছি। আমার এর আগের স্টেশন চিল খাগড়াছড়ি ছিল রামগড় হটিকালচার। সেখানেও আমরা প্রায় ৫০ জাত কালেকশন ছিল। পরে আমার ব্যক্তিগত কিছু কালেকশন ওখান থেকে এখানে নিয়ে আসি।’
আশুতোষ কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘প্রকারভেদে ক্যাকটাসের বিভিন্ন দাম হয়ে থাকে। সাধারণত ক্যাকটাসের দাম বেশি হয়। অনেকের ইচ্ছে থাকলেও দামের জন্য কিনতে পারেন না। তাই আমরা সংগ্রহ করা ক্যাকটাস থেকে চারা বানিয়ে থাকি। অল্পদামে ক্যাকটাসপ্রেমীদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্যই গত ২ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘কিছু ক্যাকটাসের বীজ হয়, সেই বীজ থেকে বহু চারা তৈরি করা যায়। কিছু ক্যাকটাস কলম করা হয়। কোনো কোনো ক্যাকটাস কুড়ি থেকে চারা তৈরি করা যায়। কিছু আছে কাণ্ড কেটেও চারা বানানো যায়। এভাবেই ক্যাকটাসের সংখ্যা বাড়াচ্ছি। আগামী মার্চ মাস থেকে তা বিক্রি করা হবে। তবে অনেকেই বলেছিলেন, মাদারীপুরে ক্যাকটাসের চাহিদা হয়তো বেশি হবে না। কিন্তু মাদারীপুরে বহু মানুষ প্রবাসে থাকেন; সেসব পরিবার অনেক সৌখিন। তারা শখ করে গাছ নেবেন। পরে আমরা যখন গাছ উৎপাদন করলাম; তখন দেখি মাদারীপুরসহ অন্য জেলা থেকেও মানুষ এসে ক্যাকটাস সংগ্রহ করছেন।’
আশুতোষ কুমার আরও বলেন, ‘আমাদের আগ্রহ বেড়ে যায়। সবার চাহিদা পূরণ করার জন্য ক্যাকটাস সংগ্রহ ও বিস্তারের জন্য কাজ করছি। মাত্র গত ২ বছরই ক্যাকটাস বিক্রি হয়েছে ৫ লাখ টাকার। আমাদের সংগ্রহ বেড়ে ২০০ প্রজাতির হয়েছে। এ প্রজাতির সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাবে বলে আশা করছি। একটা সময় আমাদের বিশাল বিচিত্র ক্যাকটাসে সংগ্রহে পরিণত হবে। তাছাড়া গাছগুলো সহজেই লাগানো যায় এবং ঘরের ভেতরে রেখে ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা যায়।’
কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির বিস্তার ঘটলে উচ্চমূল্যের ফল, ফুল ও উদ্যান ফসলের উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এতে বিদেশ থেকে চারা আমদানির ব্যয় কমবে, কৃষকের উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে ও রফতানিমুখি উদ্যান খাত আরও শক্তিশালী হবে। বিদেশ থেকে ব্যয়বহুল চারা আমদানির পরিবর্তে দেশেই যদি জীবাণুমুক্ত ও মানসম্মত চারা উৎপাদন সম্ভব হয়, তা হলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং রফতানিমুখি ফুল ও উদ্যান খাত নতুন গতি পাবে।







