মৌসুমি বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বন্যা ও পাহাড় ধসে গত ৪ জুলাই থেকে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও ভূমিধসে বাংলাদেশের ১০ জেলায় ১১ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে চট্টগ্রামে। অন্যদিকে কক্সবাজারে, বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরগুলোতে, বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সেবা ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি অব্যাহত রয়েছে।
বন্যাপরিস্থি নিয়ে অক্সফাম ইন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অনিল পান্ত বলেন, ‘বন্যা ও এর বহুমাত্রিক প্রভাবে মানুষের জীবন ও জীবিকা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। চট্টগ্রামসহ ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে বহু পরিবার ঘরবাড়ি ও আয়ের উৎস হারিয়েছে এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কক্সবাজারে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ ঘনবসতিপূর্ণ রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর অনেক পরিবার অস্থিতিশীল পাহাড়ি ঢালে বসবাস করে। নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জায়গা সীমিত হওয়ায় তারা বন্যা ও ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।’
ইুতমধ্যে বন্যায় মৃত্যু এবং আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বন্যায় হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং ঘরবাড়ি, সড়ক, বাঁধ, পানির উৎস, শৌচাগার, কৃষিজমি, মৎস্য খামার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিরাপদ খাবার পানি, জরুরি খাদ্য, আশ্রয় উপকরণ, স্বাস্থ্যবিধি ও মর্যাদা সুরক্ষা কিট, স্যানিটেশন সহায়তা এবং নমনীয় নগদ সহায়তা এখন সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন। অনেক পরিবার খাদ্য মজুত, বিছানাপত্র, রান্নার সামগ্রী ও অন্যান্য গৃহস্থালি সম্পদ হারিয়েছে। নিম্নাঞ্চলের বহু মানুষ এখনো পানিবন্দী ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। শুকনো জায়গা ও জ্বালানির অভাবে অনেক পরিবার রান্নাও করতে পারছে না।
অন্তত ৩ হাজার ৫০০টি পানির উৎস এবং ১২ হাজার ৪০০টি শৌচাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। পুনরুদ্ধার পর্যায়ে ঘরবাড়ি ও পানি-স্যানিটেশন অবকাঠামো মেরামতের পাশাপাশি জীবিকা পুনরুদ্ধারেও সহায়তা প্রয়োজন। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা আক্কাস আলী বলেন, ‘পানি এত দ্রুত বেড়েছে যে আমরা প্রায় কিছুই রক্ষা করতে পারিনি। আমাদের খাবার, বিছানাপত্র ও রান্নার সামগ্রী সব নষ্ট হয়ে গেছে। বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করাও খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। আমাদের খাদ্য, নিরাপদ পানি এবং ঘর মেরামতের সহায়তা প্রয়োজন, যাতে পরিবার নিয়ে আবার নতুন করে শুরু করতে পারি।’
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ১৬৪টি ভূমিধস এবং ৪২টি বন্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র ও অন্যান্য স্থাপনা ধসে ১৫ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। মোট ৯ হাজার ৭০৭ জন বাস্তুচ্যুত হয়ে সাময়িকভাবে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। আবহাওয়াজনিত ৪৮২টি ঘটনায় ৯ হাজার ৪৬৩ পরিবারের প্রায় ৪৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যার পানি আশ্রয়কেন্দ্র ও পানি-স্যানিটেশন অবকাঠামোয় ঢুকে পড়েছে। দীর্ঘ সময় মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়ার কারণে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল না থাকায় অনেক পরিবার আলো ছাড়াই দিন কাটাচ্ছে।
নারী ও কিশোরী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী এবং একক অভিভাবকনির্ভর পরিবারগুলো বাড়তি স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা ঝুঁকিতে রয়েছে। নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জায়গার সংকট, অস্থিতিশীল পাহাড়ি ঢাল, ক্ষতিগ্রস্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত জনঘনত্ব পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে।
অক্সফাম ইন বাংলাদেশ জরুরি মানবিক সাড়া কার্যক্রম শুরু করেছে এবং চট্টগ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ১ কোটি ২০ লাখ ৬৫ হাজার টাকা বরাদ্দ করেছে। স্থানীয় অংশীদারদের মাধ্যমে অক্সফাম দ্রুত চাহিদা ও জেন্ডারভিত্তিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছে এবং সরকারি কর্তৃপক্ষ, নিডস অ্যাসেসমেন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন ক্লাস্টারের সঙ্গে সমন্বয় করছে।
চট্টগ্রামে অক্সফামের পরিকল্পিত সহায়তার মধ্যে রয়েছে জরুরি খাদ্য, নিরাপদ খাবার পানি, সাবান, ডিটারজেন্ট, স্যানিটারি প্যাড, খাবার স্যালাইন, শাড়ি ও লুঙ্গিসহ স্বাস্থ্যবিধি ও মর্যাদা সুরক্ষা কিট। পাশাপাশি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে খাদ্য, ঘর মেরামত, চিকিৎসা, যাতায়াত ও জীবিকা পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন মেটাতে পরিবারপ্রতি ৮ হাজার টাকা বহুমুখী নগদ সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কক্সবাজারে অক্সফাম ও তার অংশীদাররা ক্ষয়ক্ষতি ও প্রয়োজন মূল্যায়ন করছে এবং কার্যক্রমভুক্ত এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামতে সহায়তা করছে। নিজ নিজ কমিউনিটিতে সম্মুখসারির সাড়াদানকারী হিসেবে কাজ করা ১০০ জন রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবককে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামও দিয়েছে অক্সফাম।
এ নিয়ে অনিল পান্ত আরও বলেন, “আমরা স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কাজ করছি, মানুষের কথা শুনছি এবং তাদের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছি। আমাদের প্রাথমিক বরাদ্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা, তবে প্রয়োজনের পরিধি অনেক বড়। আরও বেশি পরিবার যেন জীবনরক্ষাকারী সহায়তা পায় এবং মর্যাদার সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সে জন্য আমরা দাতা সংস্থা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন অংশীদার এবং সচেতন নাগরিকদের নমনীয় অর্থায়ন ও সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।”
তাৎক্ষণিক ত্রাণ, জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু-সহনশীল পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয় নেতৃত্বে ও জেন্ডার-সংবেদনশীল মানবিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়েছে অক্সফাম। এ কার্যক্রমের জন্য ৩০ লাখ ইউরো তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।







