উত্তরপশ্চিম বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত লঘুচাপটি ঘনীভূত হয়ে ‘সুস্পষ্ট লঘুচাপে’ পরিণত হয়েছে। এর প্রভাবে সারাদেশে বৃষ্টি ঝরবে আগামী পাঁচ দিন। অনেক জায়গায় দমকা হাওয়া ও বজ্রসহ বৃষ্টি, কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণ হতে পারে। উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
শনিবার আবহাওয়া দপ্তরের এক সতর্কবার্তায় বলা হয়, উত্তরপশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তর ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত লঘুচাপটি ঘনীভূত হয়ে সুস্পষ্ট লঘুচাপ আকারে একই এলাকায় অবস্থান করছে। এতে বলা হয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর মোটামুটি সক্রিয় রয়েছে।
লঘুচাপটির গতিপ্রকৃতি ও বাংলাদেশে এর প্রভাব নিয়ে আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, “এটা আসলে পশ্চিমবঙ্গ- ওডিশা উপকূলের ওপর দিয়ে যাবে। আমাদের এখানে কিছু ‘প্রেসার গ্রেডিয়েন্টের’ কারণে প্রভাব থাকবে।”লঘুচাপটি আরো শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা কম, বলেন তিনি।
বাংলাদেশে তীব্র ঝড়ের কোনো আশঙ্কা নেই তুলে ধরে তরিফুল নেওয়াজ বলেন, ‘আমরা ডান পাশে থাকায় কিছুটা প্রভাব তো পড়বেই। তবে সেটার মূল প্রভাব হবে বৃষ্টি।’
গত বৃহস্পতিবার বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি আরো ঘনীভূত হয়ে শনিবার ‘সুস্পষ্ট লঘুচাপে’ রূপ নিল।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়া ও বজ্রসহ বৃষ্টি হওয়ার কথঅ জানায়। এছাড়া ঢাকা ও খুলনা বিভাগের দুই-এক জায়গায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে। রাজশাহী, পাবনা, নীলফামারী, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, ফেনী ও চুয়াডাঙ্গা জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু তাপপ্রবাহ কিছু এলাকায় প্রশমিত হতে পারে। দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমলেও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
আবহাওয়া পূর্বাভাসে আরোও বলা হয়েছে, আজ রোববার থেকে বৃষ্টি আরও বাড়বে। ময়মনসিংহ, বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রংপুর, রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগের অনেক জায়গায় বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
সোমবার রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রংপুর বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি নামতে পারে। খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও অতি ভারী বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে।
মঙ্গলবার রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং ঢাকা ও খুলনা বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টি চলতে পারে। খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বুধবার রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় দমকা হাওয়া ও বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে।
দেশের ৮ জেলায় রাত ১টার মধ্যে ৬০ কিলোমিটার বেগে বৃষ্টি ও ব্রজবৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংস্থাটি জানিয়েছে, এসব অঞ্চলের ওপর দিয়ে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্কতা সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
শনিবার অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হামিদ মিয়া জানান, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট অঞ্চলের ওপর দিয়ে পশ্চিম অথবা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়াসহ অস্থায়ীভাবে বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে এসব অঞ্চলের নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
এল নিনো নিয়ে ডব্লিউএমও-এর সতর্কবার্তা:
গত শুক্রবার জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সতর্ক করে বলেছে, এল নিনো শুরু হয়েছে এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি দ্রুত শক্তিশালী রূপ নেবে বলে। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থাটি এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বের দেশগুলোকে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এল নিনোর কারণে মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের প্রবণতায় পরিবর্তন আসে।
সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর এল নিনো দেখা দেয় এবং এর স্থায়িত্ব হয় প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস। এল নিনো ও এর বিপরীত অবস্থা ‘লা নিনা’র মধ্যে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন ঘটে। মাঝখানে থাকে নিরপেক্ষ পরিস্থিতি। ডব্লিউএমও এল নিনোকে দুর্বল, মাঝারি, শক্তিশালী ও অত্যন্ত শক্তিশালী– এই চার শ্রেণিতে ভাগ করে থাকে। বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী এটি তৃতীয় স্তর অর্থাৎ ‘শক্তিশালী’ পর্যায়ে পৌঁছাবে।
ডব্লিউএমওর জলবায়ুবিজ্ঞানী আলভারো সিলভা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত মাসের তুলনায় এখন অনেক বেশি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে যে বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসে যদি দেখা যায় এটি আরও তীব্র রূপ নেবে, তাহলে আগামী মাসগুলোতে ডব্লিউএমও নতুন হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করবে।
জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক সংস্থাটি জানায়, বিভিন্ন বৈশ্বিক জলবায়ু কেন্দ্রের মডেলভিত্তিক পূর্বাভাসে মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ধারাবাহিক ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির খবর বলছে, এল নিনো সাধারণত নভেম্বর ও ফেব্রুয়ারির মধ্যে চরম পর্যায়ে গিয়ে ঠেকলেও তাপমাত্রা কয়েক মাস পর বাড়তে দেখা যায়। সিলভার দেওয়া তথ্যানুসারে, এল নিনোর প্রভাব চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্নভাবে অনুভূত হবে। আগামী বছরও এর প্রভাব থাকবে।
কৃষি ও স্বাস্থ্যসহ জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতগুলোকে প্রস্তুত রাখতে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে ডব্লিউএমও।
সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, ‘মানুষের জীবন রক্ষা এবং অর্থনীতি ও সমাজে সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে এসব আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি বলেন, ‘এল নিনো ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং দ্রুত শক্তিশালী হবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এর ফলে বহু অঞ্চলে খরা, অতিবৃষ্টি, স্থলভাগে তাপপ্রবাহ এবং সমুদ্রে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের ঝুঁকি আরও বাড়বে।’
ডব্লিউএমওর হালনাগাদ পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ অক্ষাংশের ৬০ ডিগ্রি থেকে উত্তর অক্ষাংশের ৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সব জনবসতিপূর্ণ স্থলভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ের বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। অন্যদিকে ভারতীয় উপমহাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।







