হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বিখ্যাত রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি ময়না পাখি অবমুক্ত করা হয়েছে। গত বুধবার (১ জুলাই) বিকেলে পাখি দুটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বনের মুক্ত আকাশে ডানা মেলার সুযোগ করে দেওয়া হয়। বন বিভাগের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় পরিবেশবাদীদের উপস্থিতিতে এই অবমুক্তকরণ কর্মসূচি সম্পন্ন হয়।
কালেঙ্গা বন বিট কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল-আমিন জানান, প্রায় মাসখানেক আগে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রেমা-কালেঙ্গা বনের গভীর ভেতরের কাঁঠালবাড়ি এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে অবৈধভাবে আটকে রাখা দুটি ময়না পাখির ছানা উদ্ধার করে বন বিভাগ। উদ্ধারের সময় ছানা দুটি অত্যন্ত দুর্বল এবং ওড়ার অনুপযোগী ছিল।
পরবর্তীতে বন বিভাগের পক্ষ থেকে পাখি দুটির বিশেষ যত্নের ব্যবস্থা করা হয়। দীর্ঘ এক মাস নিবিড় পরিচর্যা ও সঠিক খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার পর ছানা দুটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে এবং ওড়ার সামর্থ্য অর্জন করে। পাখি দুটি বনের প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকে থাকার মতো উপযুক্ত হয়েছে নিশ্চিত করার পরই গতকাল বিকেলে সেগুলোকে রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যে অবমুক্ত করা হয়।
রেমা-কালেঙ্গা বনের সহকারী বন সংরক্ষক জয়নাল আবেদীন বন্যপ্রাণী রক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে বলেন,”বন্য প্রাণী ধরা, বিক্রি করা বা খাঁচায় বন্দি করে পোষা বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। যারা এই ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ছাড় না দিয়ে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গালিব চৌধুরী এই প্রসঙ্গে জানান, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২ (যা ২০২৬ সালে সংশোধিত হয়েছে) অনুযায়ী বন্য প্রাণী ধরা, শিকার বা পাচার করা একটি গুরুতর অপরাধ। বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বন্য প্রাণীর অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পাখি অবমুক্তকরণের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে চুনারুঘাট বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল জাহির মিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ময়না পাখি মানুষের শেখানো বুলি বা কথা খুব সহজেই অনুকরণ করতে পারলেও, দীর্ঘদিন খাঁচায় বন্দি থাকলে তারা তাদের বনের নিজস্ব ভাষা ও যোগাযোগ পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভুলে যায়। ফলে হুট করে বনে ছেড়ে দিলে তারা অন্যান্য বন্য পাখির সাথে খাপ খাওয়াতে পারে না।
এ কারণে খাঁচামুক্ত করার পর পাখিগুলোকে সরাসরি বনে না ছেড়ে, কিছুদিন প্রাকৃতিক ছোঁয়া আছে এমন পরিবেশে রাখা প্রয়োজন। এতে করে তারা পুনরায় বনের ডাক ও বেঁচে থাকার কৌশলগুলো রপ্ত করতে পারে। উদ্ধারকৃত ময়না দুটির ক্ষেত্রেও এই নিয়ম মেনে চলায় তারা সহজেই বনে মানিয়ে নিতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ আবাসস্থল। তবে একশ্রেণীর অসাধু শিকারী ও পাচারকারী চক্রের কারণে এই বনের জীববৈচিত্র্য প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়ছে। পরিবেশবাদীদের মতে, ময়না পাখির মতো বন্য প্রাণীরা বনের বাস্তুসংস্থান ও প্রাকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ধরনের উদ্ধার অভিযান ও অবমুক্তকরণ কর্মসূচি একদিকে যেমন বন্যপ্রাণী পাচারকারীদের জন্য একটি কড়া হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে প্রকৃতির অধিকার প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দেওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। স্থানীয় সচেতন মহল এই ধরনের অভিযান নিয়মিত পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন।







