বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে এপ্রিল বছরের তপ্ত মাস হিসেবে পরিচিত হলেও, চলতি ২০২৬ সালে আবহাওয়ার চিরাচরিত রূপে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। তীব্র তাপপ্রবাহের পরিবর্তে এবার মাসজুড়ে ছিল অস্বাভাবিক বজ্রঝড়, শিলাবৃষ্টি ও রেকর্ড পরিমাণ বর্ষণ। আবহাওয়া অধিদফতরের (বিএমডি) তথ্যমতে, গত এপ্রিলে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিপাত:
বিএমডি জানায়, এপ্রিল মাসে কিশোরগঞ্জের নিকলিতে একদিনেই ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। পুরো মাসে সিলেট বিভাগে সর্বোচ্চ ৬০৩ মিমি এবং ঢাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে ৮০ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। বিপরীতে রাজশাহীতে ৭৮ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা দেশের সর্বনিম্ন।
কেন এই পরিবর্তন?:
আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হকের মতে, সক্রিয় পশ্চিমা লঘুচাপ ও বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বায়ুর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাষ্পীভবন বেড়েছে। ফলে শক্তিশালী ‘কিউমুলোনিম্বাস’ মেঘ তৈরি হয়ে স্বল্প সময়ে প্রবল বৃষ্টি ও ঘন ঘন বজ্রপাত ঘটাচ্ছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা একে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের স্পষ্ট প্রভাব হিসেবে দেখছেন।
বিপর্যস্ত কৃষি ও জনজীবন:
এই অকাল বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাওর অঞ্চলের কৃষকরা। কিশোরগঞ্জের নিকলি হাওরের কৃষক আব্দুল কুদ্দুস জানান, ধান কাটার উপযুক্ত সময়ে টানা বৃষ্টির কারণে ফসল ঘরে তোলা যাচ্ছে না। অনেক নিচু জমি তলিয়ে যাওয়ায় সারা বছরের আয়ের উৎস হারানোর শঙ্কায় আছেন তারা। অন্যদিকে, শহরাঞ্চলে স্বল্প সময়ের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা ও যানজট তৈরি হওয়ায় নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে।
ভবিষ্যৎ সংকেত:
জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা সতর্ক করে বলেন, ‘প্রাক-বর্ষার এই আচরণ জলবায়ু সংকটেরই প্রতিফলন।’ আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মে মাসেও এই অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশ এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে যেখানে তাপপ্রবাহ ও অতিবৃষ্টির মতো চরম আবহাওয়া নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হতে পারে।








