বান্দরবানের পাহাড় এখন ছেয়ে গেছে লাল আর হলুদের সমারোহে। গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে পাকা কাজুবাদাম। এক সময়ের তুচ্ছ আর অনাদরের এই ফল এখন পাহাড়ের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। পাকা কাজুবাদাম সংগ্রহ, বাগান থেকে কুড়ানো আর রোদে শুকানোর কাজে এখন দম ফেলার ফুসরত নেই স্থানীয় চাষিদের।
সেখানকার প্রতিনিধি সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাগানে বাগানে ঝুলছে লাল-হলুদ রঙের রসালো কাজুবাদাম। পাহাড়ের ঢালে চাষিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন ফল সংগ্রহে। কেউ গাছ থেকে ফল পাড়ছেন, কেউ ঝরে পড়া বাদামগুলো কুড়িয়ে ঝুড়ি ভরছেন। আবার বাড়ির আঙিনায় নারী ও শিশুরা মিলে সেই বাদাম ছাড়িয়ে রোদে শুকানোর কাজে ব্যস্ত।
অনাদর থেকে অমূল্য সম্পদ
স্থানীয় চাষিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এক সময় এই কাজুবাদাম পাহাড়ে ‘টাম’ নামে পরিচিত ছিল। সঠিক বাজারজাতকরণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে এগুলো বাগানেই পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যেত। বুনো ফল হিসেবেই গণ্য হতো এটি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের ফলে এটি এখন জেলার অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে।
চাষিদের মুখে হাসি
বান্দরবানের একজন বাগান মালিক বলেন, ‘আগে এই ফলের কোনো দাম ছিল না, আমরা অবহেলা করতাম। এখন এই কাজুবাদাম আমাদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। এ বছর ফলন খুব ভালো হয়েছে এবং বাজারে দামও বেশ চড়া। তাই আমরা খুব খুশি।’
চাষিরা জানান, পাহাড়ের অধিকাংশ পরিবারেই ছোট-বড় কাজু বাগান আছে। কারো দুই-চারশ গাছ, আবার কারো ২০-৩০ একরজুড়ে হাজার হাজার গাছ আছে। এ বাদাম চাষে রোগবালাই ও উৎপাদন ব্যয় কম। তবে তুলনামূলক বেশি লাভ এবং বিক্রির নিশ্চয়তা থাকায় নতুন করে কাজুবাদাম চাষে ঝুঁকছেন অনেকেই। বর্তমানে খোসাসহ প্রতি মণ কাজুবাদাম সাড়ে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
থানচি বলিপাড়া ইউনিয়নের দিনতে পাড়ার কারবারি ও কাজুবাদাম চাষি রেইনিং ম্রো জানান, আগে তার পরিবারের সাত সদস্য নিয়ে জুম চাষ করতেন। জুমে ফলন কমে যাওয়ায় এখন ২৫ একর জায়গাজুড়ে প্রায় ২ হাজার কাজুবাদাম গাছের বাগান করেছেন। গত বছর ২৭ মণ কাজুবাদাম বিক্রি করে ১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা পেয়েছেন। এবার ৫৪ মণ ফলন হবে বলে আশা করছেন। যার বাজারমূল্য প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।
থাংনাং পাড়ার লংছাই খুমী জানান, তার ৮০০ কাজুবাদাম গাছ আছে। গত বছর ২২ মণ বিক্রি করে ১ লাখ ২১ হাজার টাকা আয় করেন। এবার ২৫ মণ ফলনের আশা করছেন। বর্তমানে প্রতি মণ কাজুবাদাম সাড়ে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বলিপাড়া ইউনিয়নের বাজেরুং ত্রিপুরা জানান, আগে শুধু জুম চাষ করতেন। এখন জুম চাষের পাশাপাশি বিভিন্ন ফলদ বাগান, সাথে কাজুবাদাম বাগান করছেন। সবাই কাজুবাদাম বিক্রি করে ভালো লাভবান হচ্ছেন। গত বছর ৮০০ গাছ থেকে ২০ মণ বিক্রি করে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা পেয়েছেন। এবার ৪০ মণ ফলনের আশা করছেন।
বান্দরবান কিষাণঘরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেকুল ইসলাম বলেন, ‘২০২০ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি চালু করেছি। এখানে ৭৪ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। গত বছর সাড়ে ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা দরে প্রতি মণ কাজুবাদাম সংগ্রহ করেছি। তবে ব্যাংক থেকে কৃষিঋণ না পাওয়ায় কৃষকেরা দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে আগাম কম মূল্যে কাজুবাদাম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। আমি কৃষকদের সহজ শর্তে কৃষিঋণ দেওয়ার দাবি জানাই।’
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৫৫৬ হেক্টর জমিতে কাজুবাদাম আবাদ করে উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৪৬০ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ হাজার ৬১৯ হেক্টরে উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৬০৬ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৭১১ হেক্টরে উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৭৮১ মেট্রিক টন।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, ‘কফি ও কাজুবাদাম বান্দরবানে অত্যন্ত লাভজনক ফসল। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রদর্শনী বাগান করা হচ্ছে। ফলে দিনদিন কাজুবাদামের আবাদ বাড়ছে। কৃষকেরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। কাজুবাদাম রোপণের ৩ থেকে ৪ বছর পর ফলন আসে। তাই এটি সময়সাপেক্ষ হলেও ভবিষ্যতে আবাদ বাড়বে বলে আশা করছি।’








