সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চার হাজার মিটারের বেশি উচ্চতায় অবস্থিত চীনের তুষারাবৃত পাহাড়ে ঘেরা তিব্বতের উঁচু মালভূমিতে সম্পূর্ণ গোপন এক গবেষণাগারে কাজ করছেন একদল বিজ্ঞানী। তাদের লক্ষ্য শিংওয়ালা, লম্বা লোমে ঢাকা ইয়াকের ক্লোন তৈরি করা। সাধারণ ইয়াক নয়, বরং দ্রুত বর্ধনশীল, আকারে বড়, রোগ প্রতিরোধক্ষম এবং অধিক প্রজননক্ষম ‘অভিজাত’ বা ‘সুপার ইয়াক’ পাল গড়ে তুলতে চাইছেন তারা।
চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সরকারের সহায়তায় পরিচালিত এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২৮ সালের মধ্যে শতাধিক উন্নত বৈশিষ্ট্যের ক্লোন ইয়াক তৈরির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। গবেষকদের দাবি, এ প্রযুক্তি তিব্বতের গৃহপালিত ইয়াক শিল্পকে লাভজনক ও টেকসই করার পাশাপাশি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা বন্য ইয়াকের বিরল উপপ্রজাতি সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখতে পারে।
এমনকি স্থানীয় তিব্বতিদের কাছে ভূমি দেবতার প্রিয় প্রাণী হিসেবে বিবেচিত বিরল ‘গোল্ডেন ওয়াইল্ড ইয়াক’ বা সোনালি বন্য ইয়াককেও ক্লোনিং প্রযুক্তির মাধ্যমে রক্ষা করার চেষ্টা চলছে। তবে প্রকল্পটির বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনার পাশাপাশি প্রাণীর কল্যাণ, জিনগত বৈচিত্র্য, ব্যর্থ গর্ভধারণ এবং গবেষণার স্বচ্ছতা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নৈতিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তিব্বতের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে ইয়াকের সম্পর্ক কয়েক শতাব্দীর। হিমালয় অঞ্চলের লম্বা লোমওয়ালা এ গবাদিপশু থেকে যাযাবর ও স্থানীয় কৃষকরা পশম, দুধ ও মাংস সংগ্রহ করেন। ইয়াককে জমি চাষ, ভার বহন এবং পরিবহনেও ব্যবহার করা হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থলের অবক্ষয়, অন্তঃপ্রজনন ও অন্য প্রজাতির সঙ্গে সংকরায়ণের কারণে গৃহপালিত ও বন্য—উভয় ধরনের ইয়াকই দীর্ঘদিন ধরে সংকটে রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইয়াকের সংখ্যা ও গুণগত মান বাড়াতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কয়েক কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে চীনা কর্তৃপক্ষ। তাদের ধারণা, প্রাকৃতিক প্রজননের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত উন্নত বৈশিষ্ট্যের ইয়াক তৈরি করা সম্ভব হবে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রথম সফল ইয়াক ক্লোনের জন্ম হয়। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ঘটনাটিকে জিন নির্বাচনের সঙ্গে ক্লোনিং প্রযুক্তির সমন্বয়ে অর্জিত বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক সাফল্য হিসেবে প্রচার করে। চলতি বছরের বসন্তে আরো ১০টি ক্লোন ইয়াকের জন্ম হয়েছে।
প্রকল্পটির বৈজ্ঞানিক প্রধান এবং বিপন্ন বন্যপ্রাণীর জিনগত সম্পদবিষয়ক রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক ফাং শেংগুও চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়াকে বলেন, এ সাফল্যের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে ইয়াক ক্লোনিং প্রযুক্তি আর এককালীন পরীক্ষামূলক সাফল্যের মধ্যে সীমিত নেই। বরং এটি এখন স্থিতিশীলভাবে এবং বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তবে প্রকল্পটি ঘিরে প্রকাশিত তথ্যের প্রায় পুরোটাই এসেছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে। গবেষণা পদ্ধতি, ব্যর্থ পরীক্ষা, প্রাণীর মৃত্যুহার, গর্ভপাত কিংবা নৈতিক তদারকির বিষয়ে বিস্তারিত কোনো স্বাধীন তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সিএনএন প্রকল্পপ্রধান ফাং শেংগুও, গবেষণা দলের অন্য সদস্য, তার কর্মস্থল ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়, চীনের রাষ্ট্রীয় পরিষদের তথ্য কার্যালয় এবং তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের তথ্য কার্যালয়ের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে। তবে সংশ্লিষ্টরা হয় অন্য কর্তৃপক্ষের কাছে যোগাযোগ করতে বলেন, নয়তো কোনো উত্তর দেননি।
বন্য ও গৃহপালিত ইয়াকের জন্য ভিন্ন লক্ষ্য:
তিব্বতে প্রধানত দুই ধরনের ইয়াক রয়েছে—বন্য ইয়াক এবং গৃহপালিত ইয়াক। ক্লোনিং প্রকল্পে এ দুই ধরনের ইয়াককে ঘিরে আলাদা লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বন্য ইয়াক বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে এবং চীনের আইনে সংরক্ষিত প্রাণী। ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ বছরে বন্য ইয়াকের সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি কমেছে। বর্তমানে বিশ্বে মাত্র ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার বন্য ইয়াক অবশিষ্ট রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
অন্যদিকে গৃহপালিত ইয়াক বিলুপ্তির ঝুঁকিতে নেই। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ গৃহপালিত ইয়াক রয়েছে, যার বড় অংশই তিব্বতি মালভূমির উচ্চ এলাকায় বসবাস করে। এসব ইয়াক তিব্বতের গ্রামীণ অর্থনীতির মূল ভিত্তিগুলোর একটি।
তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণে উভয় প্রজাতিই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিব্বতি মালভূমিতে বহিরাগত উদ্ভিদ ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে খাদ্য ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য প্রাণীগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিকূল ও ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রে এ পরিবর্তনকে বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইয়াকের পশম দিয়ে পোশাক তৈরির প্রতিষ্ঠান শোকাইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ক্যারল চিয়াউ বলেন, মালভূমির বাস্তুতন্ত্র অত্যন্ত নাজুক। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেখানে চরম আবহাওয়া বাড়ছে। কোনো এলাকায় প্রচণ্ড শীতকালীন ঝড় হলে পুরো ইয়াক পাল ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
ইয়াকের জিনগত বৈচিত্র্য কমে যাওয়াও বড় সমস্যা। বন্য ইয়াক গৃহপালিত ইয়াকের সঙ্গে সংকরায়িত হওয়ায় বন্য ইয়াকের স্বতন্ত্র জিনগত ভাণ্ডার সংকুচিত হচ্ছে। একইভাবে গৃহপালিত ইয়াক গরুর সঙ্গে সংকরায়িত হওয়ায় তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তিত হচ্ছে।
একই প্রজাতির মধ্যে নিয়ন্ত্রণহীন অন্তঃপ্রজননের কারণেও ইয়াকের জিনগত বৈচিত্র্য, স্বাস্থ্য ও প্রজননক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের গত বছরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ফাং শেংগুও বলেন, গত এক দশকে ইয়াকের শরীরের আকার ও ওজন কমেছে। একই সঙ্গে তাদের প্রজননক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে। প্রাকৃতিক প্রজনন ও নিষেকের সফলতার হার মাত্র ২০ শতাংশে নেমে এসেছে।
তার ভাষায়, মানুষের কর্মকাণ্ড এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে ইয়াকের জনগোষ্ঠী গুরুতর অবক্ষয় সংকটে পড়েছে। ক্লোনিং প্রযুক্তির মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।
যেভাবে তৈরি হচ্ছে ইয়াকের ক্লোন:
একটি ইয়াকের ক্লোন তৈরির প্রথম ধাপে বিজ্ঞানীরা সবচেয়ে শক্তিশালী, সুস্থ এবং কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের ইয়াককে ডিএনএ দাতা হিসেবে নির্বাচন করেন। এরপর প্রাণীটির দেহের কোনো সাধারণ বা সোমাটিক কোষ সংগ্রহ করা হয়। এ ধরনের কোষ প্রজনন কোষ নয়।
কোষটি থেকে নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রক বের করা হয়। কেন্দ্রকের মধ্যেই প্রাণীটির জিনগত তথ্য সংরক্ষিত থাকে। এরপর অন্য একটি ইয়াকের ডিম্বাণু থেকে এর নিজস্ব কেন্দ্রক সরিয়ে সেখানে নির্বাচিত ইয়াকের দেহকোষের কেন্দ্রক স্থাপন করা হয়।
এভাবে তৈরি ডিম্বাণুটি বিভাজিত হয়ে ক্লোন ভ্রূণে পরিণত হয়। এরপর ভ্রূণটি সারোগেট বা গর্ভধারী স্ত্রী ইয়াকের জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়। গর্ভকাল শেষে জন্ম নেয় জিনগতভাবে দাতা ইয়াকের প্রায় অভিন্ন ক্লোন।
প্রথম সফল ক্লোনটি তৈরি করা হয়েছিল গৃহপালিত ইয়াকের ডিএনএ থেকে। কালো লোমে ঢাকা ছোট বাছুরটির জন্ম হয়েছিল অস্ত্রোপচার বা সিজারিয়ান পদ্ধতিতে।
সিনহুয়ার প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, জন্মের পর হাঁটু কিছুটা বাঁকানো বাছুরটি খড়ের ওপর শুয়ে আছে। সাদা কোট পরা বিজ্ঞানীরা তাকে স্পর্শ করছেন এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন।
এরপর জন্ম নেয়া ১০টি ক্লোন ইয়াকও গৃহপালিত প্রজাতির। ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি, এ ১০টি বাছুরের সবই স্বাভাবিকভাবে জন্মেছে। গবেষকদের মতে, স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হওয়ায় ভবিষ্যতে বড় পরিসরে ক্লোন ইয়াক উৎপাদন তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।
জুন পর্যন্ত সব ক্লোন বাছুর সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে বলে চীনা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ইয়াক শিল্পে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা:
চীনা গবেষকদের দাবি, ক্লোনিং প্রযুক্তি গৃহপালিত ইয়াক শিল্পে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। প্রাকৃতিক প্রজননের তুলনায় ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত উন্নত বৈশিষ্ট্যের প্রাণী তৈরি করা সম্ভব।
ইয়াকের প্রজনন প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই ধীর। একটি স্ত্রী ইয়াক তার পুরো জীবদ্দশায় সাধারণত মাত্র চার থেকে পাঁচটি বাচ্চা জন্ম দেয়। ফলে উন্নত বৈশিষ্ট্যের ইয়াকের সংখ্যা দ্রুত বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ইয়াক কঠোর পরিবেশের সঙ্গে বিশেষভাবে অভিযোজিত। তীব্র ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তাদের শরীরে ঘন ও লম্বা পশম রয়েছে। বাতাসে অক্সিজেন কম থাকা উচ্চভূমিতে শ্বাস নেয়ার জন্য তাদের ফুসফুসও তুলনামূলকভাবে বড়।
গবেষকরা এখন এমন ইয়াককে ডিএনএ দাতা হিসেবে নির্বাচন করতে চান, যাদের দ্রুত বৃদ্ধির ক্ষমতা, আকারে বড় হওয়া, বেশি প্রজননক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ, প্রতিকূল আবহাওয়া সহ্য করার ক্ষমতা এবং উন্নত উৎপাদনশীলতার মতো বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচিত উন্নত জিনগত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ইয়াকের ক্লোন তৈরি করলে সামগ্রিক ইয়াক জনগোষ্ঠীর গুণগত মান বাড়বে। এর ফলে স্থানীয় কৃষকদের আয় এবং জীবিকা উন্নত হতে পারে।
তবে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যে তৈরি ক্লোন ইয়াকগুলো ঠিক কোন বৈশিষ্ট্যের জন্য নির্বাচন করা হচ্ছে, সেটি স্পষ্ট নয়। তারা বেশি দুধ উৎপাদন করবে, বেশি মাংস দেবে, বিশেষ ধরনের পশম উৎপাদন করবে নাকি কেবল আকারে বড় হবে—এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সোনালি বন্য ইয়াক বাঁচানোর চেষ্টা:
গৃহপালিত ইয়াক শিল্পের পাশাপাশি ক্লোনিং প্রযুক্তি বন্য ইয়াক সংরক্ষণেও ব্যবহার করতে চান গবেষকরা। বিশেষ করে গোল্ডেন ওয়াইল্ড ইয়াক নামে পরিচিত বিরল সোনালি বন্য ইয়াক তাদের প্রধান লক্ষ্য।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে এ উপপ্রজাতির মাত্র প্রায় ৩০০টি ইয়াক অবশিষ্ট রয়েছে। বিরলতা ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার কারণে প্রাণীটিকে কখনো কখনো ‘ঐশ্বরিক প্রাণী’ হিসেবেও বর্ণনা করা হয়।
২০২৫ সালে এ প্রাণীর ক্লোন তৈরির কাজ শুরু করেন গবেষকরা। মৃত সোনালি বন্য ইয়াক থেকে কোষের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ওই কোষ ব্যবহার করে তৈরি ক্লোন ভ্রূণ সারোগেট মা ইয়াকের জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
এপ্রিলে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানায়, গবেষকরা বন্য ইয়াক, সোনালি বন্য ইয়াক এবং তাদের সংকর বংশধরের দুই শতাধিক ক্লোন ভ্রূণ তৈরি করেছেন।
তবে এ অংশের গবেষণা সম্পর্কে তথ্য অত্যন্ত সীমিত। এখন পর্যন্ত কোনো বন্য ইয়াক ক্লোন সফলভাবে জন্মেছে বলে গবেষকরা ঘোষণা করেননি। সারোগেট মা ইয়াকগুলোর কী হয়েছে, প্রতিস্থাপিত ভ্রূণগুলোর কতটি টিকে রয়েছে কিংবা গর্ভধারণ কত দূর এগিয়েছে, সেসবও জানা যায়নি।
নৈতিক দ্বিধা ও প্রাণীর দুর্ভোগ:
ক্লোনিং প্রকল্পটিকে কেউ কেউ যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ও বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণের সম্ভাবনাময় উপায় হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে অনেকের কাছে এটি উদ্বেগজনক ও কল্পবিজ্ঞানসদৃশ পরীক্ষা। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের পশুচিকিৎসক ও জীব-নৈতিকতাবিদ লিসা মোজেস বলেন, এ ধরনের প্রকল্পের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বিচার করতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন।
প্রকল্পটির লক্ষ্য বাস্তবসম্মত কিনা, এটি পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকরভাবে সহায়তা করবে কিনা, পদ্ধতিটির সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটা, জবাবদিহির ব্যবস্থা রয়েছে কিনা এবং গবেষণার সময় প্রাণীগুলো কী ধরনের প্রভাব ও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
মোজেসের মতে, প্রকল্পটির উদ্দেশ্যও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষ কৃষি ও বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য ক্লোনিং ব্যবহারের তুলনায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য ক্লোনিং ব্যবহারে সাধারণত বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণে ক্লোনিংয়ের আগের উদাহরণও রয়েছে। ২০২০ সালে সান দিয়েগো চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বিপন্ন প্রজেওয়ালস্কি ঘোড়ার সফল ক্লোন তৈরির ঘোষণা দেয়। প্রাণীটি বিশ্বের শেষ প্রকৃত বন্য ঘোড়া হিসেবে পরিচিত।
এর কয়েক মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এলিজাবেথ অ্যান নামে অত্যন্ত বিপন্ন ব্ল্যাক-ফুটেড ফেরেটের ক্লোন প্রকাশ করেন।
এছাড়া উলি ম্যামথ ও ডায়ার উলফের মতো বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন ‘ডি-এক্সটিংশন’ প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রকল্পও বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ক্লোনিং ও জিন সম্পাদনার সমালোচকরা শুরু থেকেই প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ, ‘ঈশ্বরের ভূমিকা’ নেয়া এবং ভবিষ্যতে একই প্রযুক্তি মানুষের ওপর প্রয়োগের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে আসছেন।
কিছু বিজ্ঞানীর আশঙ্কা, ক্লোনিং ও বিলুপ্ত প্রাণী ফিরিয়ে আনার প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পরিবেশ রক্ষার জরুরি প্রয়োজন সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা কমাতে পারে। পৃথিবীর পরিবেশ ধ্বংস হতে থাকলে কেবল ক্লোন তৈরি করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
তাদের মতে, আবাসস্থল পুনরুদ্ধার, কার্বন নিঃসরণ কমানো, শিকার বন্ধ করা এবং বাস্তুতন্ত্র রক্ষার মতো মূল কারণগুলো মোকাবিলা অব্যাহত রাখতে হবে।
অন্যদিকে মোজেস বলেন, অনেক সংরক্ষণবিদের মধ্যে এখন এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে প্রচলিত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ পদ্ধতি কার্যত ব্যর্থ হচ্ছে। গত ১০০ বছর ধরে পরিবেশগত ধ্বংস ঠেকাতে নেয়া উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।
এ যুক্তি অনুযায়ী, বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হলে সিনথেটিক বায়োলজিসহ নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা ছাড়া হয়তো আর কোনো বিকল্প নেই। প্রয়োজনে বিবর্তনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে অতিক্রম করে পরিবেশের উপযোগী করে প্রজাতির টিকে থাকার ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সেন্টার ফর বায়োমেডিকেল এথিকসের প্রধান জুলিয়ান সাভুলেস্কু ক্লোনিং প্রযুক্তির প্রতি তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক।
তার মতে, ক্লোনিং ও জিন নির্বাচন যদি এমন প্রাণী তৈরি করতে পারে, যারা অধিক সুস্থ থাকবে, দীর্ঘজীবী হবে এবং মানুষের বেশি উপকার করবে, তাহলে এ প্রযুক্তি ব্যবহার কেবল অনুমোদনযোগ্যই নয়, বরং এটি প্রয়োগের নৈতিক দায়িত্বও থাকতে পারে।
তবে তিনিও ক্লোনিংয়ের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন। ক্লোনিং এখনো অসম্পূর্ণ বিজ্ঞান। এ প্রক্রিয়ায় জন্ম নেয়া প্রাণীর মধ্যে জিনগত অস্বাভাবিকতা, বিকলাঙ্গতা বা স্বাস্থ্যগত জটিলতা দেখা দিতে পারে।
সাভুলেস্কু প্রশ্ন তোলেন, অল্পসংখ্যক ‘অভিজাত’ ইয়াক তৈরির জন্য গবেষকরা কি বিপুলসংখ্যক প্রাণীর অযৌক্তিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করছেন?
ব্যর্থ পরীক্ষা ও মৃত্যুর তথ্য অজানা:
চীনা ও তিব্বতি কর্তৃপক্ষের দেয়া সীমিত তথ্যের কারণে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
১১টি সফল ক্লোন জন্মের আগে কতবার ভ্রূণ প্রতিস্থাপন ব্যর্থ হয়েছে, কতটি গর্ভপাত হয়েছে, কতটি বাছুর মৃত বা বিকলাঙ্গ অবস্থায় জন্মেছে এবং কতটি সারোগেট মা ইয়াক মারা গেছে—এসব কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
গবেষকদের ব্যবহৃত ‘স্বাভাবিক জন্ম’ শব্দটির সুনির্দিষ্ট অর্থও জানা যায়নি। স্বাভাবিক জন্ম বলতে কোনো চিকিৎসা সহায়তা ছাড়াই প্রসব বোঝানো হয়েছে, নাকি অস্ত্রোপচার ছাড়াও অন্য ধরনের হস্তক্ষেপ করা হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়।
একই জিনগত বৈশিষ্ট্যের বিপুলসংখ্যক ক্লোন তৈরি করলে ইয়াকের জিনগত বৈচিত্র্য আরো কমে যেতে পারে। ক্লোন পালটির মধ্যে বৈচিত্র্য নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, সেটিও প্রকাশ করা হয়নি।
এছাড়া প্রকল্পটি কোন নৈতিক নীতিমালা অনুসরণ করছে, স্বাধীন তদারকি প্রতিষ্ঠান রয়েছে কিনা এবং প্রাণীদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে কী ধরনের বিধিবিধান প্রয়োগ করা হচ্ছে, সে সম্পর্কেও কোনো তথ্য নেই।
শোকাইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ক্যারল চিয়াউ বলেন, প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সম্পর্কে আরো তথ্য প্রয়োজন। কৃষিশিল্পের জন্য ক্লোন ইয়াক তৈরি করা হলে কোন বৈশিষ্ট্যগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে, তা জানা জরুরি।
বেশি দুধ, উন্নত মাংস কিংবা নির্দিষ্ট ধরনের পশম উৎপাদনের জন্য যদি ইয়াককে বেছে নেয়া হয়, তাহলে এসব বৈশিষ্ট্য সামগ্রিক ইয়াক জনগোষ্ঠী এবং তিব্বতের পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, সেটিও মূল্যায়ন করতে হবে।
লিসা মোজেস বলেন, পরিবেশ রক্ষার নামে ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে নেয়া অনেক উদ্যোগ ইতিহাসে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিকর ফল বয়ে এনেছে। তার মতে, আগের অনেক প্রযুক্তির তুলনায় ক্লোনিং ও জিন নির্বাচন প্রযুক্তিতে অজানা ঝুঁকির পরিমাণ আরো বেশি।
ফলে তিব্বতের ‘সুপার ইয়াক’ প্রকল্প সফলভাবে স্থানীয় অর্থনীতি ও বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে, নাকি সীমিতসংখ্যক উন্নত প্রাণী তৈরির জন্য বড় ধরনের প্রাণিকল্যাণ ও পরিবেশগত ঝুঁকি সৃষ্টি করবে—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত।
সিএনএন অবলম্বনে







