জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে দুনিয়াজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পৃথিবীর উষ্ণায়ন বাড়ছে। বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিকতম গবেষণা ও সতর্কবার্তা অনুযায়ী, দ্রুতগতিতে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মশা, মাছি এবং এঁটুলির বংশবৃদ্ধি ও তৎপরতা অনেক বেড়েছে, এর ফলে গবাদি পশুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) এবং ক্ষুরা রোগ বা এফএমডি এর মতো ভাইরাসজনিত রোগগুলোর প্রকোপ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই সংক্রামক রোগের হাত থেকে দেশের প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি খাতকে রক্ষা করতে চলতি বছরে বড় পরিসরে ভ্যাকসিন আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
প্রাণী সম্পদ খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, গরমের কারণে সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় গবাদিপশুর ভাইরাসজনিত ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ (এলএসডি) উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষকরে গ্রীষ্মকাল ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে এ রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। প্রাণী রক্ষায় এফএমডি (ক্ষুরারোগ) ও এলএসডি গবাদিপশুর গুরুত্বপূর্ন রোগ। এ রোগ ২টির কারণে খামারীদের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমান অনেক বেশি হয়। তাই প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের আগাম ভ্যাকসিন আমদানির উদ্যোগ একটি যুগোপোযোগী সিদ্ধান্ত।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এলএসডি একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত গরু, মহিষ ও ছাগলকে আক্রান্ত করে। এ রোগে আক্রান্ত পশুর শরীরে গুটি, ক্ষত, জ্বর, পা ফুলে যাওয়া, খাদ্যে অনীহা এবং দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। ফলে খামারিদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বিগত বছরের ন্যায় চলতি বছরে গবাদিপশু ইতোমধ্যে এ রোগে আক্রান্তের হার কম। অনেক খামারি ও গৃহস্থ পশুর শরীরে গুটি ও ক্ষত দেখা দেওয়ার পর উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ্য হয়েছেন।
প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১৯২৯ সালে আফ্রিকার জাম্বিয়ায় প্রথম এ রোগ শনাক্ত হয়। পরে ধীরে ধীরে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম অঞ্চলে লাম্পি স্কিন ডিজিজ শনাক্ত হয়। এরপর দেশের বিভিন্ন জেলায় রোগটি বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে এটি গবাদিপশু খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা-মাছি ও অন্যান্য রক্তচোষা কীটপতঙ্গের মাধ্যমে এ রোগ দ্রুত ছড়ায়। এছাড়া আক্রান্ত পশুর লালা, খাবার, ব্যবহৃত সামগ্রী, এমনকি একই সিরিঞ্জ একাধিক পশুর শরীরে ব্যবহার করলেও ভাইরাসটি এক পশু থেকে অন্য পশুতে সংক্রমিত হতে পারে। আক্রান্ত ষাঁড়ের বীর্য প্রজননে ব্যবহার করলেও রোগ বিস্তারের ঝুঁকি থাকে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, আক্রান্ত পশু প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং খাদ্যের প্রতি অনীহা দেখা দেয়। পরবর্তীতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে শক্ত গুটি সৃষ্টি হয়, যা ক্ষতে পরিণত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নাক ও মুখ দিয়ে লালা ঝরা, পা ফুলে যাওয়া এবং শরীরে পানি জমার মতো লক্ষণও দেখা যায়। সময়মতো চিকিৎসা না করালে পশু দুর্বল হয়ে পড়ে এবং উৎপাদনশীলতা কমে যায়।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাণিস্বাস্থ্য শাখার এক উপপরিচালক বলেন, মশা-মাছি, মুখের লালা ও খামারে অব্যবস্থাপনার কারণে এ রোগ ছড়ায়। এ রোগে প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে আক্রান্ত গরুর শরীরের তাপমাত্রা ১০৩-১০৫ ডিগ্রিতে পর্যন্ত হয়ে থাকে। গরু খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেয়। শরীরে খুবই ব্যথা হয়। তার দুদিন পর গরুর শরীরের বসন্তের মতো গুটি গুটি চাকা দেখা দেয়। পরে সেখান থেকে পুঁজ জমে ফেটে মাংস খসে পড়ে। এতে গরুর ওজন ও দুধ উৎপাদনও কমে যায়। আক্রান্ত গরুকে শনাক্ত করে আলাদা রাখতে না পারলে অন্য প্রাণীতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। জুন, জুলাই ও আগস্টএই তিন মাস এলএসডির জন্য পিক টাইম।
**কী করছে প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তর:
মূলত এফএমডি এবং এলএসডি রোগ নির্মূলের লক্ষ্যে প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তর বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ বিষয়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক(ডিজি) মো. শাহজামান খান বলেন, ‘ইতিমধ্যে এলএসডি রোগের জন্য প্রায় দুই কোটি ডোজ ভ্যাকসিন বেসরকারীবাবে আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশে ভ্যাকসিনের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। গত বছর যেখানে উৎপাদন ছিল ৫ লাখ, এবার তা বাড়িয়ে ২০ লাখ করা হচ্ছে ।‘
তিনি আরোও বলেন, ‘দেশের চাহিদা অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পর্যাপ্ত না হওয়ায় বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে ভ্যাকসিন আমদানির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে । ঘাটতি মোকাবেলায় চাহিদা অনুপাতে তারা যেন এই ভ্যাকসিন আমদানি করবে।’
অধিদপ্তর সূত্রে জানাগেছে, দেশে সরবরাহকৃত ভ্যাকসিনের পরিমান পর্যাপ্ত না থাকার কারণে ২ কোটি ডোজ ট্রাইভ্যালিন এফ এমডি ভ্যাকসিন এবং ২ কোটি ডোজ এলএসডি ভ্যাকসিন আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও বাণিজ্যিক মুরগি তেলোপ্যাথোজনিক একটি প্রাণঘাতি রোঘ। এরোগে আক্রান্ত হলে খামারীদের ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। তাই বাণিজ্যিক মুরগিতে লোপ্যাথোজনিক প্রতিরোধে এইচ৯এন২ এর বিভিন্ন কম্বিনেশন ভ্যাকসিন আমদানি করা হবে।
বাজারে এই ভ্যাকসিনের ঘাটতি থাকার কারণে ৫০ কোটি ডোজ এইচ৯এন২ এবং এর বিভিন্ন কম্বিনেশন ভ্যাকসিন আমদানির বিষয়ে অনুমোদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যাতে করে বাণিজ্যিক মুরগি উৎপাদনে সুরক্ষা প্রদান করা যায় এবং খামারীরা লাভবান হন।







