
ভারতে কাস্টার্ড আপেল বা আতাফলের চাষ এখন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। একসময় অবহেলিত এই ফলটি এখন স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিচ্ছে। কম পানিতে টিকে থাকা, তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন এবং উন্নত জাত উদ্ভাবনের কারণে আতাফল ধীরে ধীরে কৃষকদের কাছে লাভজনক ফসলে পরিণত হচ্ছে।
সম্প্রতি দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের কোলার জেলার কৃষক পরিবারের সন্তান অশোকা শিবারেড্ডির গল্প তুলে ধরা হয়েছে বিবিসির প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, খরাপ্রবণ কোলার জেলায় বৃষ্টিপাত খুব কম হয়। এ কারণে কৃষকদের পানি তোলার জন্য গভীর নলকূপ খনন করতে হয়। এ খাতেই অধিকাংশ অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে কৃষকদের।
শিবারেড্ডির পরিবার ক্ষতির মুখে পড়ে একসময় কৃষিকাজ ছেড়ে বেঙ্গালুরু চলে যায়। সেখানে পরিবারটি সবজির ব্যবসা শুরু করে। পরে শিবারেড্ডি আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সভিত্তিক (এআই) সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করেন। কিন্তু তার কৃষির প্রতি টান থেকে যায়।
২০১৮ সালে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পারিবারিক খামার পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সিদ্ধান্ত নেন শিবারেড্ডি। ওই সময় তিনি এমন একটি ফসলের খোঁজ করছিলেন, যা অল্প পানিতেও বেঁচে থাকে এবং কীটনাশকের প্রয়োজন কম হয়। সেই ভাবনা থেকেই আতাফল বেছে নেন শিবারেড্ডি।
এ ফলের শাঁস নরম ও মিষ্টি এবং এর স্বাদ অনেকটা কাস্টার্ডের মতো হওয়ার কারণে ইংরেজিতে নামকরণ করা হয়েছে কাস্টার্ড আপেল। শিবারেড্ডির এলাকায় আতাফলের গাছ আগে বুনোগাছ হিসেবে জন্মাত এবং এর ফল বাজারে বিক্রি করতেন স্থানীয়রা। কিন্তু এর ব্যাপক সম্ভাবনা দেখে পরিকল্পিতভাবে চাষ শুরু করেন এই কৃষক।
শিবারেড্ডি তার পরিকল্পনা অনুযায়ী সাধারণ খামারের তুলনায় কাছাকাছি দূরত্বে গাছ লাগানো শুরু করেন। তিনি তিন ধরনের জাত নির্বাচন করেন। ফলও বেশ ভালো পেয়েছেন। ২০২৫ সালে প্রায় ২০ টন ফল উৎপাদন হয়েছে। আর চলতি বছর সেই উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ টনে।
এদিকে আতাফলের ব্যাপক উৎপাদন হলেও এর চাষে কিছু ঝুঁকি রয়েছে। প্রচলিত ‘বালাঙ্গার’ জাতের ফল অল্প সময়ের মধ্যেই নষ্ট হয়, মাত্র তিন থেকে চার দিনেই নষ্ট হয়ে যায়। আবার এর বীজ বেশি থাকার কারণে ক্রেতাদের আগ্রহও কম। এ সমস্যা সমাধানে বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব হর্টিকালচার রিসার্চের বিজ্ঞানীরা কাজ করেছেন। তারা ‘আরকা সাহান’ নামে একটি হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন করেছেন। নতুন জাতের ফল ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত ভালো থাকে, এর বীজও কম এবং শাঁস বেশি।
গবেষকদের মতে, বুনো জাতের তুলনায় নতুন উদ্ভাবিত জাত থেকে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ ব্যবহারযোগ্য ফল পাওয়া যায়। বর্তমানে গবেষকরা এর শাঁস দীর্ঘ সময় সাদা ও সতেজ রাখার ব্যাপারে প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। যাতে করে এর শাঁস আইসক্রিম, মিল্কশেকসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে অধিকতর ব্যবহার করা যায়।
ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যে এখন সবচেয়ে বেশি আতাফল উৎপাদন হয়। সেখানকার কৃষক নবনাথ মালহারি কাসপাটে দীর্ঘ সময় ধরে নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। গবেষণার পর ‘এনএমকে-০১’ নামে উচ্চফলনশীল একটি জাতও তৈরি করেছেন তিনি, যে জাতটি ২০১৪ সালে বাজারে আসে। নতুন এই জাতের ফল সহজে নষ্ট হয় না এবং এটি রপ্তানিযোগ্য। কৃষক নবনাথের খামারে প্রায় ৫০ একর জমিতে চাষ হচ্ছে এই আতাফল।
এ ফল এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইউরোপে রপ্তানি হচ্ছে। কিন্তু এর রপ্তানি প্রক্রিয়া বেশ জটিল। ফল সংগ্রহ, প্যাকেজিং, শীতলীকরণ ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপ খুবই সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আতাফল এখন আর শুধু একটি স্থানীয় ফল নয়; এটি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্যে হিসেবে পরিণত হচ্ছে।








