দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়, শ্রমিকদের মজুরি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাড়ায় রেস্তোরাঁ খাত চরম সংকটে পড়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। তাদের দাবি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও পরিচালন খরচ বাড়লেও খাবারের দাম বাড়াতে পারছেন না রেস্তোরাঁমালিকেরা। দাম বাড়াতে গেলে জেলা প্রশাসন হস্তক্ষেপ করছে। এদিকে দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিতে রেস্তোরাঁয় বিক্রি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে—এমন দাবিও তাদের।
এ পরিস্থিতিতে খাবারের দাম সমন্বয়ে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ বন্ধ, সম্পূরক শুল্ক ও উৎসে কর প্রত্যাহার এবং রেস্তোরাঁ ব্যবসার জন্য একক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
শনিবার পল্টনের একটি হোটেলে মালিক সমিতি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান। এসময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির ফাষ্ট জয়েন সেক্রেটারী ফিরোজ আলম সুমন, রংপুরের স্কাই লাউন এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর(এমডি) এ কে এম বানিউল আদম বাবুসহ অনেকে।
লিখিত বক্তব্যে ইমরান হাসান বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও কাঁচামালের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়, শ্রমিকদের মজুরি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। অথচ ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে খাবারের দাম বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গ্রাহক কমে যাওয়ায় রেস্তোরাঁগুলোর বিক্রি ও আয় কমেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার জন্য হিমশিম খাচ্ছে।
ইমরান বলেন, রেস্তোরাঁ খাত শুধু একটি ব্যবসায়িক খাত নয়; এটি কর্মসংস্থান, খাদ্য সরবরাহ ও নগর অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই খাতের সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, এলপিজি ও জ্বালানির তীব্র সংকট, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে থমকে গেছে রেস্তোরাঁগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম। ব্যবসায়ীরা জানান, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পেয়ে বাধ্য হয়ে চড়া দামে সিলিন্ডার ব্যবহার করতে গিয়ে অপারেটিং খরচ বাড়ছে বহুগুণে। এর ওপর রাজনৈতিক দলের ট্যাগের আড়ালে হুমকি ও চাঁদাবাজি যোগ হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
সংগঠনটির দাবি, রেস্তোরাঁ খাতে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, ভাড়া, পরিবহন ও শ্রম ব্যয়সহ প্রায় সব ধরনের পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে খাবারের দাম বাড়ালে ক্রেতা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ সময় তিনি রেস্তোরাঁ ব্যবসা টিকিয়ে রাখা, কর্মসংস্থান সংরক্ষণ এবং ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে ৯ দফা দাবি তুলে ধরেন। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে: রেস্তোরাঁ পরিচালনায় ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অভিযানের নামে হয়রানি বন্ধ, এলপিজি ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং গরুর মাংস আমদানির অনুমতি দেওয়া।
সংগঠনটির দাবি হলো চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিম, মসলা, শাকসবজিসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, এলপিজি, পানি, পরিবহন, বাড়িভাড়া ও শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। কিন্তু ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাবারের দাম বাড়ালে ক্রেতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে অনেক রেস্তোরাঁ পরিচালন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, রেস্তোরাঁ খাতের কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। অথচ ব্যবসায়ীরা সেই অনুপাতে খাবারের দাম সমন্বয় করতে পারছেন না। দাম সমন্বয় করতে গেলে বিভিন্ন সময় জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চাপ ও হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। ইমরান হাসান বলেন, রেস্তোরাঁর খাবারের দাম নির্ধারণে কাঁচামালের ক্রয়মূল্য, শ্রমিকের মজুরি, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় নিতে হবে। প্রকৃত ব্যয় যাচাই না করে মূল্য সমন্বয়ের কারণে ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা বা নানামুখী হয়রানি করা বন্ধ করতে হবে।
ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর দাবি:
রেস্তোরাঁ পরিচালনার জন্য বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে ১০ থেকে ১২ ধরনের অনুমোদন নিতে হয় বলে দাবি করেছে মালিক সমিতি। এতে ব্যবসা শুরু ও পরিচালনায় সময় ও ব্যয় বাড়ছে। এ সমস্যা সমাধানে রেস্তোরাঁ খাতের জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস বা এক দরজায় সব সেবা চালুর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। সমিতির মতে, একক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অধীনে সমন্বিত লাইসেন্স ও তদারকি ব্যবস্থা চালু হলে ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমবে। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং রেস্তোরাঁর কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়াও সহজ হবে।
কর প্রত্যাহারের দাবি:
রেস্তোরাঁ খাতে বিদ্যমান ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ২ শতাংশ উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে মালিক সমিতি। পাশাপাশি মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আদায়ের নামে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানি বন্ধ এবং অনিবন্ধিত রেস্তোরাঁ ও সড়কের পাশে খাবারের ব্যবসা (স্ট্রিট ফুড ব্যবসা) ভ্যাটের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে তারা। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সমন্বয়হীন অভিযান ও অহেতুক জরিমানার বিরুদ্ধেও অবস্থান জানিয়েছে সংগঠনটি। অভিযানের সময় রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির প্রতিনিধিকে সঙ্গে রাখার দাবি জানিয়েছেন সংগঠনের নেতারা। হয়রানি বন্ধ না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে সংগঠনটি।
গরুর মাংস আমদানির দাবি:
সংগঠনটির দাবি, বর্তমানে দেশের বাজারে গরুর মাংসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে চাহিদার তুলনায় সরবরাহও কম। দেশে গরুর মাংসের দাম প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত উল্লেখ করে সীমিত পরিসরে মাংস আমদানির অনুমতি চেয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, আমদানির সুযোগ তৈরি হলে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং দাম স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে। ইমরান হাসান বলেন, বর্তমানে নগরভিত্তিক রেস্তোরাঁগুলোতে উচ্চমানের ও নিরবচ্ছিন্ন গরুর মাংসের সরবরাহ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে গরুর মাংস ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অথচ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অত্যন্ত নগণ্য।
তিনি আরোও বলেন, ‘রেস্তোরাঁ খাতের মতো গবাদিপশু পালনও করপোরেট পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এর ফলে প্রান্তিক খামারিরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। পাশাপাশি গো-খাদ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের কারণে মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে, যার প্রভাব গ্রামাঞ্চলে গবাদিপশু পালনের ওপর মারাত্মকভাবে পড়েছে। এতে অনেক এলাকায় গবাদিপশু পালন প্রায় বন্ধের পথে। সংগঠনটির মহাসচিব বলেন, এ পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট নীতিমালা ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে সীমিত আকারে গরুর মাংস আমদানির সুযোগ তৈরি করা হলে বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দাম নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যের মান উন্নয়ন এবং পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির নেতারা মনে করেন, গরুর মাংসের সরবরাহ বাড়ানো গেলে রেস্তোরাঁ খাতের সংকটও কিছুটা কমবে। কারণ মাংসের উচ্চমূল্য ও সরবরাহ সংকটের কারণে অনেক রেস্তোরাঁকে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে যার প্রভাব পড়ছে খাবারের দামের ওপর। এর আগে চলতি বছরের মে মাসেও বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি গরুর মাংস আমদানির সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। তখন সংগঠনটি জানিয়েছিল, দেশের বাজারে গরুর মাংসের দাম তুলনামূলক বেশি এবং চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম।
সংবাদ সম্মেলনে ইমরান হাসান বলেন, রেস্তোরাঁ খাতের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, তদারকি এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ জন্য রেস্তোরাঁ মালিকদের দাবিগুলো বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।







