জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে না, বরং মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নারী ও শিশু-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। সম্প্রতি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, আইসিডিডিআর,বি এবং জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) যৌথ গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চলের খাবার পানিতে উচ্চমাত্রার সোডিয়াম বা লবণাক্ততা এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ একত্রে নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন শিশু-কিশোরীদের মানসিক বিকাশে বর্তমানে এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আইসিডিডিআর,বি-র গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। দেখা গেছে, বন্যাপ্রবণ এলাকার কিশোরীদের দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতার হার তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা তুলনায় অনেক বেশি। মানসিক স্বাস্থ্যের সূচকগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিম্ন ঝুঁকি এলাকার তুলনায় বিষণ্নতার উপসর্গ ১১ শতাংশ বেশি। এক্ষেত্রে কম ঝুঁকিপূর্ণ ঢাকায় এই হার ৮৮ শতাংশ, সেখানে বরিশালে তা ৯৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এছাড়া তীব্র দুশ্চিন্তা বা অ্যাংজাইটির হার ঢাকায় ৭১ শতাংশ হলেও বরিশালে তা ৮৬ শতাংশ, অর্থাৎ বৃদ্ধির হার প্রায় ২১ শতাংশ।
সবচেয়ে বড় ব্যবধান দেখা গেছে পারিবারিক নিরাপত্তার আশঙ্কার ক্ষেত্রে। ঢাকায় পরিবার ও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভয়ের হার ৬৮ শতাংশ হলেও বরিশালে তা ৯৭ শতাংশ নারীই অনুভব করছেন, যার বৃদ্ধির হার প্রায় ৪২ শতাংশ। বারবার দুর্যোগে ঘরবাড়ি হারানো, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং এর ফলে বাল্যবিয়ের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। কিশোরীরা দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনার সুযোগ না পেয়ে তাৎক্ষণিক টিকে থাকাকেই বড় করে দেখছে। দুর্যোগকালে আয় কমে যাওয়ায় নারী ও শিশুর ওপর পারিবারিক সহিংসতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তার অভাবে নারীদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ট্রমা বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) সৃষ্টি হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, লবণাক্ততা কেবল সুপেয় পানির সংকটই তৈরি করছে না, এটি সরাসরি আঘাত হানছে নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যে। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে নারীদের নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, লবণাক্ত পানি ব্যবহারের সঙ্গে প্রজনননালির সংক্রমণ, মাসিকের অনিয়ম ও গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপের মতো মারাত্মক সব স্বাস্থ্য সমস্যার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জার্নাল অব সোশ্যাল সাইন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় ১৭৫ জন নারী অংশ নেন। তাদের মধ্যে ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ নারী প্রজনননালির সংক্রমণের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। আর ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ নারী জানিয়েছেন যে তাদের মাসিক অনিয়মিত বা দীর্ঘায়িত হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এর দেওয়া তথ্যে জানাগেছে, ধোয়া, রান্না ও পান করার কাজে প্রতিদিন লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে এলে ডায়রিয়া, ত্বকের সংক্রমণ, মাসিক ও প্রজননস্বাস্থ্যজনিত জটিলতার পাশাপাশি হৃদরোগ ও বিপাকক্রিয়াজনিত রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
সাতক্ষীরা উপকূলীয় এলাকার ৩২ বছর বয়সী সালমা বেগম। গত ১০ বছরে একাধিক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে তিনি ও তার পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছেন। এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকটের কারণে তাকে বাধ্য হয়ে উচ্চমাত্রার সোডিয়ামযুক্ত পানি পান করতে হয়েছে। এর সঙ্গে সংসারের অভাব-অনটন ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তার মনে তীব্র মানসিক চাপ তৈরি করেছে। নিয়মিত অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের যৌথ প্রভাবে তার শরীরে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন ধরা পড়েছে।
অনুরূপভাবে খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়সী পারভিন আক্তার জলোচ্ছ্বাসে ঘরবাড়ি ও আয়ের উৎস হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। রান্নার কাজ ও পানের জন্য তাকে বাধ্য হয়ে লোনা পানি ব্যবহার করতে হয়। ঘর হারানোর ট্রমা এবং ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মানসিক চাপ ও অ্যাংজাইটিতে ভুগছেন। সম্প্রতি উপকূলীয় হেলথ ক্যাম্পে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তার উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হয়।
চিকিৎসকদের মতে, মানসিক চাপের কারণে তৈরি হওয়া স্ট্রেস হরমোন এবং লোনা পানির সোডিয়াম একত্রে তার রক্তচাপ মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার একজন জেলের স্ত্রী ২৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে স্বামীর অনিশ্চিত আয় ও পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই তার নিত্যদিনের সঙ্গী। এলাকায় নদী ও ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা অতিরিক্ত থাকায় তাকে দূরদূরান্ত থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে হয়, যা তার শারীরিক সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
স্প্রিঙ্গার নেচার জার্নালে গত আগস্ট মাসে প্রকাশিত ‘উপকূলীয় বাংলাদেশের প্রজননক্ষম বয়সী নারীদের মধ্যে পানীয় জলের লবণাক্ততা ও মানসিক-সামাজিক চাপের সঙ্গে উচ্চরক্তচাপের সম্মিলিত সম্পর্ক: জনসংখ্যাভিত্তিক একটি ক্রস-সেকশনাল গবেষণা’ শীর্ষক গবেষণায় চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-র গবেষক আশরাফুল আলম সিদ্দিকী ও মাহিদ আল নাহিয়ান এটি পরিচালনা করেন। এতে সহযোগিতা করেছে জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (নিপোর্ট)। গবেষণায় উপকূলীয় সাত জেলার নয়টি উপজেলার ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী চার হাজার ৬৯৩ জন নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের গড় বয়স ছিল ৩৩ বছর, যার মধ্যে ৪৪ দশমিক ১ শতাংশের বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি। ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ নারী এমন পানি পান করেন, যাতে প্রতি লিটারে সোডিয়ামের মাত্রা দুই হাজার মিলিগ্রামের বেশি। গত ১০ বছরে ৭৬ দশমিক ৩ শতাংশ নারী অন্তত একটি বড় ধরনের জলবায়ুজনিত দুর্যোগের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন এবং ৫৮ দশমিক ৩ শতাংশ নারীর পরিবারের আয় কমে গেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, উপকূলীয় এলাকার নারীদের ৪০ দশমিক ১ শতাংশ মাঝারি এবং ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ তীব্র মানসিক চাপে ভুগছেন। অর্থাৎ মোট ৭৫ দশমিক ৪ শতাংশ নারী মাঝারি থেকে তীব্র মানসিক চাপের শিকার। একই সঙ্গে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ নারীর উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হয়েছে। আর ১০ দশমিক ২ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি মাঝারি থেকে তীব্র মানসিক চাপও একযোগে বিদ্যমান ছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক চাপের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেসব নারীর কোনো মানসিক চাপ ছিল না, তাদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের হার ছিল ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ। মাঝারি মানসিক চাপে থাকা নারীদের ক্ষেত্রে এই হার বেড়ে ২৮ শতাংশ এবং তীব্র মানসিক চাপে থাকা নারীদের ক্ষেত্রে তা ২৯ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ মানসিক চাপ নেই এমন নারীদের তুলনায় মাঝারি ও তীব্র মানসিক চাপে থাকা নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের হার দ্বিগুণেরও বেশি।
গবেষকরা বয়স, শিক্ষা, আর্থিক অবস্থা, এলাকার লবণাক্ততা, দুর্যোগের অভিজ্ঞতা এবং আয় কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার পরেও মানসিক চাপ ও খাওয়ার পানির সোডিয়ামের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক পেয়েছেন। মানসিক চাপমুক্ত নারীদের তুলনায় মাঝারি মানসিক চাপে থাকা নারীদের উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাবনা ১ দশমিক ৮৬ গুণ এবং তীব্র মানসিক চাপে থাকা নারীদের ১ দশমিক ৮৮ গুণ বেশি ছিল। একইভাবে খাওয়ার পানিতে প্রতি লিটারে সোডিয়ামের মাত্রা ১০০ মিলিগ্রাম বাড়লে উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাবনা ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, যেসব নারীর খাওয়ার পানিতে প্রতি লিটারে দুই হাজার মিলিগ্রামের বেশি সোডিয়াম ছিল এবং একই সঙ্গে তারা তীব্র মানসিক চাপে ছিলেন, তাদের উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাবনা কম সোডিয়ামযুক্ত পানি পান করা ও মানসিক চাপমুক্ত নারীদের তুলনায় দুই দশমিক ৪৫ গুণ বেশি ছিল।
গবেষক মাহিদ আল নাহিয়ান জানান, উপকূলে ঝড়-ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে তা সবার জানা থাকলেও লবণাক্ততা ধীরে ধীরে সেখানকার নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও রক্তচাপ কতখানি বাড়াচ্ছে, তা নিয়ে গবেষণা খুবই কম। তিনি বলেন, লবণাক্ত পানি পানের সঙ্গে নারীদের উচ্চ রক্তচাপের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে এবং এসব সংকটের কারণে তাদের কী ধরনের স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন, তা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে যাতে সরকার পরবর্তী কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, লবণাক্ত পানির কারণে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। এজন্য উপকূলীয় এলাকার কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো শক্তিশালী করা, মানসিক কাউন্সেলর নিয়োগ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং নিরাপদ মিঠাপানির টেকসই সরবরাহ বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি জেলেদের জন্য জীবন বীমার ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছেন।







