শহীদুল ইসলাম:
একসময় বাংলাদেশের মানুষের কাছে কফি ছিল সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর একটি বিলাসপণ্য। শহরের কিছু অভিজাত রেস্তোরাঁ কিংবা সীমিতসংখ্যক ক্যাফের মধ্যেই এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে কফির চাহিদা যেমন বেড়েছে, তেমনি দেশের মাটিতেও কফি চাষের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ঢাল থেকে শুরু হওয়া কফি চাষ এখন সমতল অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। কৃষকের আগ্রহ, সরকারি উদ্যোগ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ক্রমবর্ধমান দেশীয় বাজার—সব মিলিয়ে কফি এখন বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা পেলে কফি শুধু কৃষকের আয় বাড়াবে না, বরং দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং কৃষির বহুমুখীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে কফি চাষের ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। ১৯৫০-এর দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষকেরা ভারতের মিজোরাম থেকে কফির বীজ ও চারা এনে ব্যক্তি উদ্যোগে চাষ শুরু করেন। দেশের মধ্যে বান্দরবানের লামা উপজেলায় প্রথম কফি উৎপাদনের সূচনা হয়। পরবর্তীকালে নব্বইয়ের দশকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পরীক্ষামূলকভাবে কফির চারা বিতরণ করলে বিষয়টি সরকারি পর্যায়ে গুরুত্ব পেতে শুরু করে। ২০০১ সালে খাগড়াছড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে গবেষণামূলক কফি চাষ শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে এ খাতের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়। আজ সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগই ধীরে ধীরে দেশের কৃষিতে একটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
বর্তমানে দেশের প্রধান কফি উৎপাদন এলাকা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি হলেও এর পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। সিলেটের গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার, টাঙ্গাইলের মধুপুর, রংপুর, নীলফামারী এবং শেরপুরের মতো সমতল এলাকাতেও সফলভাবে কফি চাষ হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের জলবায়ু ও মাটির বৈচিত্র্য কফি চাষের জন্য অনুকূল। বিশেষ করে অনাবাদি পাহাড়ি ও টিলাভূমিকে উৎপাদনের আওতায় এনে কৃষির নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
উৎপাদনের পরিসংখ্যানও আশাব্যঞ্জক। কয়েক বছরের ব্যবধানে দেশে কফির উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে আবাদি জমির পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও দেশের মোট চাহিদার তুলনায় বর্তমান উৎপাদন এখনও খুবই সীমিত, তবু এটি একটি ইতিবাচক অগ্রযাত্রার ইঙ্গিত দেয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশে উৎপাদিত কফির প্রায় পুরো অংশই স্থানীয় বাজারে সহজেই বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কৃষকদের জন্য বাজার সংকট নেই; বরং চাহিদা উৎপাদনের তুলনায় অনেক বেশি। এই বাস্তবতা নতুন উদ্যোক্তা ও কৃষকদের কফি চাষে উৎসাহিত করছে।
দেশীয় কফি শিল্পের বিকাশে স্পেশালিটি ক্যাফে, স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি কফি সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ফলে কৃষিপণ্যকে কেন্দ্র করে একটি নতুন মূল্যশৃঙ্খল বা ভ্যালু চেইন তৈরি হচ্ছে। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষুদ্র কৃষকদের বড় ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ এখনও সীমিত। অনেক ক্ষেত্রেই তারা স্থানীয় আড়তদার বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে কফি বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সমবায়ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা এবং সরাসরি বাজার সংযোগ গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
সরকার কফি শিল্পের সম্ভাবনা উপলব্ধি করে গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। উন্নত জাতের চারা বিতরণ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্র সরবরাহ এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে কফি চাষকে আরও লাভজনক করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে অনাবাদি জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কফি চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে এবং উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
কফি চাষের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো এর বহুমাত্রিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষমতা। এটি শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়; বরং উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যশৃঙ্খল (ভ্যালু চেইন) তৈরি করে। কফির চারা উৎপাদন, বাগান স্থাপন, পরিচর্যা, ফল সংগ্রহ, বাছাই, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, পরিবহন, রোস্টিং, ব্র্যান্ডিং এবং বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বর্তমানে হাজারো কৃষক ও শ্রমিক কফি চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নারী শ্রমিক। বিশেষ করে কফি চেরি সংগ্রহ, শুকানো ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।
অন্যদিকে দেশে স্পেশালিটি কফি শপ ও ক্যাফে সংস্কৃতির দ্রুত বিকাশ তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। বর্তমানে কফি রোস্টিং, ক্যাফে পরিচালনা, অনলাইন কফি বিক্রি, বিশেষায়িত কফি ব্র্যান্ড গড়ে তোলা এবং কৃষিভিত্তিক পর্যটনের সঙ্গে কফিকে যুক্ত করার মতো নতুন নতুন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। সরকার যদি সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং বাজারসংযোগ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে কফিকে কেন্দ্র করে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা গড়ে উঠবে। এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকে যেমন শক্তিশালী করবে, তেমনি শহরাঞ্চলেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তব কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কফি একটি দীর্ঘমেয়াদি ফসল। একটি গাছ থেকে ফল পেতে তিন থেকে চার বছর সময় লাগে। ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ। এছাড়া আধুনিক কফি চাষ, ছাঁটাই, রোগবালাই দমন এবং ফল সংগ্রহের বিষয়ে অনেক কৃষকের পর্যাপ্ত দক্ষতা নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামোর অভাব। সঠিকভাবে খোসা ছাড়ানো, শুকানো ও সংরক্ষণ করা না গেলে কফির গুণগত মান নষ্ট হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাজারসংযোগ দুর্বল হওয়ায় কৃষকদের অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হয়।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করে দেশের উপযোগী উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করতে হবে। কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। প্রতিটি উৎপাদন এলাকায় আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক মানের গুণগত পরীক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষক সমবায় গঠন, ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থা চালু এবং দেশীয় ব্র্যান্ড উন্নয়নের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। কফিকে রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত করতে হলে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী মান বজায় রাখা এবং ব্র্যান্ডিংয়ের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের কৃষি আজ জলবায়ু পরিবর্তন, জমির সংকোচন এবং উৎপাদন ব্যয়ের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এমন বাস্তবতায় উচ্চমূল্যের বিকল্প ফসল হিসেবে কফি একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলের অনাবাদি জমির যথাযথ ব্যবহার, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, নারী কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে কফি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম। প্রয়োজন শুধু ধারাবাহিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, বেসরকারি বিনিয়োগ, গবেষণা এবং সুসংগঠিত বাজারব্যবস্থা।
বিশ্বব্যাপী কফির বাজারের আকার কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের। প্রতিবছর কফির চাহিদা বাড়ছে এবং বিশেষায়িত কফির বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের কফি এখনও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় অবস্থান তৈরি করতে না পারলেও এর সম্ভাবনা উজ্জ্বল। পার্বত্য অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটি উচ্চমানের অ্যারাবিকা ও রোবাস্টা কফি উৎপাদনের জন্য উপযোগী হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
বর্তমানে সরকারের লক্ষ্য কফি উৎপাদন সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য রপ্তানি বাজার গড়ে তোলা। তবে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; আন্তর্জাতিক মানের প্রক্রিয়াজাতকরণ, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, সার্টিফিকেশন এবং ব্র্যান্ডিং নিশ্চিত করতে হবে। “বাংলাদেশি কফি” নামে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলতে পারলে কফি দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্যে পরিণত হতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি করবে।
কফির সুবাস আজ আর কেবল একটি পানীয়ের স্বাদে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার প্রতীক। এই সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে আগামী দিনে বাংলাদেশ শুধু নিজস্ব চাহিদাই পূরণ করবে না, আন্তর্জাতিক বাজারেও একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। তখন কফি হবে কৃষকের সমৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের আরেকটি শক্তিশালী ভিত্তি।
লেখক:
শহীদুল ইসলাম
প্রকল্প পরিচালক (পিডি)
কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প







