বাংলাদেশের সামনে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেইসাথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছে তাপপ্রবাহ, খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত। সেইসাথে সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনো এই চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ইতিমধ্যে আবহাওয়া অধিদপ্তর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৪১টি জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহের সর্তকতা জারি করেছে।
দেশ ইতোমধ্যে তাপপ্রবাহের ভয়াবহতা দেখেছে। ২০২৪ সালে দেশের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ তাপপ্রবাহ দেখা যায়। টানা ৩৬ দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৩৬ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের কারণে সৃষ্ট প্রচন্ড গরমে শ্রমজীবী সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ দুর্ভোগে রয়েছে। তীব্র গরম তাদের কষ্ট আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে প্রচন্ড গরমে শিশু ও বয়স্করা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত বেশি হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আগামী কয়েক দিন এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। এর মধ্যেই বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সতর্ক করেছে, চলতি বছরের শেষার্ধে শক্তিশালী এল নিনো সক্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা বেশি।
টানা কয়েক দিনের তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে উত্তরাঞ্চলের জনজীবন। প্রচণ্ড রোদ আর ভ্যাপসা গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষক ও কৃষি শ্রমিকরা। মাঠে কাজ করতে গিয়ে তারা টানা এক ঘণ্টাও টিকতে পারছেন না। কিছুক্ষণ কাজ করেই গাছের ছায়া কিংবা খড়ের গাদার পাশে গিয়ে বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। এতে কৃষিকাজের গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি কমেছে শ্রমিকদের দৈনিক আয়ও।
বর্তমানে রংপুর অঞ্চলের মাঠে বোরো ধান ও ভুট্টা কাটার শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে। পাশাপাশি কাটা ফসল শুকিয়ে ঘরে তোলার কাজেও ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। কিন্তু তাপপ্রবাহের কারণে কৃষিকাজে দেখা দিয়েছে ধীরগতি।
রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা ইউনিয়নের বড় ভগবান পুর গ্রামের কৃষি শ্রমিক আবু আলী বলেন, ‘ইদের কয়েকদিন আগে টানা বৃষ্টির কারণে মাঠে নামতে পারিনি। এখন বৃষ্টি নেই, কিন্তু গত পাঁচ দিন ধরে এমন গরম পড়েছে যে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। মাঠে টানা এক ঘণ্টা কাজ করলেই শরীর জ্বলে ওঠে। বাধ্য হয়ে গাছের নিচে গিয়ে বিশ্রাম নিতে হয়।’
একই গ্রামের কৃষি শ্রমিক আলম মিয়া জানায়, আমরা চুক্তিভিত্তিক জমিতে ধান ও ভুট্টা কাটার কাজ করি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ৬ জনের একটি দল দুই ঘণ্টায় এক বিঘা ধান এবং তিন ঘণ্টায় এক বিঘা ভুট্টা কাটতে পারে। কিন্তু তীব্র গরমের কারণে এখন একই কাজ করতে প্রায় তিনগুণ বেশি সময় লাগছে। ফলে আয়ও কমে গেছে। মাঠে কিছুক্ষণ কাজ করলেই ছায়ায় গিয়ে বসতে হচ্ছে।’
সেকানকার এক গৃহিনী বলেন, সারাক্ষণ শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। চুক্তি অনুযায়ী শ্রমীকরা কাজ করতে চায় না মজুরি বেশি চায়। মাঠে ধান থাকলেও ঘরে উঠানো দায় হয়ে গিয়েছে।
ওই উপজেলার কাঠালপাড়া গ্রামের নারী কৃষি শ্রমিক দরোদী বেগম বলেন, নারী শ্রমিকরা মাঠে বেশিক্ষণ কাজ করতে পারছেন না। তাই বাড়িতে ধান ও ভূট্টা শুকানোর কাজ করছে। রোদ থাকায় ধান ও ভুট্টা শুকাতে সুবিধা হচ্ছে।
কাঁঠাল পাড়া গ্রামের কৃষক আজিজার রহমান বলেন, ‘খেতের ধান পাকা ধান থাকলেও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক কৃষক ও কৃষি শ্রমিক বাধ্য হয়ে মাঠে কাজ করছেন। তাদের কেউ কেউ অসুস্থও হয়ে পড়ছেন।’
*জুনে একাধিক তাপপ্রবাহের শঙ্কা, কমবে বৃষ্টি:
চলতি জুন মাসে একাধিক তাপপ্রবাহ হতে পারে। এসব তাপপ্রবাহের আকার মৃদু থেকে মাঝারি হতে পারে। এছাড়া, জুন মাসে দেশে স্বাভাবিক অপেক্ষা কম বৃষ্টিপাত এবং ২-৩টি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। জুন মাসের জন্য দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে এ তথ্য জানিয়েছে অধিদপ্তর।
সংস্থাটি জানিয়েছে, এ মাসে বঙ্গোপসাগরে ১-২টি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার মধ্যে একটি মৌসুমি নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। জুন মাসের প্রথমার্ধে সারা দেশে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু (বর্ষাকাল) বিস্তার লাভ করতে পারে। এ মাসে ৫-৭ দিন হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বজ্রঝড় হতে পারে।
তাপমাত্রার বিষয়ে বলা হয়েছে, জুনে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিক অপেক্ষা বেশি থাকতে পারে। এ মাসে দেশে ২-৩টি বিচ্ছিন্নভাবে মৃদু (৩৬-৩৭.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস) থেকে মাঝারি (৩৮-৩৯.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।
নদ-নদীর অবস্থায় বলা হয়েছে, দেশের প্রধান নদ-নদীসমূহের স্বাভাবিক প্রবাহ বিরাজমান থাকতে পারে। তবে বিচ্ছিন্ন ভারী বৃষ্টিপাতের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোর পানি সমতল সময় বিশেষে বৃদ্ধি পেতে পারে।
আর মে মাসে সারা দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ মাসে চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে স্বাভাবিক অপেক্ষা কম বৃষ্টিপাত এবং বাকি বিভাগগুলোতে স্বাভাবিক অপেক্ষা বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
গত মঙ্গলবার বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) চলতি মাস থেকে আগস্টের মধ্যে তাপমাত্রা বাড়ানোর জলবায়ু পরিস্থিতি ‘এল নিনো’ তৈরি হওয়ার ৮০ শতাংশ আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক এই সংস্থাটি জানায়, উষ্ণমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
এটি বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক নিয়মে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। এর ফলে কিছু অঞ্চলে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আঞ্চলিক জলবায়ু কেন্দ্রগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় গড় বৃষ্টিপাতের চেয়ে কম মৌসুমি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা আছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সেন্টার ফর পিপল অ্যান্ড এনভায়রন (সিপিই) পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রহমান রানা বলেন, ‘১৯৫০ সালের পর এই পর্যন্ত এলনিনো তিনবার হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনো ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। এর আগে ১৯৯৭-৯৮, ১৯৮২-৮৩ এবং ১৯৭২-৭৩ সালেও অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো দেখা গিয়েছিল। ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনোয় বিশ্বে প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছিল। রেকর্ডকৃত এলনিনোর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী এলনিনোর তথ্য পাওয়া যায় ১৮৭৬-৭৮ সালের। যা গত পৌনে দুশ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয় হিসেবে স্বীকৃত।’
‘ সেই এলনিনোতে বিশ্বব্যাপী খরা ও দুর্ভিক্ষের কারণে প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ অর্থাৎ আনুমানিক ৩ থেকে ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এবারের এলনিনো সেই এলনিনোকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের আশংকা, বলে মত আবদুর রহমানের।
*কৃষির সামনে বড় ঝুঁকি:
প্রকৃতিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থায় আমন ধান পুরোপুরি বর্ষার ওপর নির্ভরশীল। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর কারণে যদি বর্ষা দেরিতে আসে কিংবা বৃষ্টিপাত কম হয়, তাহলে আমন মৌসুম সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহের কারণে আম ও লিচুর বাগানে ফল ঝরে পড়েছে। ফলচাষিরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. শরিফুল হক ভূঞা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে, শীতকাল ছোট হয়ে আসছে এবং প্রয়োজনের সময় বৃষ্টি পাওয়া যাচ্ছে না। জলবায়ুসহিষ্ণু ফসল উদ্ভাবন না করতে পারলে কৃষি খাত বড় সংকটে পড়বে।
বায়ুমণ্ডল দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দেশের অধিকাংশ পরিকল্পনায় উপকূলীয় অঞ্চল গুরুত্ব পেলেও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।’
*কী করছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর:
সারাদেশের তাপপ্রবাহ (হিটওয়েভ) মোকাবিলায় সরকার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় নানান পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক(ডিজি) রেজওয়ানুর রহমান বলেন, ‘তাপমাত্রা বৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ গাছপালা কমে যাওয়া। এর প্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণের নির্দেশ দিয়েছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় খালের আশেপাশে গাছ লাগাচ্ছে এবং এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত করছে। প্রকৃতিকে রক্ষা করতে সবুজায়ন এবং পানির উৎস বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরোও বলেন, ‘ ইতিমধ্যে উপজেলা পর্যায়ে ‘ফুড বাস্কেট’ বা খাদ্য সহায়তা মজুত রাখা হয়েছে। যদি কোন জেলা প্রশাসক (ডিসি) বা উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা (ইউএনও) মনে করেন যে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে কোনো শ্রমজীবী মানুষ বা দিনমজুরের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তবে তাদের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত খাদ্য সহায়তা দিতে পারবে।’
এছাড়া বিভিন্ন স্থানে আশ্রয়স্থল ও কুলিং সেন্টার স্থাপনেরর কথাও বলেন তিনি।
তাপ ও শীতের ক্ষেত্রে আর্লি ওয়ানিং সিসটেম বা আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার কথা চিন্তা করছে মন্ত্রণালয়। রেজওয়ানুর রহমান বলেন, ‘বন্যা বা ঝড়ের ক্ষেত্রে যেমন ১, ২, ৩, ৪ নম্বর সংকেত দেওয়া হয়, তেমনি হিটওয়েভ বা তাপপ্রবাহের জন্যও নির্দিষ্ট মাত্রার ভিত্তিতে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি করছে মন্ত্রণালয়। এর মাধ্যমে মানুষের কাছে তাপপ্রবাহের লক্ষণ ও করণীয় পৌঁছে দেওয়া হবে।’
হিটওয়েভ মোকাবেলায় গবেষণা ও আর্থিক সহায়তা বিষয়েও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘ রাজশাহীতে হিটওয়েভের প্রকোপ বেশি হওয়ায় রেড ক্রিসেন্ট সেখানে গবেষণা চালিয়েছে এবং আর্থিক সহায়তার বিষয়ে কিছু কাজ করেছে, যা প্রয়োজনে অনুসরণ করা যেতে পারে।’
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গত বছর তাপপ্রবাহ ৩৬ দিন স্থায়ী হয়েছিল। এবার এল নিনোর প্রভাবের কারণে আবহাওয়া আরও রুক্ষ ও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে।








