কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল ইউনিয়নের ভাদালিয়াপাড়া গ্রামের একজন ক্ষুদ্র কৃষক শওকত মন্ডল। কৃষিকাজ করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু কৃষিকাজে তেমন সফলতা আসছিল না। ২০২৩ সালে উপজেলা কৃষি অফিস কুষ্টিয়া সদর এর সহযোগিতায় মসলা গবেষণা কেন্দ্র বগুড়া থেকে ১ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তার এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ২০২৩ সালে মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্প থেকে উচ্চ মূল্যের মসলা জিরার প্রদর্শনী পান। তিনি প্রকল্প থেকে পাওয়া উচ্চমূল্যের মসলা জিরার আবাদ করে নিজে ব্যবহারের পাশাপাশি কৃষকদের মাঝে বিক্রয় শুরু করেন। তার দেখাদেখি অন্যান্য কৃষকরাও এই জিরা চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
তিনি প্রদর্শনীর মাধ্যমে ১০ শতাংশ জমিতে আধুনিক উন্নত উচ্চ ফলনশীল জাত বারি জিরা-১ জাতের জিরা আবাদ করেন । প্রদশনীতে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে বিনামূল্যে জিরা বীজ, ইউরিয়া, এমওপি, টিএসপি ও জৈব সার প্রদান করা হয়। এছাড়াও পরিচর্চা ও সেচ বাবদ নগদ টাকা পান।
এরপর তিনি প্রদর্শনী ছাড়াও নিজ উদ্যেগে ৩৩ শতাংশ জমিতে জিরা চাষ করেন। তার এই জিরা চাষ করতে সর্বমোট খরচ হয় ১৭ হাজার টাকা। বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে জিরা ও জিরার বীজ বিক্রয় করেন প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার ৫০০ টাকা। সব খরচ বাদে মুনাফা হয় প্রায় ৯৮ হাজার টাকা লাভ হয়। জিরা চাষের পরিচর্যা খরচ তুলনামুলক অনেক কম হওয়ায় এবং চাষ লাভজনক হওয়ায় তিনি আরো বড় আকারে করার সিদ্ধান্ত নেন।
মোঃ শওকত মন্ডলের সাথে কথা বলে জানা যায়, জিরা চাষ করে তিনি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এছাড়া এই মসলা ফসলটি আবাদ করে তিনি দেশের মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করেছেন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে রিপোর্ট হয়েছে।
‘আমি জিরা চাষে ভালো করার কারণে এর বীজ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেছি।’, বলেন তিনি।
তিনি ফসল উৎপাদনে জৈব সারের ব্যবহার করে আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে চাষ করেন। তার সফলতায় এলাকার বেকার যুবকরা জৈব সার ব্যবহারের মাধ্যমে এই জিরা চাষে আগ্রহী হয়েছেন।
কুষ্টিয়ার আরেক কৃষক জামাত আলী। সেখানকার বরিয়া গ্রামের মৃত আবের আলীর সন্তান সাধারণ কৃষক সে অনেক দিন ধরে কৃষি কাজের সাথে জড়িত ও বিভিন্ন ধরনের ফসল আবাদ করে থাকেন।
তিনি কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে জানতে পারেন বারি আদা-২ অধিক লাভজনক মসলা। সে উপজেলা কৃষি অফিসারের সহায়তায় ও পরামর্শে বারি আদা-২ মসলা আবাদ শুরু করেন এবং ১ হাজার বস্তা চাষ করেন।
জামাত আলী বলেন, ‘ আমার ১ হাজার বস্তা আদা চাষ করতে সার, বীজ, সেচ শ্রমিক, ও কীটনাশকসহ অন্যান্য খরচ বাবদ প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। আমি প্রায় একশত মণ আদা উৎপন্ন করি যার বাজার মূল্য ১ লাখ টাকা। আদা চাষ করে আমি প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাভ করি।’
তিনি আরো বলেন, ‘এই ফসল আবাদ করতে অন্যান্য ফসলের চেয়ে খরচ ও শ্রম কম হয়। যার মাধ্যমে তার জীবনযাত্রার মান পরিবর্ত হয়েছে ও সেই লাভের অর্থ দিয়ে আমি মুরগীর ফার্ম করেছি।’
কৃষ্টিয়া বরিয়া গ্রামের পেঁয়াজ চাষী মো: সাইদুল ইসলাম। চাঁদ আলীর ছেলে সাইদুল একজন সাধারণ কৃষক হিসেবে কৃষি কাজের সাথে অনেক দিন থেকে জড়িত। এলাকায় সচেতন কৃষক হিসেবে ইতিমধ্যে তিনি বিভিন্ন ধরনের ‘লাভজনক’ ফসল আবাদ করে থাকেন।
তিনি সদর উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে জানতে পারেন লাল তীর কিং একটি অধিক লাভজনক পেঁয়াজ মসলা। সে উপজেলা কৃষি অফিসারের সহায়তা ও পরামর্শে পেঁয়াজ মসলা আবাদ শুরু করেন এবং ১ বিঘা জমি চাষ করেন। জমি চাষ করতে তার সার, বীজ, সেচ, শ্রমিক, ও কীটনাশক সহ অন্যান্য খরচ বাবদ প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। সেই জমি থেকে তিনি একশ মন পেয়াঁজ উৎপাদন করে বাজারে বিক্রি বরেন যাতে তার ৫০ হাজার টাকা লাভ হয়।
সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘এই ফসল আবাদ করতে অন্যান্য ফসলের চেয়ে খরচ ও পরিশ্রম কম হয়। এখন আমার জীবনযাত্রার মান পরিবর্ত হয়েছে। আমি লাভের টাকা দিয়ে ৫ টি ছাগল কিনেছি।’
শুধু শওকত মন্ডল বা সাইদুল ইসলামই নয় সারাদেশে মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার কৃষক মসলা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ৫৯ হাজার ৯১০ জন চাষিকে মসলাজাতীয় ফসলের চাষ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে ১৪টি মসলা ফসলের উন্নত জাতের সম্প্রসারণে কাজ করছে।
মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক রাসেল আহমেদ বলেন, জিরা চাষে মোঃ শওকত মন্ডলের সাফল্য চারদিক ছড়িয়ে পড়ায় বেশ সাড়া ফেলেছে। বিষয়টিকে আমরাও ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। সাধারণ ধনিয়ার মতোই স্বল্প খরচে জিরা চাষ সম্ভব। এটি চাষাবাদে খুব বেশি কারিগরি জ্ঞান বা দক্ষতার প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, এবার সারাদেশে যে পরিমাণ জিরা উৎপাদিত হবে তার বীজ সংগ্রহ করে আগামী বছর এটি সম্প্রসারিত করা হবে। এক্ষেত্রে কৃষি বিভাগ আগ্রহী চাষিদের সার্বিক সহযোগিতা করবে। অর্থকরী এই ফসল বাণিজ্যিকভাবে দেশের মাটিতে চাষ করা গেলে আমদানি নির্ভরতা কমে আসবে। দামও হাতের নাগালে চলে আসবে।
তথ্য বলছে, দেশে প্রতিনিয়ত জিরার আবাদ বাড়ছে। এবার ১০ বিঘা জমিতে সফলভাবে জিরা আবাদ হয়েছে। যার উৎপাদন মাত্রা এক টন। বাকি পুরোটাই আমদানি নির্ভর। বন্দর ও কাস্টমসের তথ্য মতে, দেশে চাহিদার ৬১ শতাংশ জিরা আমদানি করতে হয় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে। ৩২ শতাংশ জিরা আমদানি হয় তুরস্ক থেকে। এছাড়াও জিরা আসে মিশর, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়া থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ৩৫০ টন জিরা আমদানি হয়েছে। যার মূল্য ১২ কোটি ৮ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে ৯১৯ টন জিরা আমদানি হয়েছিল। যার মূল্য ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
মসলা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি নিয়ে কাজ করছে প্রকল্পটি। এর মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে পরিচিতি লাভ করেছে বিভিন্ন ধরণের মসলার চাষ।








