ইরানে চলমান সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি কোম্পানিগুলোর সপ্তাহে রেকর্ড এক বিলিয়ন ডলারের বেশি লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিষয়ক সংস্থা এনার্জি ফ্লাক্স।
বুধবার সংস্থাটি বলছে, এসব কোম্পানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ট।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে হামলা শুরু করে মার্কিন-ইসরায়েল জোট। এরপর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষকরে; কাতার তাদের রাস লাফান এলএনজি প্ল্যান্ট বন্ধ করে দেয়ায় সংকট বেড়ে গেছে। এই প্ল্যান্ট বিশ্বের মোট এলএনজির প্রায় ২০শতাংশ সরবরাহ করে। রাস লাফান বন্ধ হওয়ায় গ্যাসের যোগান সংকট তৈরি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রপ্তানিকারকরা বিশ্ববাজারে ঊর্ধ্বমুখী দাম থেকে লাভ অর্জন করতে পারছে।
এনার্জি ফ্লাক্স-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপে সরবরাহ করা একটি এলএনজি কার্গোর লাভ দ্বিগুণ হয়েছে, গত সপ্তাহের প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলার থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত ৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি রাস লাফান এক মাসের জন্য বন্ধ থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এলএনজি রপ্তানি থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত লাভ হতে পারে।
গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত যদি ইরান যুদ্ধ অব্যাহত থাকে, তাহলে এই সংখ্যা প্রতি মাসে ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের দুই পিউরপ্লে এলএনজি কোম্পানি—ভেঞ্চার গ্লোবাল এবং চেনিয়ার এনার্জি’র।
শুক্রবার থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যথাক্রমে ২৩ শতাংশ এবং ১১ শতাংশ।
এলএনজির এই মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে সামগ্রিক জ্বালানির মূল্যের ঊর্ধ্বগতি। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর, তেলের পাশাপাশি গ্যাসের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে—ইউরোপে ৭৫ শতাংশ এবং এশিয়ার স্পট এলএনজির দাম ৪৭ শতাংশ বেড়েছে।
রাস লাফান প্ল্যান্ট বন্ধ হওয়ায় বিশ্বব্যাপী এলএনজি সংকট তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা থাকা সত্ত্বেও বিকল্প সরবরাহকারী—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র—এই শূন্যতা পূরণ করছে। দ্রুত শিল্প বৃদ্ধি ও নতুন প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি উৎপাদক এবং ২০২৫ সালে প্রায় বিশ্বের মোট রপ্তানির ২৫ শতাংশ সরবরাহ করেছে। বর্তমানে ইউরোপ হল যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজির প্রধান বাজার।
২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার পাইপলাইন গ্যাস কমাতে শুরু করে এবং সেই শূন্যতা দ্রুত পূরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি। সম্প্রতি স্পেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি কেনা শুরু করেছে। ২০২৩ সালে জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২০ বছর মেয়াদী এলএনজি সরবরাহ চুক্তি করেছে। এছাড়া ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যও তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে আমদানি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
ইরান সংকট দীর্ঘমেয়াদী হলে এশিয়ার দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজির কেনা বাড়াতে পারে বলে ধারনা করছে এনার্জি ফ্লাক্স।
চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, বাংলাদেশ ও ভারত তাদের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের জন্য এলএনজি আমদানির ওপর ব্যাপক নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে যেকোন সংকট সৃষ্টি হলে আমদানি নির্ভর এসব দেশ বিপদে পড়ে।
ইরান সংকট প্রমাণ করে, আমদানি নির্ভর দেশগুলোকে তাদের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কতটা বৈচিত্য আনতে হবে। বিশেষ করে আমদানি নির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ক্রমে বেরিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর করতে হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন এলএনজি শুধুমাত্র বিকল্প উৎস নয় বরং এটি ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের একটি হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে।








